সন্তান উত্তেজিত হয় বাবা-মায়ের কারণেই


Odd বাংলা ডেস্ক: সন্তান জন্ম দেয়া সহজ কিন্তু তাদের মানুষ করা অনেক কঠিন। আর সফল ও যোগ্য বাবা-মা হওয়া আরও অনেক কঠিন। সফল বাবা-মা কীভাবে হতে হয় তাদের অধিকাংশ-ই তা জানেন না বা জানলেও অনুসরণ করেন না। ফলে সন্তান বড় হচ্ছে ঠিকই কিন্তু তাদের মধ্যে মানবিক গুণাবলীর ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। জন্মের পর থেকেই শিশুর শিক্ষা শুরু হয়। শিশু শিক্ষার প্রথম পাঠ শুরু হয় মায়ের কাছ থেকে তথা পরিবার থেকে। আমরা মায়েরা শিশুর শারীরিক আর পড়াশুনার বিষয়ে যতটা গুরুত্ব দিচ্ছি, তার মানসিক বিকাশ, চিন্তা-চেতনা সঠিকভাবে গড়ে উঠছে কি-না, সে বিষয়ে ততটা গুরুত্ব দিচ্ছি না। ফলে অধিকাংশ শিশুরা ত্রুটিপূর্ণ চিন্তা-চেতনায় এবং অভ্যাসে বড় হয়ে উঠে এবং বড় হয়ে ঐ সকল বদ অভ্যাস ও ত্রুটিগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে ত্যাগ করতে পারে না। যেমন, দুই/তিন বছরের অনেক শিশুকে দেখা যাবে, জিনিসপত্র নষ্ট করছে, যা খাচ্ছে অর্ধেক ফেলে দিচ্ছে, টেবিলে-সোফায় লাফালাফি করে জিনিসপত্র ক্ষতি করছে। খেলনাপত্র ভাংচুর করছে। অন্য বাড়িতে গিয়ে সাজানো জিনিসপত্র নাড়াচাড়া বা নষ্ট করছে। জানালা দিয়ে বাইরে জিনিস ফেলছে। অথচ মমতাময়ী মা খুশী মনে বলছেন, ‘আমার সন্তান দারুণ প্রাণচঞ্চল, দারুণ দুষ্ট।’ অনেক মায়েদের এমনও বলতে শুনি, ‘বাচ্চারা তো এমন করবেই। 

বড় হলে এসব ঠিক হয়ে যাবে।’ অথচ এটা একেবারেই ভুল কথা। বড় হলে শিখবে না। বরং এসব বদ অভ্যাস ছাড়তে তাদের আরো বেশি কষ্ট হয়। একথা কখনই মনে করা ঠিক নয় যে, শিশু কিছু বোঝে না। শিশুরা ঠিকই বোঝে, ক্ষেত্র বিশেষে তারা বাবা-মায়ের চাইতে দ্রুত নতুন কিছু শেখা বা গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখে। এখন সে কাদামাটির মত। তাই তাকে যেভাবে গড়া হবে সেভাবেই গড়ে উঠবে। শিশুরা দেখে শেখে, শুনে শেখে এবং করার মাধ্যমেও শেখে। তাদের ব্রেনের সফটওয়ার এসময় সম্পূর্ণ খালি থাকে। ফলে যা দেখবে, শুনবে, অনুভব করবে, তাই ব্রেনে দ্রুত রেকর্ড হয়ে যাবে। বাচ্চারা ৬ মাস থেকেই শিখতে শুরু করে। আদর যেমন বোঝে, ধমকও বোঝে। ভালো কাজ, খারাপ কাজ শেখার বা বোঝার ক্ষমতা ঐ সময় থেকেই শুরু হয়ে যায়। যেমন, দু’বছরের কোন শিশুকে দেখবেন চকলেটের কভার খুলে ঘরের কোণে রাখা ডাস্টবিনে গিয়ে ফেলছে। অনেক বাচ্চাকে দেখবেন, নতুন কারো বাসায় বেড়াতে গিয়ে শোপিস দেখছে ঠিকই কিন্তু ধরছে না। কারণ তারা বোঝে হাতে নিয়ে দেখতে গেলে তা পড়ে ভেঙে যেতে পারে। দুবছর বয়সেই কিন্তু শিশুরা নিয়ম-শৃঙ্খলা, সৌন্দর্যবোধ, গুছিয়ে রাখা, নষ্ট না করা, কোনটা করা উচিত এবং উচিত নয় তা বোঝার ক্ষমতা অর্জন করে ফেলে। বরং আমরা অভিভাবকরাই বুঝি না তাদের কীভাবে শেখানো উচিত। কারণ ওই শিশুর ব্ল্যাঙ্ক ব্রেন সফটওয়ারে সবকিছু বুঝতে চায়, জানতে চায় এবং সে তার ব্রেনে দ্রুত সবকিছু সংরক্ষণ করে রাখে। ছয় বছরের মধ্যে শিশুরা ব্রেনের পূর্ণতা পেয়ে যায়। ঐ বয়সে সে যা কিছু দেখে, শোনে, বোঝে পরবর্তী জীবনে তার প্রতিফলন ঘটে। তার মধ্যে স্বার্থপরতা, আত্মকেন্দ্রিকতা অথবা উদারতা, মায়া-মমতা প্রভৃতি ইতিবাচক বা নেতিবাচক গুণাবলী বিকশিত হয়। এসময় যা ইনপুট হবে পরবর্তী জীবনে তাই আউটপুট হবে। সুতরাং এই সময়টি শিশুদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সবচেয়ে আদরের সন্তানকে আদব-কায়দায়, সৃষ্টিশীলতায় এবং কিভাবে আদর্শ মানুষ করতে হবে এসব নিয়ে পিতামাতাকে খুব সতর্কতার সাথে হ্যান্ডেল করতে হয়। যেমন কোনো শিশু দৌঁড়াতে গিয়ে দরজার চৌকাঠে আঘাত পেয়ে কাঁদতে শুরু করল। তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে দরজার চৌকাঠে আঘাত করে বাচ্চাকে বুঝানো হলো যে দরজাকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। বাচ্চার কান্না থেমে গেল। এর মাধ্যমে শিশুটিকে শেখানো হল, যে তাকে বাঁধা দেয় বা কষ্ট দেয় তাকে মারতে হয়। ফলে ঐ শিশু প্রতিশোধ নেবার স্পৃহা পেলো শেশবেই। আরো একটি উদাহরণ, দ্বিতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত সন্তানকে যে টিফিন দেয়া হয়, সেটা অধিকাংশ সময় সে নিজে খায় না, তার বন্ধুরা খেয়ে ফেলে। এতে আপনি যদি সন্তানকে বলেন যে, ‘তোমার টিফিন তুমি খাও না, বন্ধুরা খায় কেন? তুমি বোকা, না গাধা? নিজের স্বার্থ বুঝ না? আজ থেকে তোমার টিফিন বন্ধুরা যেন না খায়।’এসব কথা বলে আপনি কিন্তু আপনার সন্তানকে স্বার্থপরতা আর আত্মকেন্দ্রিকতার শিক্ষাটাই দিলেন। ঐ সন্তান হয়ত পরবর্তীতে বৃদ্ধ পিতামাতাকে দেখবে না। কারণ সে ছোট বেলা থেকেই স্বার্থপরতা শিখে এসেছে। সে শিখেছে, নিজেরটা আগে দেখো। অথচ এক্ষেত্রে শিখানো উচিত ছিল বন্ধুকে জিজ্ঞেস করে খেয়ো, সে খেয়েছে কিনা? মিলেমিশে খেয়ো। মানুষকে সাহায্য করো, দুটি ভালো কলম থাকলে বন্ধুকে একটি দাও। যাতে ও ভালো লিখতে পারে। সন্তানকে স্বার্থপর করে গড়ে তুললে প্রাথমিকভাবে কিছু ক্ষেত্রে বাচ্চাকে স্মার্ট মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রতিফল আর প্রতিক্রিয়া বাবা-মার ওপরেই সবথেকে বেশি পড়বে। কিন্তু নিত্যদিনের কাজে কর্মে আমরা কিভাবে আমরা সন্তানকে স্বার্থপর করে ফেলি তার একটা সংক্ষিপ্ত বিররণী তুলে ধরলামৃ ছোট থেকে সন্তানের প্রতি ‘বেশী ভালোবাসা’দেখানোর জন্য বা নিজের বাচ্চাকে অন্য বাচ্চাদের থেকে আলাদা করার জন্য আমরা বাবা-মায়েরা ঢাকঢোল পিটিয়ে বেশ কিছু কাজ করি ফেলি। 

অনেক বাবা মা মনে করেন এই কাজগুলো তাদের বাচ্চার জন্য ভাল হবে। কিন্তু নিজেই অজান্তে আপনারা সন্তানের ক্ষতি করে ফেললেন। তারা বড় হয়েও নিজেকে আলাদাই ভাববে। বাবা-মা থেকেও তারা নিজেদের আলাদা করে নেয়। বাবা মা অনেক সময় শিশুদেরকে তার আত্নীয়রা কে কি গিফট করলো বা কতোটা দামি/ মূল্যবান গিফট করলো তার ফিরিস্তি দিয়ে থাকি। ব্যাপারটা এমন যে, যে যত দামি গিফট করে সে বাচ্চাকে সে সেরকম ভালবাসে। আর না দিলে ভালবাসা নেই বা কম..এমনটা বুঝিয়ে থাকি। যেন দামি দামি গিফটিই বাচ্চাকে ভালবাসার প্রধান মাপকাঠি। শুরুতেই একটা বাচ্চার মগজে আপনি ভালবাসাটাকে এমন একটি দ্রব্যমূল্যের মাপকাঠিতে ফেললেন। এমনও সময় আসতে পারে যে আপনি সন্তানকে দামি কিছু দিতে পারছেন না। কিন্তু তখন সে এটা বুঝতে চাইবে না কারণ সে তো পেয়ে অভ্যস্ত। বরং এমনটা না করে বাচ্চাদের আত্নীয় স্বজনদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব গড়তে সহায়তা করুন। সন্তানকে খাবার প্লেটে সবচেয়ে ভাল খাবারটাই দিচ্ছেন। যখন যা চাচ্ছে, প্রয়োজন থাক বা না থাক সেটাই দিয়ে দিচ্ছেন। আপনার কাজে কর্মে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, সন্তানই সব। অন্যকে কোনো ভাগ দিচ্ছেন না। নিজে কষ্ট করছেন কিন্তু সন্তানের রুমে এসি লাগিয়েছেন। ছোট বাচ্চা সে কষ্ট করতে পারবে না এই ভেবে। বড় হয়ে এরা কোনদিনই আপনার কষ্ট বুঝবে না। কারণ সে শুধু পেতেই শিখেছে, কাউকে কিছু দিতে শিখে নি। 

তাই এসব কাজে সন্তানদের শেয়ারিং শেখানো দরকার। অনেক সময় বাবা-মা আত্নীয় স্বজনদের নিয়ে হেয় মন্তব্য করতে সন্তানকে শিখিয়ে দেয় বা বাবা-মার আচরণে সন্তান নিজে থেকেই এটা শিখে যায়। তখন শিশুরা এর ওর সম্পর্কে ইনিয়ে বিনিয়ে এটা ওটা বাজে মন্তব্য করে। সেটা নিয়ে আবার বাবা-মায়েরা আবার হাসি ঠাট্টা করেন। এতে করে শিশুদের মাঝে বড়দের নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়। বড় হয়ে তার ভিতরে এই দোষ থেকেই যায়। এক সময় সে-ও তার বাবা-মাকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করে। সন্তানের কাজিন বা বন্ধুদের জন্য গিফট কিনতে গিয়ে কমদামি ঠুনকো কিছু খুঁজে বেছে বের করলেন। আর তাকে বুঝালেন পরের জন্য এতো টাকা খরচ করার প্রয়োজন নেই। ওদিকে শপিং শেষে রেস্টুরেন্টে ঢুকে সন্তানকে দামি ফাস্ট ফুড কিনে দিলেন। সন্তান খুশি হলো। পাশাপাশি এটাও শিখে গেলো কীভাবে অন্যকে না দিয়ে বা কম দামের কিছু দিয়ে পয়সা বাঁচানো যায়। স্বর্থপরতার পারফেক্ট দীক্ষাটা আপনিই আপনিই দিয়ে গেলেন। আপনার সন্তানকে সমবয়সী কাজের লোক দিয়ে তার সব কাজ করিয়ে নিচ্ছেন? তার ব্যাগ গুছানো, পানি খাওয়ানো, জুতার ফিতা বাঁধানো এই সব কাজ নির্ধিদ্বায় অন্যকে দিয়ে করিয়ে নেন। 

এভাবে সন্তান শিখে নেয়, কিভাবে নিজের ১০০% আরাম খুঁজতে হয় অন্যের ঘামের বিনিময়ে। বড় হয়ে সে কোন কাজের দায় নিতে চাইবেনা। আপনি যখন তাকে কোন বিষয়ে অভিযোগ করবেন, তখন সে উল্টো আপনাকে আরো বেশি বেশি অভিযোগ করবে। তাতে কি করবেন, শুধু পাওয়ার অভ্যসটা তো আপনিই তৈরি করে দিয়েছেন। কোন ফ্যামিলি প্রোগামে গেছেন, সব বাচ্চারা বসে আছে, কেউ খাচ্ছে না। আপনি তাড়াতাড়ি গিয়ে বেছে বেছে ভালো ভালো খাবার তুলে আপনার সন্তানের জন্য নিয়ে এলেন, ভালো মাংসটা যাতে অন্যের পাতে যেতে না পারে। 

 স্বামী যেন তার আত্নীয় বা কাউকে গিফট করতে না পারে, বা ঈদে অন্য কারো জন্য কিছু কিনতে না পারে সেজন্য সন্তানদের জন্য প্রয়োজনের থেকে বেশি শপিং করলেন, সন্তানের নামে বেশি বেশি খরচ করে স্বামীর হাতকে আটকে ফেললেন। খুব চালাকি করলেন, ফ্যামিলি পলিটিক্স করলেন, কারো কিছুই বলার নেই, স্বামী বেচারাও সায় দিতে বাধ্য। কিন্তু আপনি যে নিজেই নিজের পায়ে কুড়াল মারলেন ২০/২৫ বছর পর বুঝবেন। যখন দেখবেন আপনার সন্তানও ঠিক একই কায়দায় চলছে। বিপদে পরে সন্তানের কাছে কিছু চাইবেন সে সরাসরি বলে দেবে, হাত একেবারেই খালি। পারলে তোমার জমি বিক্রি করে আমাকে কিছু টাকা পাঠাও। কিন্তু আপনার কিছুই বলার থাকবে না, কারণ কৌশলটা আপনিই শিখিয়েছেন। আজ যে স্বার্থপরতার বীজ সন্তানের মনে বপন করলেন কাল তার ফল আপনাকে বুড়ো বয়সে ভোগ করতে হবে। সন্তান আপনার দায়িত্বের খবর নিতে ভুলে যাবে ঠিকই, কিন্তু মৃত্যুর পর সম্পত্তিতে ভাগের অধিকার চাইতে আসতে ভুলবে না। কারণ একচোখা স্বার্থপরতার বীজটা যে আপনার হতেই বপন করা হয়েছিল।
Blogger দ্বারা পরিচালিত.