পায়খানার গাদায় কাটে দিন, করোনার মাঝে কেমন আছে কলকাতা শহরের মেথররা


Highlights: 
২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল যে দেশের কোনো অংশেই খালি হাতে মল-মূত্র পরিষ্কার করার জন্য দলিতদের ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু আজও তারাই মানুষের মলমূত্র পরিষ্কার করছে।

Odd বাংলা ডেস্ক: করোনার প্রকোপে যখন আমরা সবাই নিজেদের বাড়ির ভেতরে সেঁধিয়ে আছি তখন ওরাই এই শহরকে পরিচ্ছন্ন করে রেখেছে। বিহারে ওদেরকেই 'মুসাহার' বলা হয়। কারণ মুসা কথাটার মানে হল ইঁদুর। আর বীনেরা ইঁদুরের মাংস খায়। কখনও খেয়াল করলে দেখবেন এই কলকাতার বিভিন্ন ম্যানহোলে প্রবেশ করেন বেশ কিছু মানুষ। তাদের কাছে পর্যাপ্ত  যন্ত্র থাকে না। তবু তারা প্রবেশ করে মাটির নিচে থাকা গভীর পাইপলাইনগুলিতে। তারপর সেখানকার মল-মূত্র সমস্ত হাতে করেই পরিষ্কার করেন। জ্যাম হয়ে থাকা পাইপ খোলার চেষ্টা করেন। এদের কেউ ডোম, কেউ মেথর আবার কেউ বীন জাতির সদস্য। এরা কিন্তু হিন্দু। তবে নিচু তলার বা নিচু জাতের হিন্দু। 

"২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল যে দেশের কোনো অংশেই খালি হাতে মল-মূত্র পরিষ্কার করার জন্য দলিতদের ব্যবহার করা যাবে না। প্রয়োজনে তাদের বিভিন্ন যন্ত্র দিতে হবে।"

কিন্তু কোথায় কি? আজও সমাজের বুকে মল-মূত্র যুক্ত সিউয়েজ পরিষ্কার করার জন্য দলিত তথা ডোম ও মেথরদের ব্যবহার করা হচ্ছে। ইংরেজরা গঙ্গার পূর্ব তীরে যে শহর কলকাতার পত্তন করেছিল, তা তৈরি হয়েছিল প্রধানত পলিমাটিতে আবৃত এলাকার উপর। তখনও কলকাতার অনেকটাই জঙ্গল ছিল। ব্রিটিশদের পরিকল্পিত শহর তৈরি শুরুই হয় জঙ্গল সাফ ও গাছ কাটার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। এ ছাড়া কলকাতার পূর্ব দিকে নোনা জলাভূমি (যেমন সল্ট লেক) ছিল। 

আরও পড়ুন: 

গোড়ায় শহরের বর্জ্য পরিষ্কার করার কোনও আধুনিক পরিকল্পনা ছিল না। সরাসরি সল্ট লেকের জলে এনে ফেলে দেওয়া হত শহরের যাবতীয় বর্জ্য। তিনি মনে করিয়ে দেন, ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষে (যা বাংলায় ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বলে কুখ্যাত) কলকাতা ও আশপাশের ৭৬,০০০ মানুষ মারা গেলে তাঁদের মৃতদেহও বিভিন্ন জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হয়। ১৮৬০ থেকে ১৮৬৬ পর্যন্ত সরকারি ভাবেই শহরের যাবতীয় ময়লা ও বর্জ্য সল্ট লেকে ফেলা হত। তখনও ভূগর্ভস্থ ময়লা নিষ্কাশনী ব্যবস্থা তৈরি হয়নি। ফলে, মানুষের মলও নির্বিচারে নদীতে ফেলা হত। এ সবের কারণে, কলকাতায় মাঝে মধ্যেই মহামারী হওয়াটা ছিল রুটিন ব্যাপার। প্রশাসনের মতে, শহরবাসীর (বিশেষত গরিবদের মধ্যে) যত্রতত্র মলত্যাগের অভ্যাস ছিল মহামারী হওয়ার অন্যতম কারণ।

"কলকাতার মানুষ বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ২০,০০০ কোটি লিটার মল ত্যাগ করে। এবং প্রায় ৬০,০০০ কোটি লিটার সুয়েজ তৈরি করে। অতএব ১ জন মেথরকে কমপক্ষে ২০ হাজার লিটার মল পরিষ্কার করতে হয়"  

ইংরেজরা এই মহামারির ঘটনা দেখে প্রথম ভুগর্ভস্থ পাইপলাইনের ব্যবস্থা করে। কিন্তু সেই পাইপলাইন কখনও জ্যাম বা আটকে গেলে কে সেটা পরিষ্কার করবে। তখনই কাজে লাগানো হয় এই নিতু তলার মানুষদের।
CLICK-BUTTON
 


মেথর, ডোম, হাড়ি, ধাঙড় প্রভৃতি নানা নাম ও পরিচয়ে পরিচিত এই মানুষগুলি শুধু সমাজের নিচুতলাতেই বাস করতেন তাই নয়। তাঁরা অস্পৃশ্য বলে চিহ্নিত হতেন। এরা যে অস্পৃশ্যদের মধ্যেও সবচেয়ে তলায়, তার ইঙ্গিত মেলে জনপ্রিয় প্রবাদে, ''হাড়ির দশা'' বা "যার যেথা মজে মন, কিবা হাড়ি কিবা ডোম।"  গ্রামসমাজে হাড়ি ডোমরা চিরাচরিতভাবে ময়লা সাফাইয়ের কাজ করলেও কলকাতায় ধাঙড়দের একটা বড় অংশ এসেছেন ছোটনাগপুর এলাকার আদিবাসী সমাজ থেকে। তাদের এই কাজ করার কথা নয়। এদিকে সুপ্রিম কোর্টের আইন থাকলেও এখনও এই কাজগুলি খালি হাতেই করা হচ্ছে। স্বাধীনতার আগেও এটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি এখনও কোনও চিন্তাভাবনা নেই। ১৮৮০ সালের হিসেবে দেখা যায়, শহরের ৪০,০০০ বাড়ির মধ্যে মাত্র ৬,০০০ বাড়িকে ভূগর্ভস্থ পয়ঃপ্রণালীর সঙ্গে যুক্ত করা গিয়েছে। ওই সময় কলকাতায় নথিভুক্ত ধাঙড় বা মেথরের সংখ্যা ১১,০০০ এবং তাঁরা ২৪,০০০ বাড়ির ময়লা প্রতিদিন পরিষ্কার করার দায়িত্বে ছিলেন। এই ধাঙড়রা কলকাতাতেই বাস করতেন। কিন্তু তাঁদের থাকার জায়গাগুলি ছিল খুবই নিম্নমানের। তা ছাড়া ধাঙড়দের পরিবারের স্বাস্থ্য বা ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা ইত্যাদি নিয়ে কোনও ব্যবস্থাই কলকাতা কর্পোরেশনের তরফে করা হয়নি। জাতীয় কংগ্রেসের অনেক নেতা, যেমন চিত্তরঞ্জন দাশ, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত বা সুভাষচন্দ্র বসু বিভিন্ন সময়ে কলকাতা কর্পোরেশনের দায়িত্বে থাকলেও মেথর বা ধাঙড়দের সমস্যা নিয়ে কখনই মাথা ঘামাননি। 
Blogger দ্বারা পরিচালিত.