ভৌতিক গল্প: ডেথ ভ্লগার



বিক্রম পাঠক: কল্যাণ মারা গিয়েছে। সুমির কাছে ফোনটা আসতেই একটা ক্যাব বুকে করে, সে পৌঁছে যায় কল্যাণের বাড়িতে। ছেলেটা যে ওর খুব ভাল বন্ধু ছিল তা নয়। তবে কল্যাণদের বাড়ি বেশ কয়েকবার গেছে। সুমি গিয়েই প্রথমে দেখে কল্যাণের মৃতদেহটা বিভৎস হয়ে গিয়েছে। কল্যাণ ওর বাবার সার্ভিস রিভলভারটা দিয়ে নিজের মাথাতেই গুলি চালিয়েছে। গুলিটা কপাল থেকে এফোর ওফোর হয়ে যায়। আর সে কারণেই কিছুটা ঘিলু ছিটকে গিয়ে দেওয়ালে লেগে যায়। পুলিশ আসার আগেই কল্যাণের ঘরে ঢুকে সুমি নিজের ফোন ক্যামেরা দিয়ে একটা ভিডিও করে গোটা ঘরটার। কল্যাণের বাবা-মা তখন নিজেদের মধ্যে নেই। পাশের ঘর থেকে চিৎকার ভেসে আসছে। কল্যাণের বাবা বলছে, 'আমি এ দৃশ্য দেখতে পারব না। ছেলেটা এইভাবে মরে গেল গো! ছেলেটা এই ভাবে মরে গেল? '

কল্যাণ খুব ভাল ছাত্র ছিল। আশুতোষ কলেজে ফিজিক্স অনার্স নিয়ে পড়ছিল। সুমিও ওর সঙ্গেই পড়ে। না! পড়ত। সুমি এগিয়ে যায় কল্যাণের পড়ে থাকা মৃতদেহটার দিকে। কল্যাণের চোখ দুটো খোলা। রক্ত ফুটে আছে চোখে। সুমি মোবাইলের ক্যামেরার ফ্ল্যাশটা অন করে কাছে গিয়ে আরও একটা ভিডিও করে। সুমির এই অভ্যাসটা গত ৩-৪ মাস ধরে বেড়েছে। আগে ও খুব বেশি সেল্ফি তুলতো, এখন সবকিছু ভিডিও করে। ক্যামেরা নিজের দিকে করে কথা বলে। আসলে সুমি ইউটিউবে একজন সফল Vlogger হতে চায়। Vlog মানে Video Blog আর কি! সারাদিন সবকিছু ভিডিও করে। এবং তারপর দিনের শেষে সেগুলি এডিট করে ইউটিউবে আপলোড করে দেয়। আজকেও সুমি সেটাই করবে। ইতিমধ্যেই পুলিশ এসে গেল। সুইসাইড কেস। কল্যাণের মৃতদেহটা একটা পলিথিনে প্যাক করে গাড়িতে তোলা হল। কল্যাণের বাবা-মার পাশে সুমি দাঁড়িয়ে ছিল। কল্যাণের ছোট ভাই ক্লাস টুয়েলভে পড়া রনির চোখে মুখে আতঙ্ক। কল্যাণের বাবা নিজেই কলকাতা পুলিশে চাকরি করে । বাড়িতে সার্ভিস রিভলভার কেন নিয়ে এসেছিলেন এসব বিষয়ে পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল। সুমি কল্যাণের ঘরের দিকে আবার গেল। দেখল পুলিশ মৃতদেহর চারিদিকে একটা চক দিয়ে দাগ কেটে দিয়েছে। এতদিন সুমি সিনেমাতে এরকম দেখেছে। মোবাইলটা বের করে সুমি আবার একটা ভিডিও করল। 

সেদিন পুলিশ চলে যাওয়ার পর সুমিও কল্যাণের বাবা-মাকে সান্তনা দিয়ে নিজের বাড়ি ফিরে আসে। রাতে নিজের ঘরে বসে অন্ধকারের মধ্যেই সুমি তখন তাঁর ভিডিওটা এডিট করছে। কয়েকটা হরর সাউন্ড ডাউনলোড করেছে সুমি। খুব ভয়ঙ্কর হয়েছে ভিডিওটা। নিজের মোবাইলে একটা ভয়েসওভার দিয়ে ভিডিওর পেছনে লাগিয়েও দিল। তারপর আর কি! আপলোড করল সেই ভিডিওটা ইন্টারনেটে। যখন আপলোড হচ্ছে সুমি নিজের কম্পিউটারের দিকে এক নাগারে তাকিয়ে বসে ছিল। রাত অনেক হয়েছে। এডিট করতে করতে তাঁর খেয়ালই ছিল না যে রাস্তার দিকের জানলাটা বন্ধ করা হয়নি। উঠে গিয়ে নিজের টি শার্টটা খুলে ফেলে সুমি। নিজের হাতটাকে পিছনে নিয়ে গিয়ে ব্রায়ের হুকটা খোলার চেষ্টা করে। হঠাৎ পিঠে একটা ঠান্ডা হাত অনুভব করে সুমি। আঁতকে ওঠে প্রায়। কিছু বুঝতে পারে না প্রথমে। একটু ভয় পায়।  ঘুরে তাকিয়ে দেখে জানলাটা খোলা। এগিয়ে গিয়ে জানলাটা লাগাতে যায়। হঠাৎ চোখে পড়ে রাস্তার ওপারে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে একটা লোক তাঁর জানলার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। সুমি চোখটাকে ছোট ছোট করে বোঝার চেষ্টা করে লোকটা কে? চোখটাকে দুহাত দিয়ে কচলে নেয়। আবার তাকাতেই সুমি অবাক। লোকটা হাওয়া। সুমি ব্যাপারটাকে নেহাতই কোইন্সিডেন্ট মনে করে জানলাটা লাগিয়ে এসে নিজের ব্রা ও প্যান্টিটা খুলে নিয়ে নাইট গাউনটা পরে নেয়। বাইরে ড্রয়িং রুমে বাবা তখনও জেগে। খেলা দেখছে। সুমি খেয়াল করল ভিডিও আপলোড কমপ্লিট হয়েছে। সুমি ভিডিওটার টাইটেল দিয়েছে  Death Vlog। পাবলিশ করে দেয় ভিডিওটা। 

সকালে প্রতিদিন সুমিকে তার বাবা ঘুম থেকে ডেকে দেয়। আজ পর্যন্ত কখনওই সুমি নিজে ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করেনি। কিন্তু আজ বেশ কিছুক্ষণ ধরে ডাকাডাকি করেও সুমির কোনও সারা মিলছে। সুমির বাবা বেশ কিছুক্ষণ দরজা ধাক্কা দিচ্ছে। কিন্তু কোনও লাভ নেই মেয়ের কোনও সাড়া শব্দ মিলছে না। সুমির বাবা একটু ভয় পান। মেয়েটার কী হল?  ডোর লকের চাবিটা নিয়ে নিজেই দরজাটা আনলক করে সুমির বাবা । ঘরে ঢুকতেই যে দৃশ্য সুমির বাবা দেখে  তাতে তার শিরদ্বারা বেয়ে শিহরণ নেমে আসে। ঘরের একটা দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে সুমি। পায়ের কাছটা ঘিরে চাপ চাপ হয়ে পড়ে আছে রক্ত। গলার কাছটা লম্বা করে চিরে ফেলেছে। হাতে একটা চাকু।  চিৎকার করে ওঠে সুমির বাবা। শোরগোল পড়ে যায় গোটা পাড়াতে। সুমির মা ঘরে ঢুকেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায় মাটিতে। কিছুক্ষণ পড়ে পুলিশ আসে ঘটনাস্থলে। সুমির মৃতদেহ তুলে নিয়ে যায় দুই কন্সটেবল এসে। বাড়ির বাইরে তখন পাড়ার অনেক লোক। কয়েকজন অফিসরা গোটা ঘরটা সার্চ করে। তাদের প্রাথমিক অনুমান এটা আত্মহত্যার ঘটনা। এক অফিসার চিৎকার করে তার বড়বাবুকে ডাকে। স্যার এখানে একটা ক্যামেরা। এখনও রেকর্ডিং চলছে। সিনিয়র অফিসারটি এসে ক্যামেরাটা তুলে নেয়। যেখানে সুমির মৃতদেহ পড়েছিল তার ঠিক উল্টোদিকে একটা টেবিলে রাখা ক্যামেরাটা। ভিডিওটাকে রিওয়াইন্ড করে আবার চালায় পুলিশ অফিসার। 

ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যায় সুমি চোখ বন্ধ অবস্থাতেই ঘুম থেকে উঠে ক্যামেরাটা টেবিলে রাখে। তারপর সামনের দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে থাকে মাথা নিচু করে। হাতে একটা চাকু। অনেকটা সময় এভাবেই বসে থাকে সুমি। বিরবির করে কী যেন বলতে থাকে সুমি। কথাগুলো অস্পষ্ট। তারপর একটা সময় হঠাৎ মাথা তুলে তাকায় ক্যামেরার দিকে। হাতের চাকুটা আচমকা চালিয়ে দেয় নিজের গলার ওপর। একটু একটু করে রক্ত ছিটকে বেরিয়ে আসে। সে কি ভয়ঙ্কর দৃশ্য।  অনেকক্ষণ কাতরাতে থাকে সুমি। তারপর একটা সময় সব থেমে যায়। নিস্তেজ হয়ে যায় সে। 

আরেকজন পুলিশ অফিসার সুমির ঘরে কম্পিউটারের দিকে তাকায় সেটা তখনও খোলা। ইউটিউবে সুমির অ্যাকাউন্ট খোলা। সিনিয়র অফিসারের চোখ যায় সেদিকে। সুমির অ্যাকাউন্টে শেষ ভিডিও আপলোড হয়েছে রাত ৩টার সময়। আর সেই ভিডিওটা হল সুমির আত্মহত্যার ভিডিওটা। চমকে ওঠে অফিসারটি। সুমি ঘরে তো সে ছাড়া আর কেউ ছিল না। তাহলে তার মৃত্যুর পরে তারই নিজের আত্মহত্যার ভিডিও আপলোড করল কে? 


[এই গল্পের স্বত্ব oddbangla.com -এর। কপিরাইট ( Copyright Disclaimer Under Section 107 of the Copyright Act 1976) নিয়ম মোতাবেক বিনা অনুমতিতে এর ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ]

পরিবেশক: oddbangla.com 
প্রচ্ছদ ও অলঙ্করন: Uro Digi Art
Blogger দ্বারা পরিচালিত.