বিশাখাপত্তনমের গ্যাস দুর্ঘটনা ফিরিয়ে দিল ভোপালের সেই ভয়ঙ্কর রাতের স্মৃতি



Odd বাংলা ডেস্ক: ভোপালের বেশিরভাগ বাসিন্দা গভীর ঘুমে। ইউনিয়ন কার্বাইড কারখানার পাঁচিলের বাইরে চালাঘরগুলোর বাসিন্দাদের জন্যও সে রাতটা ছিল আর পাঁচটা রাতের মতই। সেখানে কারখানা তৈরি হয়েছে ১৯৬৯ সালে - চরম বিপদজনক রাসয়নিক মিথাইল আইসোসায়ানেট ব্যবহার করে কীটনাশক উৎপাদন করছে তারা। কারখানার গায়ে লাগোয়া বস্তিগুলোতে বাস বহু মানুষের। কাছেই ভোপাল শহরের পুরনো এলাকাতেও থাকে হাজার হাজার মানুষ।


রাত প্রায় একটা:

এই সময়ই কারখানা এলাকায় কিছু বস্তিবাসীর প্রথম নাকে আসে একটা দুর্গন্ধ- তাদের চোখ জ্বলতে শুরু করে। কেউ কেউ বলেন ''মনে হচ্ছে ধারেকাছে কেউ লংকা পোড়াচ্ছে।'' অবস্থা আরো খারাপের দিকে মোড় নেয় - গন্ধ আরো জোরালো হয়ে ওঠে। মানুষ অল্পক্ষণের মধ্যেই নিঃশ্বাস নিতে কষ্টের কথা বলতে শুরু করে। অনেকে বমি করতে শুরু করে। শহর ও শহরতলিতে ভীতি ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। হাজার হাজার মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে শুরু করে। ''দেখা যায় মানুষ মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে - তাদের মুখ দিয়ে ফেনা বেরচ্ছে - অনেকে চোখ জ্বালার কারণে চোখ খোলা রাখতে পারছে না।'' হাজেরা বাই পাঁচ বছর আগে বিবিসিকে বলেন, সেই ভয়ঙ্কর রাতের স্মৃতি তিনি কখনও ভুলবেন না - ''মাঝরাত নাগাদ আমার ঘুম ভেঙে গেল- দেখলাম মানুষজন রাস্তায় নেমে এসেছে- যে কাপড়ে ঘুমোচ্ছিল সেই কাপড়েই তারা বেরিয়ে এসেছে - কারো কারো গায়ে শুধু অর্ন্তবাস।'' ভয়ে লোকজন এলাকা ছেড়ে পালাতে শুরু করেছে আর তা করতে গিয়ে আরো গ্যাস নিঃশ্বাসের সঙ্গে টানছে। ''বিষাক্ত ওই গ্যাস ছিল বাতাসের থেকে ভারী- কাজেই মজুত ট্যাংক থেকে বেরন গ্যাসে ঘন মেঘের আস্তরণ তৈরি হয়,'' ২০০৯ সালে ওই কালোরাত্রির কথা বর্ণনা করতে গিয়ে জানান সেসময় ভোপালের পুলিশ প্রধান স্বরাজ পুরি- ''ওই গ্যাসের মেঘ কারখানার চারপাশের বাতাসে ভর করে নিঃশব্দে এগিয়ে চলে।''


ভোররাত আড়াইটা:

কারখানায় বিপদসংকেত সাইরেন বেজে ওঠে। লোকে চিৎকার করতে থাকে, ''কারখানা থেকে গ্যাস লিক করছে।'' ''আমাদের দম বন্ধ হয়ে আসে- চোখ জ্বলতে থাকে। ঘন গ্যাসের ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে তখন রাস্তা দেখতে পাচ্ছি না, সাইরেনের শব্দে কান ফেটে যাচ্ছে- কোনইদকে দৌড়ব কিছুই আমরা বুঝে উঠতে পারছি না- সকলেই উদভ্রান্ত।'' ১৯৮৪-র ওই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর বিবিসিকে বলেন এলাকার বাসিন্দা আহমেদ খান। মিঃ খান জানান মানুষ তখন ভয়ে দিশেহারা হয়ে ছুটছে। ''মা জানে না তার সন্তান মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে, সন্তান জানে না তার মাকে সে হারিয়েছে। পুরুষরা জানে না তাদের গোটা পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।'' সেসময় বিবিসির সংবাদদাতা মার্ক টালি তখন খবর দিচ্ছেন ''শহরের প্রধান হাসপাতাল মানুষের ভিড়ে উপছে পড়ছে, ক্রমাগত গ্যাস আক্রান্ত মানুষকে নিয়ে আসা হচ্ছে।'' ''রাস্তার ওপর হাজার হাজার মরা বিড়াল, কুকুর, গরু এবং পাখির স্তুপ- শহরের মর্গ ভরে উঠছে মৃতদের ভিড়ে।''




ভোর চারটা:

ভোপালের সাবেক পুলিশ প্রধান মিঃ পুরি বিবিসিকে বলেন ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে বিপর্যয়ের ব্যাপকতা সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা তারা পান। ''আমার ও আমার কর্মচারীদের ওপর মৃতদেহ সরানোর দায়িত্ব পড়ে। তখন বুঝতে পারি কী অবস্থা। চর্তুদিকে শুধু লাশ আর লাশ।'' ''আমার মনে হচ্ছিল- হে ঈশ্বর- একী ঘটল? কী হচ্ছে- আমরা স্থবির হয়ে গিয়েছিলাম- বুঝতে পারছিলাম না কী করব- কীভাবে সব সামাল দেব?'' নিহতের সংখ্যা তখন ক্রমশই বাড়ছে। ৭২ ঘন্টায় ৮০০০-এর বেশি মানুষ মারা গেছে। এর পরের কয়েকমাসে আরো কয়েক হাজার প্রাণহানি ঘটেছে। সরকার দাবি করেছে বিষাক্ত গ্যাসে মোট ৫,২৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু বেসরকারি সংস্থাগুলোর হিসাবে এই দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বিশ হাজারের বেশি। পরিবেশবাদীরা বলে আসছেন ওই কারখানা থেকে নির্গত বিষ এখনও এলাকার মাটি ও ভূগর্ভস্থ জলকে বিষাক্ত করছে। কিন্তু রাজ্য সরকার এই দাবি মানতে নারাজ- তাদের মতে কারখানা এলাকার জল নিরাপদ। ভোপাল বিপর্যয় নিয়ে আন্দোলনকারী এবং ক্ষতিগ্রস্তদের নিয়ে কাজ করছেন যারা তারা দাবি করছেন ওই ঘটনার শিকার দেড় লাখ মানুষ ক্যান্সার, অন্ধত্ব, যকৃৎ ও কিডনির নানা অসুখে ভুগছেন। তাদের প্রকাশিত নানা প্রতিবেদনে তারা তুলে ধরেছেন ভোপালের শিশুরা নানাধরনের জন্মগত পঙ্গুত্বের শিকার- ওই বিপর্যয়ের পর জন্ম নেওয়া শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি হয়নি- তাদের অনেকে ক্যান্সার ও নানা জটিল রোগে ভুগছে।
বিশাখাপত্তনমের গ্যাস দুর্ঘটনা ফিরিয়ে দিল ভোপালের সেই ভয়ঙ্কর রাতের স্মৃতি বিশাখাপত্তনমের গ্যাস দুর্ঘটনা ফিরিয়ে দিল ভোপালের সেই ভয়ঙ্কর রাতের স্মৃতি Reviewed by Odd Bangla Editor on May 08, 2020 Rating: 5
Powered by Blogger.