সমুদ্রের ফসল বালতিতে ফলাচ্ছেন এই ব্যক্তি, ৫০ বালতি মুক্তোর দাম সাড়ে ৪ লক্ষ টাকা


ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায়, Odd বাংলা: এতদিন হয়তো আপনারা জানতেন যে, মুক্তো কেবলমাত্র সামুদ্রিক ঝিনুক থেকেই পাওয়া যায়, কিন্তু কেরলের এই ব্যক্তি আপনার এই ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করতে পারে। কারণ তিনি নিজের বাড়ির উঠোনেই সফলভাবে মুক্ত চাষ করেন। হ্যাঁ, আপনি একদম ঠিকই পড়েছেন।

মুক্তো চাষ থেকে আয়
গত ২০ বছর ধরে ৬৫ বছর বয়স্ক কে জে মাথাচান পশ্চিমঘাট পর্বতমালা থেকে উদ্ভূত নদীর জল স্বাদু জল ব্যবহার করে তাতেই ঝিনুকের চাষ করছেন। এইভাবে ঝিনুক লালন-পালন করে তিনি বছরে ৫০ বালতি মুক্ত উৎপাদন করেন। যার ফলে প্রত্যেক ১৮ মাসে তাঁর আয় হয় সাড়ে চার লক্ষ টাকা। আর এইসব মুক্ত বেশিরভাগই রফতানি করা হয় অস্ট্রেলিয়া, সৌদি আরব, কুয়েত এবং সুইজারল্যান্ডে।   


কীভাবে এমনটা করা হয়?
কে জে মাথাচান সৌদি আরবের দাহরান-এ কিং ফহড ইউনিভার্সিটি অব পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মিনরেল-এর টেলিকমিউনিকেশনের অধ্যাপক হিসাবে কাজ করার সময় একবার আরামকো(ARAMCO) তেল কোম্পানির হয়ে একজন অনুবাদক হিসাবে (আরবি থেকে ইংরেজি) চিনে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। মাথাচান বলেন, সেই সফরকালে, তিনি চিনের উক্সিতে দানশুই মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রে গিয়েছিলেন। ফিশারিতে তাঁর বরাবরই আগ্রহ বেশি। আর সেই কারণেই আগ্রহ বশে তিনি তাদের বিভিন্ন পাঠ্যক্রমগুলি অন্বেষণ করছিলেন আর ঠিক তখনই তিনি মুক্তো চাষের ওপর ডিপ্লোমা কোর্সটি সম্পর্কে জানতে পারেন। তাঁর মনে হয়েছিল ভারতে মুক্তোচাষ বিষয়ে মানুষের ধারণা খুব কম, তাই কেমন হয় যদি তিনি এটির অন্বেষণ করেন। 

এর কয়েক সপ্তাহ পরে, মাথাচান তাঁর চাকরি ছেড়ে ডিপ্লোমা কোর্সের জন্য চিনে চলে আসেন। ছয় মাস পরে, তিনি এই কোর্সটি শেষ করেন এবং ১৯৯৯ সালে কেরালায় ফিরে এসে, তাঁর নিজের উঠোনে মুক্তো চাষ শুরু করেন। এত দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য অনেকেই তাঁর সমালোচনাও করেছিলেন, কিন্তু তিনি একপ্রকার নিশ্চিত ছিলেন যে এই ব্যবসাটি একেবারে অনন্য হবে এবং অবশ্যই তা কার্যকর হবে। 

এরপর তিনি স্বাদু জল থেকে ঝিনুক সংগ্রহের কাজ শুরু করেন, যার অধিকাংশ মহারাষ্ট্র থেকে আনা হয়েছিল এবং কিছু পশ্চিমঘাট পর্বত থেকে উৎপন্ন নদীগুলি থেকেও নিয়ে আসা হয়েছিল। সেগুলিকে তিনি বাড়ির উঠোনে বালতির মধ্যে করেই চাষ করা শুরু করেন। ১৮ মাস চাষ করার পর তিনি ৫০ বালতি মুক্তো উৎপাদন করেছিলেন। 

প্রথমবার চাষের জন্য তিনি দেড় লক্ষ টাকা মতো বিনিয়োগ করেছিলেন, কিন্তু ১৮ মাস পর উৎপাদিত মুক্তোর বাজারদর সাড়ে চার লক্ষ টাকা। অর্থাৎ ৩ লক্ষ টাকা লাভ হয়েছিল তাঁর। সেই থেকে তাঁর ব্যবসা অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে তিনি আগ্রহী মানুষদের মুক্তো চাষ করা শেখানও, তার জন্য লাইসেন্সও রয়েছে তাঁর কাছে। 


কিন্তু যে মুক্তোর সমুদ্রে জন্মায়, বালতিতে তার চাষ কীভাবে সম্ভব?
মাথাচান জানান, মুক্তো সাধারণত তিন ধরণের কৃত্রিম, প্রাকৃতিক এবং অনুশীলিত বা কালচার্ড। আর এই কালচার্ড পার্লই তিনি প্রায় ২১ বছর ধরে চাষ করে আসছেন। আর ভারতে স্বাদুজলের মুক্তো সহজেই পাওয়া যায় বলে এই মুক্তোর চাষ করা সবচেয়ে সহজ বলে জানান তিনি। 

নদী থেকে সংগ্রহ করা ঝিনুকগুলি সূক্ষ্মভাবে খোলা হয় এবং এর ভিতরে একটি মুক্তোর নিউক্লিয়াস জমা হয়। এরপর ঝিনুকগুলি পাত্রের জলে পুরোপুরি ডুবিয়ে রাথা হয় (১৫-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়)। ১৮ মাস ধরে, নিউক্লিয়াস ঝিনুকের শাঁস থেকে ক্যালসিয়াম কার্বনেট সংগ্রহ করে মুক্তোর বিকাশ ঘটে। নিউক্লিয়াসটি প্রায় ৫৪০টি স্তর গঠন করে, যার ফলে দুর্দান্ত সব মুক্তো তৈরি হয়। অস্ট্রেলিয়া, সৌদি আরব, কুয়েত এবং সুইজারল্যান্ডে এইরকম কালচার্ড মুক্তোর চাহিদা বেশি। 

আসল মুক্তোর দাম-
মাথাচান বলেন, ভারতের বাজারে পাওয়া অধিকাংশ মুক্তোই দেখতে আসলের মতো, কারণ এর ওপর সিন্থেটিক পার্ল কোটিং দেওয়া থাকে। একটি আসল মুক্তো দাম ৩৬০ টাকা প্রতি ক্যারেট এবং ১৮০০ টাকা প্রতি গ্রাম হয়ে থাকে। একসঙ্গে বিপুল পরিমাণে মুক্তো চাষের জন্য মাথাচান একটি কৃত্রিম ট্যাঙ্কও তৈরি করেছেন। 
Blogger দ্বারা পরিচালিত.