এই নারীর প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে আত্মহত্যা করেন ১৩ পুরুষ!

Odd বাংলা ডেস্ক:  বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের পারস্যের এই গোঁফ বিশিষ্ট পুরুষালী চেহারার রাজকন্যাই ছিলেন তৎকালীন সমাজের দৃষ্টিতে সেরা সুন্দরী। আপনি কি বিশ্বাস করবেন? আপনি বিশ্বাস না করলেও বিশ্বের হাজার হাজার মানুষ ঠিকই বিশ্বাস করেছে। 

গত কিছুদিন ধরে ইন্টারনেটে মিম আকারে এই ছবিটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দাবি করা হচ্ছে, প্রিন্সেস কাজার নামের এই নারীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছে অনেক পুরুষ।

এই নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়ে অনেক পুরুষ। এদের মধ্যে ১৩ জন পুরুষ প্রত্যাখ্যাত হয়ে আত্মহত্যা করে। তবে কেন তার জন্য ১৩ জন পুরুষ আত্মহত্যা করেছিল? অথবা আদৌ কি করেছিল? আজ জানবো সে সম্পর্কে- 

এটি ফটোশপ করা কিংবা সিনেমার শ্যুটিংয়ের দৃশ্য না। তার প্রমাণ ইতিহাস থেকে পাওয়া যায়। তবে মিমটিতে যেরকম দাবি করা হয়েছে, ছবির নারীর নাম 'প্রিন্সেস কাজার' নয়, তার প্রকৃত নাম ফাতেমা খানম। তার উপাধি ইসমত উদ-দৌলা। তিনি সংক্ষেপে প্রিন্সেস ইসমত নামেই অধিক পরিচিত।



প্রিন্সেস ইসমত তৎকালীন পারস্যের কাজার রাজবংশের রাজা নাসিরউদ্দিন শাহ কাজার এবং তার স্ত্রী তাজ উদ-দৌলার দ্বিতীয় কন্যা। কাজার রাজবংশের রাজকন্যা হওয়ার কারণেই মিমটিতে তাকে প্রিন্সেস কাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও এর ফলে তার প্রকৃত পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।

কাজার রাজবংশ ছিল পারস্যের দীর্ঘস্থায়ী রাজবংশগুলোর মধ্যে একটি। তুর্কি বংশোদ্ভূত কাজার গোত্রের এ রাজবংশীয় শাসন স্থায়ী হয় ১৭৮৫ সাল থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত। এ রাজবংশের তৃতীয় রাজা ছিলেন শাহেনশাহ নাসিরউদ্দিন শাহ কাজার। 

তিনি তার পিতা মোহাম্মদ শাহ কাজারের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে ক্ষমতা পান। তার শাসনকাল ছিল পারস্যের ইতিহাসের তৃতীয় দীর্ঘস্থায়ী শাসনকাল। ১৮৪৮-১৮৯৬ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হন। নিহত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত প্রায় অর্ধ শতাব্দী ব্যাপী তিনি পারস্যের শাসনকর্তা ছিলেন। 

তাকে কাজার রাজবংশের সবচেয়ে যোগ্য এবং সফল শাসক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার সময়ে পারস্যের ব্যাপক আধুনিকায়ন হয়। এর ফলে পারস্যে ইউরোপীয়দের প্রভাব-প্রতিপত্তি অনেক বৃদ্ধি পায়। নাসিরউদ্দিন শাহ কাজারের ছেলে মেয়ে ছিল ২১ জন। তাদেরই একজন ছিলেন ইসমত উদ-দৌলা। 

ধারণা করা হয় প্রিন্সেস ইসমত ১৮৫৫ অথবা ১৮৫৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। নাসিরউদ্দিন শাহের সময় পারস্যের আধুনিকায়নের ছোঁয়া লাগে তার রাজ দরবারেও। প্রিন্সেস ইসমত এবং তার সৎ বোন প্রিন্সেস তাজ আস্‌-সুলতানা ছিলেন সে সময়ের তুলনায় বেশ আধুনিক দুই নারী। 

প্রচলিত রীতি ভঙ্গ করে পিয়ানো বাজানো শিখেছিলেন প্রিন্সেস ইসমত। তার শখ ছিল ছবি তোলার। আর ওই ছবি থেকে একটি ছবি ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়েছে। সেটি ফটোশপ করা বা কোনো অভিনয় শিল্পীর ছবি না। সেটি প্রিন্সেস ইসমতের নিজেরই ছবি। আর এই ছবিটি তুলেছিলেন তার স্বামী দাস্ত মোহাম্মদ খান। 

তবে ছবিটি আসল হলেও এর দাবিটি যে ভিত্তিহীন, তা অনেকভাবেই বোঝা যায়। প্রথমত মিমগুলোতে দাবি করা হয়, প্রিন্সেস কাজার ছিলেন বিংশ শতাব্দীর পারস্যের সৌন্দর্যের প্রতীক। তবে বাস্তবে প্রিন্সেস ইসমত বিংশ শতাব্দীর খুব কমসময়ই জীবিত ছিলেন। 

তার মৃত্যু হয়েছিল ১৯০৫ সালে। মৃত্যুকালীন সময় তার বয়স ছিল ৫০ বছর। আর এই ছবিটি দেখে জানা যায়, ছবিটি তার স্বামী তুলেছিলেন বিংশ নয়, উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগের কোনো একসময়। 

দ্বিতীয়ত, মিমটিতে প্রিন্সেস ইসমতের প্রকৃত নাম ব্যবহার না করাও সন্দেহের উদ্রেক করে। যদি সত্যিই তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাকে বিয়ে করতে চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়ে একজন, দুইজন না, ১৩ জন পুরুষ আত্মহত্যা করত, তাহলে ইতিহাসে তার নামটি বেশ পরিচিত হওয়ার কথা ছিল।

তবে মিমটিতে তার প্রকৃত নাম উল্লেখ না করে প্রিন্সেস কাজার। যা থেকে পরিষ্কারভাবে বোঝা সম্ভব না যে এখানে ঠিক কোন প্রিন্সেসের কথা বলা হচ্ছে। এরফলে অনেকেই ছবিটিকে ইসমতের সৎ বোন জাহারা খানম তাজ আস্‌-সুলতানার ছবি বলে ভুল করেছেন। 

সম্ভবত এই মিমটি যিনি তৈরি করেন, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ধোঁয়াশা সৃষ্টির জন্য ইসমতের প্রকৃত নাম উল্লেখ না করে তাকে শুধু প্রিন্সেস কাজার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যেন আগ্রহীদের পক্ষে এর প্রকৃত ইতিহাস খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়। কাজার সাম্রাজ্যের উপর ফারসি ভাষায় বেশ কিছু বই আছে।

নাসিরউদ্দিন শাহের শাসনামল নিয়েও ইতিহাস রচিত হয়েছে। এমনকি, কাজার সাম্রাজ্যের নারীদের পোশাক-আষাক এবং গোঁফ রাখার অদ্ভুত সংস্কৃতির উপরেও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানি অধ্যাপক ড. আফসানেহ নাজমাবাদির একটি বই আছে। 

তবে এই বইয়েও প্রিন্সেস ইসমত বা অন্য কোনো রাজকন্যার জন্য ১৩ জন পুরুষের আত্মহত্যার কোনো ঘটনা উঠে আস নি। এমনকি এগুলোতে প্রিন্সেস ইসমতকে অত্যন্ত গুণী এবং প্রভাবশালী হিসেবে উল্লেখ করলেও তিনি সৌন্দর্যের প্রতীক ছিলেন। তবে পারস্যের পুরুষরা তার জন্য পাগল ছিল, এমন কোনো দাবি করা হয়নি।

১৮৬৬ সালে, যখন তার বয়স মাত্র ১০ বছর, তখন প্রায় সমবয়সী দাস্ত মোহাম্মদ খানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। সে সময় পারস্যে বাল্য বিবাহ ছিল খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। ইসমতের সৎ বোন তাজ আস-সুলতানারও বিয়ে হয়েছিল মাত্র ৯ বছর বয়সে। 

কাজেই ইসমতের রূপ দেখে যদি মানুষ মুগ্ধ হয়ও, তবুও একজন বিবাহিতা রাজকন্যাকে পুনরায় বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার বিষয়টি সে সময়ের পারস্যের সমাজের প্রেক্ষিতে খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। পুরো দাবিটির মধ্যে যে একমাত্র বিষয়টির সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যায়, তা হলো, সে সময় পারস্যে আসলেই নারীদের গোঁফ রাখার প্রচলন ছিল এবং সেটিকে নারীর সৌন্দর্যের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। 

ড. আফসানেহ নাজমাবাদির মতে, ঊনবিংশ শতাব্দীর পারস্যের কাজার গোত্রের শৌখিন নারীরা সৌন্দর্যচর্চার অংশ হিসেবে হালকা গোঁফ রাখতে পছন্দ করতেন। তবে তার বর্ণনা থেকেই দেখা যায়, এই মিমটিতে যেরকম দাবি করা হয়েছে, শখটি বিংশ শতাব্দীর নয়, বরং ঊনবিংশ শতাব্দীর।

অনেকে যে সন্দেহ করেছেন, প্রিন্সেস কাজার বলতে আসলে ইসমত না, বরং তার সৎ বোন তাজ আস্‌-সুলতানাকে বোঝানো হয়েছে, তার পেছনেও একটা কারণ আছে। আধুনিক মাপকাঠিতে তাজ আস্‌-সুলতানাকে ইসমতের তুলনায় অনেক বেশি সুন্দরী বলে মনে হতে পারে। 

এছাড়া তাজ আস্‌-সুলতানা ছিলেন একইসঙ্গে নারীবাদী ও জাতীয়তাবাদী। তিনি নিজে হিজাব পরিত্যাগ করেছিলেন, নারীদের আধুনিক শিক্ষা ও চাকরি এবং পারস্যের সংবিধান সংশোধনের পক্ষে মতামত গড়ে তুলেছিলেন। তবে তার ব্যাপারেও ইতিহাসে ১৩ জনের আত্মহত্যা সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।

তবে যারা এর সত্যতা অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেছেন, তাদের সামনে উঠে এসেছে ঊনবিংশ শতাব্দীর দুই নারীর জীবনী। যাদের সৌন্দর্যের চেয়ে অন্যান্য কর্মকাণ্ডই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ইতিহাসবিদ ড. স্টাসি জেম শেউইলারের মতে, তাদের সময়ে ইসমত এবং তাজ তাদের সৌন্দর্যের জন্য খুব বেশি পরিচিত ছিলেন না। বরং তারা তাদের মেধা ও যোগ্যতাই ছিল তাদের মূল পরিচয়।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.