কে বলেছে বামফ্রন্ট নেই? হুগলীতে শুধু লালা আর লাল


Odd বাংলা ডেস্ক: জিটি রোড, বটতলা, উইলিয়াম কেরির স্মৃতি বিজড়িত গঙ্গা পাড়ের শ্রীরামপুর কলেজ থেকে পুরানো চার্চ পাড়া, ভেসে গিয়েছে লাল ঝান্ডা হাতে মানুষের জনস্রোতে। সিপিআই(এম) হুগলী জেলা কমিটির আহ্বানে এদিনের জনতার ঢল আক্ষরিক অর্থেই মহামিছিল। মিছিলের শরীরী ভাষার লড়াকু মেজাজ স্পষ্ট।

বিকাল পৌনে পাঁচটায় অমূল্যকানন থেকে মিছিল শুরু হয়ে হাজার হাজার মানুষের পায়ের ভিড় ঠেলে জিটি রোড ধরে এগিয়েছে আরএমএস ময়দানের দিকে। মিছিলের প্রথম অংশ যখন উড়ালপুল পেরিয়ে শ্রীরামপুর বটতলায়, মিছিলে হাঁটা লাল ঝান্ডা হাতে শেষ মানুষটি তখনও পেরোচ্ছেন অমূল্যকানন। শ্রীরামপুর বেল্টিং বাজার, উড়ালপুল, বটতলা হয়ে মিছিল পেরিয়েছে শ্রীরামপুর জেলের সামনের রাস্তা ধরে ঋষি বঙ্কিম সরণি, শীলবাগানন, নেতাজী ময়দান হয়ে আরএমএস ময়দান। দীর্ঘ দেড় কিলোমিটার দৈর্ঘ্য জোড়া মিছিল জানান দিয়েছে সোচ্চারে, মিডিয়ার লেন্সে নয়, লাল ঝান্ডার গণভিত্তি বাস্তবের লড়াইয়ের রুখুশুখু মাটিতেই। মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন সিপিআই(এম) পলিট ব্যুরো সদস্য মহম্মদ সেলিম, সিপিআই(এম) হুগলী জেলা সম্পাদক দেবব্রত ঘোষ, পার্টির রাজ্য কমিটির সদস্য সুদর্শন রায়চৌধুরি, পার্টিনেতা জ্যোতিকৃষ্ণ চ্যাটার্জি, তীর্থঙ্কর রায়, মনোদীপ ঘোষ, শ্রুতিনাথ প্রহরাজ, জয়দেব চ্যাটার্জি, অসিত মুখার্জি সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। মিছিলের শুরুতে অমূল্যকাননে মহম্মদ সেলিমের হাতে ফুল তুলে দিয়ে অভিনন্দন জানান পার্টির শ্রীরামপুর পশ্চিম এরিয়া কমিটির সম্পাদক মিঠুন চক্রবর্তী।  

বিকাল পৌনে পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা ছ’টা। এক ঘণ্টা পনেরো মিনিট গোটা শ্রীরামপুর শহর ছিল অবরুদ্ধ। গাড়ি, টোটো, অটো থামিয়ে জিটি রোড ছিল নিষ্পন্দ। উড়ালপুলের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা বাস, ভিড় বোঝাই ট্রেকারের চালক থেকে যাত্রীদের হাতে হাতে মোবাইল, অবাক বিস্ময়ে ক্যামেরাবন্দি হচ্ছে মিছিলের প্রতিটি স্লোগান। শুধু মিছিলে শামিল মানুষরাই নন, পথচলতি মানুষ, ব্যস্ত দোকান, ফ্ল্যাটবাড়ির বারান্দা থেকেও তখন সোশ্যাল মিডিয়ায় মিছিলের চলমান  লাইভ! 


দীর্ঘ তিন বছর ধরে বন্ধ শ্রীরামপুরের ইন্ডিয়া জুট মিল, ছ’মাস ধরে বন্ধ মাদুরা কোটস। শীলবাগানের মজুর মহল্লার গা ঘেঁষে গিয়েছে মিছিল, বন্ধ লেবার কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে এসে মিছিলে ফুল ছুঁড়ে দিয়েছেন কোলে শিশু নিয়ে মহিলারা। শ্রীরামপুর ধোবিঘাটে অপেক্ষমাণ জনতার হাতেও ফুল, মহামিছিলে হেঁটে আসা জনস্রোতকে স্বাগত জানিয়েছেন মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসা মানুষ। 

মিছিলে হেঁটেছে বন্ধ হয়ে যাওয়া ডানলপ, মিছিলে হেঁটেছে বন্ধ হয়ে যাওয়া হিন্দমোটর। গঙ্গার ধার ঘেঁষে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার শ্রমিকের পাশে মিছিলে হেঁটেছে আলুর দাম না পাওয়া জাঙ্গীপাড়া, খানাকুল। মিছিলে হেঁটেছে সন্ত্রাসকে রুখে দেওয়া গোঘাট, মিছিলে হেঁটেছে ভাঙা হাত পা নিয়ে ভাঙা পার্টি অফিস সারিয়ে তোলা পুরশুড়া, তারকেশ্বর। হাজার সন্ত্রাস, হাজারো মার খাওয়া শরীরেও পালটা প্রত্যাঘাত ফিরিয়ে দেওয়া চোয়াল শক্ত করা বিস্তীর্ণ হুগলী জেলার একের পর এক জনপদ। 

সিঙ্গু টিকরি পালওয়াল পাজিপুর শাজাহানপুরের চলমান কৃষক আন্দোলনের সংহতিতে গর্জে উঠেছে মিছিল। কৃষি আইন বাতিল করো, কর্পোরেটের দখলদারি নিপাত যাক খেতি থেকে, খামার থেকে। মিছিলে নজর কেড়েছে তারুণ্য। ভদ্রেশ্বরের ছাত্র কর্মী অরিত্র ঘোষ, সায়ন ধারা, কোন্নগরের ছাত্রকর্মী রাহুল পাঠকরা মিছিলে হেঁটেছেন পায়ে হেঁটে, হাতে জুতো নিয়ে স্লোগান, ‘আম্বানির গালে গালে জুতো মারো তালে তালে, ‘আদানির গালে গালে জুতো মারো তালে তালে’। সন্ধ্যার শ্রীরামপুরে মিছিলে আসা যৌবনের হাতে হাতে জ্বলে উঠেছে মোবাইল টর্চ, শ্রীরামপুরের যুবকর্মী নীলাঞ্জন অধিকারী, সমর্পিতা ঘোষ, প্রতীক চক্রবর্তী, বাবাই সাহাদের হাতে হাতে জ্বলে উঠেছে স্মোক বম্ব!

মিছিল শেষে সাংবাদিক সম্মেলনে মহমদ সেলিম বলেন, আগামী বিধানসভা নির্বাচনের অ্যাজেন্ডা হবে মানুষের শিক্ষার অধিকার, স্বাস্থ্যের অধিকার, চাকরির অধিকার। বিজেপি তৃণমূলের মেকি লড়াই, মিডিয়ার প্রচার চাইছে নির্বাচনকে দলবদলুদের প্রতিযোগিতায় বাঁধতে। পাড়ার টুর্নামেন্টে যেমন একই টিমের মধ্যে দু’দল ভাগ করে খেলে, এখানে একটাই টিম, মমতা আর মুকল নিজেদের মধ্যে ম্যাচ খেলতে চাইছে। মূলধারার মিডিয়া যতই দলবদলুদের খবর দেখাতে ব্যস্ত থাকুক, মানুষের লড়াই রয়েছে কৃষি আইন বাতিলের আন্দোলনে, মানুষের লড়াই রয়েছে শ্রম কেড আইন বাতিলের আন্দোলনে। বিজেপি তৃণমূলের বিরুদ্ধে যারা এখনো শিরদাঁড়া বিকিয়ে দেয়নি সেই সমস্ত শক্তির ব্যপক ঐক্য জোট বাঁধছে। বাম গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের জোটই বিধানসভা নির্বাচনে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে। আব্বাস সিদ্দিকির সঙ্গে বামপন্থীদের নির্বাচনী বোঝাপড়া বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে সেলিম বলেন, ওঁর দলের এখনও জন্ম হয়নি, আগে জন্ম হোক, তারপর অন্নপ্রাশনের কার্ড হবে। ওঁদের দল গঠিত হলে এই বিষয়ে পরে জানানো হবে। 

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.