ওদের ছোঁয়া বারণ, কারণ ওরা হরিজন

Odd বাংলা ডেস্ক: পরিচয় একটাই, হরিজন! এ পরিচয় নিয়ে সমাজের অন্যান্যদের সঙ্গে মেশা তো দূরের কথা, হোটেলে বসে খেতেও পারেন না। সেলুনে বসে চুল কাটার অধিকারও নেই তাদের! পরিচয় জানলে হয়তো স্কুলেও ভর্তি নেবে না। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও ​অস্পৃশ্য হরিজন সম্প্রদায়। যেন তারা মানুষ নয়, হরিজন!

ভোরের আলো ফোটার আগে যারা নগরকে পরিষ্কার করে সৌন্দর্যমন্ডিত করে, সেই হরিজনদের জীবনের আঁধারই কাটছে না। হরিজনরা মূলত ঝাড়ুদার, মেথর, ডোম ও নোংরা পরিষ্কারের কাজ করে। তবে তারা শিক্ষা, সামাজিক মর্যাদা, চিকিৎসা, ভূমি মালিকানা সবদিক থেকেই বৈষ্যম্যের শিকার। মানুষে মানুষে বিভাজনই আসলে হরিজনের জন্ম দিয়েছে।

‘হরিজন’ শব্দটি দিয়ে আসলে আন্দাজ করা মুশকিল যে এই সম্প্রদায় সমাজে কতটা অবহেলিত ও উপেক্ষিত। অথচ ‘হরিজন’ শব্দটির অর্থ ঈশ্বরের সন্তান(হরির জন)। এই নামটি মূলত মহাত্মা গান্ধী এই সমাজের মানুষকে সম্মান দিতে চেয়েছিলেন। তিনি ১৯৩৩ সালে ​অস্পৃশ্যদের চিহ্নিত করার জন্য হরিজন শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি চেয়েছিলেন সমাজের চলতি স্রোতে এদের মিশিয়ে দিতে।

সমাজে প্রচলিত জাতিভেদ প্রথার কারণেই দেশের সাধারণ মানুষদের থেকে আলাদা হয়ে গেছে হরিজন সম্প্রদায়। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে জাতিভেদ প্রথাটির বিষবৃক্ষ রোপণ করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল আর্যরা। তারপর বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠী ক্রমাগত সেই জাত-পাতের বিভাজন করেই গেছেন। এই বিভাজন সামাজিকভাবে এমন নির্যাতনে রূপ নিয়েছিল যে, সমাজে নিম্নবর্ণের মানুষের টেকাই দায় হয়ে উঠেছিল। তাদের অস্তিত্বের সংকট শুরু হয়ে যায় রীতিমতো। বাংলাদেশে এই বিভাজনের মধ্য দিয়ে বিস্তৃতি ঘটে বিভিন্ন ধর্মের। কিন্তু জাতিভেদের সংকট পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত কিংবা বাংলাদেশ থেকে আজও যায়নি। ইতিহাসে সোনার অক্ষরে নয়, কান্নার নীল হরফে লেখা রয়েছে দলিত সম্প্রদায়ের কথা।

হরিজনরা পূর্ববঙ্গে আসে আঠারো শতকের প্রথম দিকে। ভারত উপমহাদেশের মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চল থেকে। তৎকালীন জমিদার ও ব্রিটিশ প্রতিনিধিরা তাদের অন্ন ও বাসস্থানের লোভ দেখিয়ে নিয়ে আসেন। এরপর তারা পুরো বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। তখন তাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন ছিল সুইপারের চাকরি।

দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই কম বেশি হরিজনদের বসতি রয়েছে। হরিজনদের আছে নানা গোত্র যেমন- হেলা, হাড়ি, ডোম, বাগদি, ডোমার, তেলেগু, লালবেগি, বাঁশফোড় ইত্যাদি। হরিজনদের ভাষা ভিন্ন হলেও এখন বর্তমানে কাজেকর্ম ও যোগাযোগের সুবিধার্থে তারা বাংলা ভাষার ব্যবহার করা শুরু করেছেন।

হিন্দু ধর্মের শেষ বর্ণ শূদ্রে জন্মগ্রহণ করায় তারা সাধারণদের সঙ্গে চলতে পারে না। একই পুকুরে গোসল করতে পারে না। তাদের স্পর্শ করাও নিষিদ্ধ। যুগের পর যুগ ​অস্পৃশ্যতার বেড়াজালে আবদ্ধ থেকে প্রতিবেশী বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন তো দূরের কথা, কথা বলতে পর্যন্ত ভয় পায় তারা। হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান, খ্রিস্টান—সবার কাছে এরা শুধুই মেথর। মেথর ছাড়া নিম্নবর্ণের এই জাতিসত্তাকে দলিত, ​অস্পৃশ্য, অচ্ছুৎ ইত্যাদি নামে ডাকা হয়ে থাকে।

হরিজন পল্লী বাংলাদেশের বাইরের কোনো এলাকা নয়। হরিজনরাও আমাদের দেশের, সংস্কৃতিরই একটি অংশ। তারপরও এরা ​অস্পৃশ্য!

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.