কৃষ্ণাঙ্গদের চোখে যৌনরোগের জীবাণু দিয়ে এক্সপেরিমেন্ট, বাদ যায়নি শিশুরাও

Odd বাংলা ডেস্ক: মানুষ পৃথিবীতে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে অনেক পদ্ধতিই আবিষ্কার করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে চমকপ্রদ হচ্ছে চিকিৎসা বিজ্ঞান। যতই দিন গড়িয়েছে ততই যেন উন্নত হয়েছে এই খাত। তবে নির্মম ছিল এর পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো। মানবশরীরের বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক পরীক্ষার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে ইঁদুর, বানর কিংবা বিভিন্ন ধরনের জন্তু জানোয়ার। তবে ইতিহাসে এখন কিছু পরীক্ষা আছে যা করা হয়েছিল মানুষের উপরই। এতে মারা গিয়েছে শত শত মানুষ। তাতে কিছু এসে যায়নি, নিরীক্ষার ফল ঠিকঠাক পাওয়া গেলেই হলো। 

চলুন আজ এমনই কিছু এক্সপেরিমেন্ট সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক- 

কয়েক বছর আগের কথা। কোচির এক বিজ্ঞানীর আত্মহত্যার খবর গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। বিজ্ঞানীর নাম ছিল এমপি প্রসাদ। তাকে কোচির ‘ গোল্ডখি ” বলা হয় এখন। সেই বিজ্ঞানীর সুইসাইড নোটে লেখা ছিল তিনি পটাসিয়াম সায়ানাইট নিয়ে পরীক্ষা করছিলেন। এই বিষ একবার জিভে ঠেকালে নিশ্চিত মৃত্যু। সায়ানাইটের স্বাদ কেমন তা জানতেই এই পরীক্ষা করেন। বিষ খান নিজেই , মৃত্যুর আগের মুহূর্তে কয়েকটি শব্দে লিখে যান- পটাসিয়াম সায়ানাইটের স্বাদ অ্যাসিডের মতো। যা জিভ একেবারে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়।

মানুষের শরীরকে ব্যবহার করে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার উদাহরণ অজস্র। বিজ্ঞানীরা নতুন আবিষ্কারের নেশায় নিজেকেই ‘ সাবজেক্ট হিসেবে ব্যবহার করেন , আবার কখনো এই ধরনের পরীক্ষা চালানোর জন্য অন্য মানুষের শরীর ব্যবহার করে তারা। হিউম্যান সাবজেক্ট নিয়ে পরীক্ষা চালানো নীতি আইনের বিরুদ্ধে। তবুও সেই প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময় মানুষের শরীরকে ভয়ংকর প্রাণঘাতী বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। দরিদ্র আর পিছিয়ে পড়ার কারণে কৃষ্ণাঙ্গদের এই গবেষণার জন্য ব্যবহার করা হত বেশি। জেলবন্দি আসামিরাও ছিল তালিকায়। 

যৌনরোগ বা মারণ রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি বের করতে অনেক গোপন পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো হত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যাদের উপর পরীক্ষা চালানো হত, তাদের মৃত্যু হত, বা তারাও কোনো প্রাণঘাতী রোগের শিকার হয়ে পড়ত। বাদ যেত না নারী ও শিশুরাও।

এটি ছিল জেলবন্দি আসামিদের শরীর নিয়ে ভয়ংকর পরীক্ষা। ১৯৫৩ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জেলবন্দি আসামিদের ওপর নানারকম পরীক্ষানিরীক্ষা করা হয়। আমেরিকার সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্স এজেন্সি ’ ( সিআইএ ) এই পরীক্ষাগুলো চালিয়েছিল। বেশিরভাগই ছিল নিয়মবিরুদ্ধ , বেআইনি। শুরুটা হয়েছিল হ্যালুসিনোজেনিক ড্রাগ দিয়ে । আসামিদের মস্তিষ্কের রাসায়নিক বদল জানতে ও তাদের মনের গোপন খবরের হদিশ পেতে এই পরীক্ষা করা হত। এই ধরনের সাইকোঅ্যাকটিভ অ্যাজেন্ট শরীরে ঢোকায় অনেকের মৃত্যু হয় বা জটিল স্নায়ুর রোগ দেখা দেয় ।

টুথপেস্ট , নাইট ক্রিম , জীবনদায়ী ওষুধ , বিষাক্ত রাসায়নিক সব কিছুর পরীক্ষাই হত আসামিদের শরীরে। হাই - রিস্ক ক্যান্সারের ওষুধ পরীক্ষার জন্য বেছে নেয়া হত কৃষ্ণাঙ্গদের । জানা যায়, চেস্টার এম.সাউথামস্ট নামে আমেরিকার এক অনকোলজিস্ট আসামিদের শরীরে গোপনে হেলা কোষ ইনজেক্ট করেছিলেন। মানুষের শরীরে ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারে কিনা তার জন্য ছিল সেই পরীক্ষা। সেসময় ম্যালেরিয়া ওষুধের পরীক্ষা আইনিভাবে নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তবে গোপনে পরীক্ষা চালানোর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করা হয়েছিল জেলবন্দিদেরই। এছাড়াও যৌন রোগের থেরাপির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয় আসামিদের উপরই। অনেক আসামিই সিফিলিস বা এই জাতীয় যৌনরোগের শিকার হয়ে প্রাণ হারাতেন।

কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর সিফিলিসের ভয়ংকর পরীক্ষা

১৯৩২ সাল। আমেরিকার টাস্কেজি ইউনিভার্সিটিতে একটি গোপন পরীক্ষা শুরু করেন আমেরিকার গবেষক, ডাক্তাররা। মার্কিন পাবলিক হেলথ সার্ভিস ও সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন ( সিডিসি ) এই এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছিল আফ্রিকান আমেরিকানদের ওপরে। এসটিডি ( সেক্সয়ালি ট্রান্সমিটেড ডিজিস ) নিয়ে সেই পরীক্ষার পদ্ধতি দেখে নিন্দায় সরব হয়েছিল বিশ্ব ।

তবে অনেকেই হয়তো ভাবছেন, এই কাজ কীভাবে সম্ভব হয়েছিল? এক্ষেত্রে নেয়া হয়েছিল ছলনার আশ্রয়। কৃষ্ণাঙ্গদের বলা হয়েছিল, ফ্রি - তে তাদের মেডিকেল চেকআপ হবে। কোনো অসুখবিসুখ থাকলে তার জন্য চিকিৎসা দেয়া হবে। মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে প্রায় ৪০ বছর সিফিলিস রোগের জীবাণু ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল তাদের শরীরে। ভ্যাকসিন পরীক্ষার মতো হয়েছিল সে এক্সপেরিমেন্ট। ৩৯৯ জনকে প্রাথমিকভাবে সাবজেক্ট বেছে নেয়া হয়েছিল । দিনের পর দিন রোগের জীবাণু ইনজেক্ট করিয়ে পর্যবেক্ষনে রাখা হত। এই পরীক্ষায় মৃত্যু হয়েছিল ১২৮ জনের। বাকিরা যৌনরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠায় ১৯৭২ সালে এই পরীক্ষা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিল সিডিসি। তবে ততদিনে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল বহু মানুষের মধ্যে। অনেক শিশু এই রোগ নিয়েই জন্মায় সেই সময়।

যৌনকর্মীরা যখন ‘ সাবজেক্ট ’

গুয়াতেমালায় সিফিলিস এক্সপেরিমেন্টের এই বর্বরোচিত এক্সপেরিমেন্টের গল্প আজো ইতিহাস মনে রেখেছে। ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে মার্কিন বিজ্ঞানীরা গুয়াতেমালায় এই ভয়ানক পরীক্ষা চালিয়েছিল। সাবজেক্ট ছিলেন যৌনকর্মী, মানসিক রোগী আর প্রতিবন্ধীরা। এই গবেষণার উদ্যোক্তা ছিলেন জন চার্লস কাটলার। তিনিও বেআইনিভাবে মানুষের শরীর বেছে নিয়েছিলেন তার গোপন এক্সপেরিমেন্টের জন্য। আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার সময় লক্ষাধিক সেনা এই সিফিলিসে আক্রান্ত হয়েছিল। সৈনিক এবং নাবিকরাই এই রোগে আক্রান্ত হত বেশি । তাদের চিকিৎসার জন্যই এমন অনেক সিক্রেট এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছিল আমেরিকা।

গুয়াতেমালার যৌনকর্মীদের টাকার লোভ দেখিয়ে ডেকে আনতেন বিজ্ঞানী জন চার্লস কাটলার। সেই যৌনকর্মীদের সংস্পর্শে এসেছেন যারা তারাও হতেন সাবজেক্ট। মানসিক রোগী , জেলবন্দি আসামি ও প্রতিবন্ধীরাও ছিলেন তালিকায়। বিজ্ঞানী গোপনে সিফিলিস, গনোরিয়া রোগের জীবাণু ঢুকিয়ে দিতেন শরীরে। জীবাণুর প্রতিরোধে শরীর কতটা সাড়া দেয় সেটা দেখাই ছিল গবেষণার উদ্দেশ্য। আর সেটা করতে গিয়েই সাবজেক্টদের সারা শরীরে, যৌনাঙ্গে দগদগে ক্ষত তৈরি হত। ত্বকে জমাট বেঁধে যেত রক্ত, র‍্যাশ বের হত সারা শরীরে। দু'বছরের মধ্যে অন্তত ৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল এই পরীক্ষায়। বাকিরা যৌনবাহিত নানা রোগের শিকার হয়েছিলেন। স্নায়বিক রোগও দেখা দিয়েছিল অনেকের। পরবর্তীকালে অবশ্য আমেরিকা এই ঘটনার জন্য ক্ষমা চেয়েছিল , বলা হয়েছিল এই পরীক্ষা মানবতার বিরুদ্ধে ভয়ংকর এক অপরাধ। নিরাপরাধ বহু মানুষের শরীরে মারণ রোগের বীজ ঢুকিয়ে দিয়ে তাদের তিলে তিলে মারা হয়েছিল। 

রোগের জীবাণু ঘষে দেয়া হত চোখে

ইতিহাসের আরেক এক নৃশংস এক্সপেরিমেন্ট এটি। যৌনরোগ গনোরিয়া নিয়েই গবেষণা করছিলেন গবেষক হেনরি হেইম্যান। তার এই গবেষণার জন্য তিনি নির্মম এক পথ বেছে নেন। সাধারণ নিরীহ মানুষদের চোখে ঘষে দিতেন রোগের জীবাণু। নাইসেরিয়া গনোরিয়া নামে  জীবাণু বাহিত রোগ। এই যৌনাঙ্গ, মুখ, পায়ুতে এই রোগ হতে পারে। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের বেলায় দেখা হত যে, তা সন্তানের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে কিনা। ডাক্তার হেনরি হেইম্যান  মানসিক প্রতিবন্ধী ও যক্ষ্মা রোগে আক্রান্তদেরও সাবজেক্ট হিসেবে বেছে নিতেন। কাঠির মাথায় রোগের জীবাণু লাগিয়ে তা ঘষে দিতেন চোখে। সারা মুখে দগদগে ঘা হয়ে যেত সাবজেক্টদের। নষ্ট হত দৃষ্টি। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ত সারা শরীরে। জানা যায়, ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছিল এই এক্সপেরিমেন্টে। ডাক্তার হেনরি হেইম্যানের কী শাস্তি হয়েছিল তা অবশ্য জানা যায়নি ।

গোপন পরীক্ষা করতে গিয়ে নিজেই আক্রান্ত হন বিজ্ঞানী

ব্যাকটেরিওলজি নিয়ে চর্চা করেন যারা , তাদের কাছে জাপানি বিজ্ঞানী হিদেও নগুচি বিখ্যাত নাম। ব্যাকটেরিওলজিস্ট যিনি ১৯১১ সালে সিফিলিস রোগের কারণ নিয়ে গবেষণা করছিলেন। এই রোগ থেকে কীভাবে একজন রোগী পঙ্গু হয়ে যেতে পারে তা আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন তিনি। নোবেলের জন্যও মনোনীত হয়েছিলেন। তবে নগুচিকে নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। সুনামের সঙ্গে বদনামও কুড়িয়েছেন বিজ্ঞানী।

নিউইয়র্কের রকফেলার ইনস্টিটিউটে তিনি সিফিলিসের পরীক্ষা করেন শিশুদের শরীরেও । রোগ আছে এমন তিনশ জন সাবজেক্ট বেছে নিয়েছিলেন বিজ্ঞানী। বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে তুলে আনা হয়েছিল রোগীদের। সেই সঙ্গে শিশুদেরও ধরে এনেছিলেন এই গবেষণা চালানোর জন্য। রোগের জীবাণু শরীরে ঢুকিয়ে তার প্রভাব ত্বকে কেমন পড়ছে সে পরীক্ষা করতেন নগুচি। এই খবর জানাজানি হয়ে গেলে তোলপাড় শুরু হয় বিশ্বজুড়ে। এক্সপেরিমেন্ট বন্ধ করে দেয়ার জন্য চাপ আসে বিজ্ঞানীর ওপরে। নানা হাঙ্গামার পরে বিজ্ঞানী শেষে নিজের শরীরেই জীবাণু ঢুকিয়েছিলেন। সিফিলিসে আক্রান্তও হয়েছিলেন নিজেই। বিজ্ঞানী দেখেছিলেন, এই রোগ শরীরে থাকলে ধীরে ধীরে রোগী প্যারালাইসিসের দিকে যেতে থাকে। সিফিলিসের কারণ ট্রিপপানেমা প্যালিডাম ব্যাকটেরিয়ার কথাও বলেছিলেন বিজ্ঞানী। তিনি নিজেও পঙ্গুত্বের শিকার হতে বসেছিলেন। শেষপর্যন্ত সিফিলিস নিয়ে অজানা তথ্য দেয়ায় তার নাম মনোনীত করেছিল নোবেল কমিটি।

গর্ভবতীদের শরীরে এইডসের পরীক্ষা

এইডস রোগ যাতে মায়ের শরীর থেকে সন্তানের মধ্যে না ছড়ায় তার জন্যই চলছিল গবেষণা। সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন গর্ভবতী নারীদের ওপরে গোপনে এই পরীক্ষা চালিয়েছিল। আফ্রিকা, থাইল্যান্ডে এই সিক্রেট এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা। প্রায় ১২ হাজার অন্তঃসত্ত্বা নারীর ওপর গবেষণা চলেছিল বেশ কয়েক বছর। একদলকে ওষুধ, অন্যদলকে প্ল্যাসেবো ট্রায়ালে রাখা হয়েছিল। দেখা গিয়েছিল দুই দলেই গর্ভবতী নারীরা রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। সরকারি অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন হাসপাতালে এই গবেষণা চলতে থাকে। হাজারের বেশি সদ্যোজাত শিশু এই মারণ রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। পরে সরকারের তরফে আইন করে গর্ভবতী নারীদের শরীরে যে কোনো ধরনের বৈজ্ঞানিক গবেষণা নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। 

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.