ব্রুশো আদিবাসীদের গড় আয়ু ১০০ এর বেশি হওয়ার রহস্য
Odd বাংলা ডেস্ক: সভ্যতার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত অনেক জাতি গড়ে উঠেছে। সেসব আবার ভেঙে একটির সঙ্গে অন্যটি মিশে নতুন জাতি গঠিত হয়েছে। এসব আদিবাসী এবং বাসিন্দাদের রীতিনীতি এবং আচার-সংস্কৃতি একেবারেই ভিন্ন। কোনোটির সঙ্গে কোনোটির মিল নেই একেবারেই।
বিশ্বের পুরনো এক আদিবাসী জাতি হচ্ছে ব্রুশো। একে বুরুশো, ব্রুশো বা হুনযাকুটও বলা হয়। ৫০ বছর বয়স তাদের কাছে জীবনের অর্ধেক মাত্র। ব্রুশো আদিবাসীদের দীর্ঘায়ু নিয়ে অনেক রকমের কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। তবে এই রহস্যের সমাধান বিজ্ঞান থেকেই পাওয়া যায়।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের পরিবেশ, জলবায়ু আর খাদ্যাভ্যাসই দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার আসল কারণ। বিগত ৫০০ বছরের সঙ্গে বর্তমান সময়ের তুলনা করলে দেখা যাবে যে গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে পৃথিবীর মানুষের। চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন অনেক উন্নত, বহু জটিল রোগ থেকে মুক্তি মেলে সহজেই। এছাড়াও শিশু মৃত্যুর হার কম, মহামারী কিংবা যুদ্ধ বিগ্রহে মারা পড়ছে না কোটি কোটি মানুষ। দুশো বছর পেছনে ফিরলেও দেখা যায়, জন্মের পর একটি শিশুকে শৈশব-কৈশোরে বিভিন্ন রোগজীবাণুর সঙ্গে একরকম যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হতো। আর যারা বেঁচে যেতেন, তাদের অনেকেই আয়ুস্মান হতেন; বাঁচতেন ৯০-১০০ বছর।
ব্রুশো আদিবাসীদের নিয়ে রয়েছে নানান জল্পনা কল্পনা এবং মজার মজার গল্প। একবার দেখতে-শুনতে অর্ধবয়স্ক এক লোক নিজের পাসপোর্ট দেখাতেই ইংল্যান্ডের হিথ্রো বিমানবন্দর ইমিগ্রেশনে। সময়টা ১৯৮৪ সাল, পাসপোর্ট দেখেই দায়িত্বে থাকা সবার চক্ষু চড়কগাছ। বিমানবন্দর অফিসে ঘটে যায় তুলকালাম ব্যাপার। নাম তার আবদুল মবুদ, থাকেন পাকিস্তানের গিলগিট বালটিস্তানের হুনযা জেলায়। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, পাসপোর্টে তার বয়স উল্লেখ করা ১৬০ বছর, কিন্তু চেহারা বা শরীরের গড়ন দেখে তা বোঝা একেবারেই উপায় নেই! ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা বিশ্বাস করতে চাননি প্রথমে। তারা ভেবেছিলেন, নিশ্চয়ই কোথাও একটা গন্ডগোল আছে। তবে আবদুল মবুদ জানান, সত্যি সত্যিই ১৬০ বছর বয়স তার। এই খবরটি হংকংয়ের এক পত্রিকায় প্রকাশ পেলে পুরো বিশ্বে সাড়া পড়ে যায়। খোঁজ খবর নিয়ে জানা যায়, ১০০ বছরের উপর বেঁচে থাকা ব্রুশো'দের সংখ্যা অনেক।
ওয়ার্ল্ড ব্যংকের দেয়া তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের মানুষের বর্তমানে গড় আয়ু ৭০-৭২ বছর। আজকাল ১০০ বছরের উপর বেঁচে থাকা মানুষের সংখ্যা কম হলেও এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। পৃথিবীতে এমন এক গোত্র এখনও আছে, যাদের গড় আয়ু ১০০ বছরেরও বেশি। এমনকি সেই গোত্রের কেউ কেউ ১২০ বছরও বেঁচে থাকেন!
এতক্ষণ পাকিস্তানের 'ব্রুশো' আদিবাসীদের কথাই বলছিলাম। পাকিস্তানের গিলগিত-বালতিস্তান এলাকার একটি পাহাড়ি উপত্যকা। হুনজা পাকিস্তানের অত্যন্ত উত্তর দিকে অবস্থিত, আফগানিস্তানের ওয়াখান করিডোর এবং চীনের জিয়ানজিয়াং এলাকার সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের এই বাসিন্দারা আধুনিক নগরসভ্যতা থেকে বেশ দূরে থাকলেও বৈচিত্র্যময় জীবন আর দীর্ঘায়ুর কারণে তারা বেশ পরিচিত। তাদের আবাসস্থল হুনজা উপত্যকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য গোটা বিশ্বের মাঝেই অন্যতম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ এক অঞ্চল কাশ্মীর। ভারত-পাকিস্তানের বিরোধপূর্ণ এই অঞ্চলকে বলা হয় পৃথিবীর ভূ-স্বর্গ। কিন্তু কাশ্মীরের পাশেই এমন আরও একটি জায়গা আছে, যা হয়তো অনেকেরই অজানা।
আফগানিস্তান-চীন সীমান্তে অবস্থিত পাকিস্তানের সেই অঞ্চল 'গিলগিট বালটিস্তান' যার নৈসর্গিক সৌন্দর্য কাশ্মীরের তুলনায় কোনো অংশেই কম নয়। গিলগিটের এক জেলা হুনজা। পৃথিবীর বিখ্যাত চার পর্বতমালা হিমালয়, কারাকোরাম, পামির আর হিন্দুকুশের কুলঘেঁষা এই পাহাড়ি উপত্যকা যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক জীবন্ত প্রতিনিধি। হুনজা উপত্যকার নৈসর্গিক সৌন্দর্য যেমন ঐশ্বর্যশালী, তেমনি রয়েছে এর সমৃদ্ধ ইতিহাস।
হুনজা উপত্যকার প্রাচীনতম ইতিহাসটি প্রাচীন ভারতীয় মহাকাব্য মহাভারতে পাওয়া যায়। 'মহাভারত' অনুযায়ী এই অঞ্চল ছিল গান্ধার রাজ্যের অংশ। যদিও ইতিহাসে, খ্রিস্টপূর্ব সময়ের কোনো তথ্য পাওয়া যায় না হুনযা ভ্যালি সম্পর্কে। তবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ৭ম শতাব্দীতে এ অঞ্চলে বৌদ্ধদের আগমন ঘটে। প্রাচীন ভারতের মহাজনপদ যুগে এই অঞ্চলটি বেশ কয়েকটি প্রাচীন ভারতীয় রাজ্যগুলোর প্রধানত কাপিসা, গন্ধার রাজ্য এবং সম্ভবত মগধের রাজ্যের অধীনে এসেছিল। বৌদ্ধধর্ম ৭ম শতাব্দীর শেষদিকে হুনজা উপত্যকায় এসেছিল।
কিছুটা হলেও বৌদ্ধ ধর্ম এবং বন এই অঞ্চলের প্রধান ধর্ম ছিল। হুনজা উপত্যকাটি মধ্য এশিয়া থেকে উপমহাদেশে বাণিজ্য পথ হিসেবে কেন্দ্রীয় ছিল। এটি উপমহাদেশে পরিদর্শন করা বৌদ্ধ মিশনারি ও সন্ন্যাসীদেরও আশ্রয় দিয়েছিল এবং এশিয়া জুড়ে এই অঞ্চল বৌদ্ধধর্মের প্রচারে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা হানা দেয়ার আগপর্যন্ত হুনজা ছিল স্বাধীন রাজ্য। শাসনক্ষমতায় ছিলেন 'থাম' শাসকরা। বলে রাখা ভালো, মুসলমানরা ভারতবর্ষে প্রবেশ করলে হুনজায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা পায়। আর 'থাম'রা ইসলাম গ্রহণ করে হয়ে যায় 'মীর'।
১৮৯০ সালে ব্রিটিশরা এক সেনা অভিযানের মাধ্যমে তৎকালীন শাসক মীর শাফদার আলী খানকে পরাজিত করে। এর মাধ্যমে এক হাজার বছর ধরে স্বাধীন থাকা হুনজা উপত্যকা চলে আসে জম্মু-কাশ্মীরের মহারাজার অধীনে। পরে ১৯৩৫ সালে মহারাজার সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশরা হুনজার নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং গিলগিট এজেন্সির সঙ্গে জুড়ে দেয়।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় কাশ্মীরের মহারাজা চুক্তি বাতিল করেন ব্রিটিশদের সঙ্গে। তিনি হুনজা উপত্যকায় পুনরায় নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালান। কিন্তু হুনযার বাসিন্দারা বিদ্রোহ করে এবং পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দেয়। পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হলেও দীর্ঘদিন হুনযা ভ্যালি ছিল একটি স্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। ১৯৭৪ সালে প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো এই সমস্যার সমাধান করেন। বর্তমানে এটি গিলগিট বালটিস্তানের একটি জেলা।
এই উপত্যকায় বসবাস করেন যারা, তাদেরকে বলা হয় বুরুশো, ব্রুশো বা হুনযাকুট। এই আদিবাসীরা মোট ৩টি ভাষায় কথা বলে। একই জাতির মাঝে ভাষাগত পার্থক্যের কারণ হলো বসবাসের স্থান। যারা নিচু এলাকায় থাকে তাদের ভাষার নাম 'শিনা'। পর্বত ও নিচু অঞ্চলের মধ্যবর্তী বাসিন্দারা কথা বলে 'বুরুশাস্কি' ভাষায়। আর যাদের বাসস্থান একেবারে উঁচু ভূমিতে, স্থানীয়রা তাদের গোজাল বলে থাকে। গোজালরা মনের ভাব আদান-প্রদান করে 'ওয়াখি' ভাষার মাধ্যমে। কই জাতির তিনটি পৃথক ভাষা টিকে আছে হাজার বছর ধরে।
এই আদিবাসীরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন যে, হুনজা উপত্যকায় তাদের গোড়াপত্তন ঘটে আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেটের সেনাবাহিনী ভারত আক্রমণের সময়। অভিযান শেষে গোটা সৈন্যদল ফিরে গেলেও থেকে যায় তিন সৈনিক, যাদের হাত ধরে এই দুর্গম পাহাড়ি পঞ্চলে গড়ে ওঠে ব্রুশোদের তিনটি বসতি। গিলগিট বালটিস্তানের হুনজা জেলা আয়তনে খুব বেশি বড় নয়। লোক সংখ্যাও খুব বেশি না। তবে এই দুর্গম পর্বতবাসীরা হলো পাকিস্তানের সর্বোচ্চ শিক্ষিত। তাদের স্বাক্ষরতার হার শতকরা ৯৭ ভাগ, যাদের অধিকাংশই আবার পেশাদার ডিগ্রিধারী।
তবে ক্যারিয়ার নিয়ে কোনো বিশেষ চিন্তা নেই, যদিও শিক্ষা-দীক্ষায় ঐশ্বর্যশালী তারা। নগরের উন্নত জীবন কিংবা আধুনিক পৃথিবীর প্রতি মোহ নেই তাদের। একজন ব্রুশো আদিবাসীর কাছে পরিবার আর নিজের গ্রামই সব, যেমন ছিল হাজার বছর আগেও। ৫০ বছর বয়স তাদের কাছে জীবনের অর্ধেক মাত্র। এদের গড় আয়ু বিশ্বের অন্যান্য দেশের মানুষের চেয়ে অনেক বেশি। আবদুল মবুদের আগে ১৯৬৩ সালে হুনজা উপত্যকায় ফ্রান্সের একদল গবেষক এসেছিলেন। সেই সময় তাদের জরিপে উঠে এসেছিল ব্রুশোদের গড় আয়ু প্রায় ১২০ বছর।
ব্রুশো আদিবাসীদের দীর্ঘায়ু নিয়ে অনেক রকমের কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। তবে এই রহস্যের সমাধান বিজ্ঞান থেকেই পাওয়া যায়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের পরিবেশ, জলবায়ু আর খাদ্যাভ্যাসই দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার আসল কারণ। হুনজা উপত্যকা দূষণ থেকে বেশ দূরে। তাই সেখানকার বাসিন্দারা প্রকৃতির শত্রুতা নয়, পেয়েছে বন্ধুত্ব।
হুনজার তিন অঞ্চলের বাসিন্দারাই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। এটিই তাদের প্রধান পেশা এবং কাজ বলা যায়। তাদের খাবারের বেশিরভাগ ফসলই তারা নিজেরা চাষ করে। বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত কোনো খাবার তারা খায় না। ব্রুশোরা ফসল ফলানো ও নিজেদের পানের জন্য ব্যবহার করে হিমালয়ের ঠাণ্ডা পানি। অনেক গবেষকই মনে করেন, বিশুদ্ধ এই পানিই ব্রুশোদের দীর্ঘায়ুর মূল নিয়ামক। এমনকি বর্তমানে পৃথিবীর অনেক দেশই হুনজা উপত্যকার সমমানের পানি সরবারাহের চেষ্টা চালাচ্ছে।
বছরে শুধু গ্রীষ্মকালীনই তারা চাষাবাদের জন্য পায়। বাকি সময় চলতে হয় মজুদ করা শষ্য দিয়ে। ঠিক এ কারণেই এমন ফলমূল চাষ করা হয় যেগুলো শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যায় দীর্ঘদিন। এ তালিকায় এপ্রিকট নামের ফলটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, কপার ও লৌহ। এর জুস, তেল ও শুকিয়ে রাখা বীজ খাবারের যোগ্য। ব্রুশোদের বাহ্যিক গড়ন দেখে বোঝার উপায় নেই যে, তার বয়স আসলে কত। ৩০ বছর বয়সী কোনো ব্রুশো রমণীর সঙ্গে দেখা হয়, তাকে যে কেউ ষোড়শী ভেবে ভুল করতে পারেন। এই সৌন্দর্যের অন্যতম রহস্য বলা যায় এপ্রিকট ফলটি। এর উপকারিতা আসলে বলে শেষ করা যাবে না। এটি যেমন রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, তেমনি চেহারায় আনে বিশেষ উজ্জ্বলতা।
অনেক জায়গায় প্রচলিত রয়েছে, রুশো আদিবাসীরা অতিপ্রাকৃত কোনো কিছুর বলে এতো দীর্ঘ আয়ু পান। আসলে এটি একেবারেই তেমন কিছু নয়। আজকের যুগে ৫০ বছরের আগেই আমাদের যে রোগগুলো হয়, তাদের ক্ষেত্রে এমনটা হয় না। এর একমাত্র এবং অন্যতম কারণ হচ্ছে হুনজার চমৎকার পরিবেশ-জলবায়ু ও বিশেষ কিছু খাবার, যা তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।







Post a Comment