'কুমারটুলির রাজাবাবু': শত্রুর বুকে ছুরি বসিয়ে কেটে নিতেন মুণ্ডু!

উজ্জ্বল মন্ডল: 'রাজা অফ কুমারটুলি'। অপরাধ জগৎ জুড়ে যার রাজত্ব। লুটপাট, ডাকাতি থেকে খুন, এসবেই পারদর্শী ছিল যে। যাকে ধরতে নাজেহাল অবস্থা হয়েছিল পুলিশের। একদিকে সে ছিল গরিবের রবিনহুড। অন্যদিকে ছিল কলকাতার আতঙ্ক। নৃশংসভাবে খুন করতেও হাত কাঁপত না তার!

কিন্তু কিভাবে এমন এক দাগি আসামি হয়ে উঠল 'কুমারটুলির রাজাবাবু'? এর উত্তর জানতে গেলে ফিরে যেতে হবে ১৯৩৬ সালে। ঘটনা কুমোরটুলির বলরাম মজুমদার স্ট্রিটের। ৫ সেপ্টেম্বর ভোরবেলা। সেখানকার মেথর গলিতে পাওয়া গেল একটি গলাকাটা লাশ। ছুরি দিয়ে কোপানো তাঁর শরীর। আর মুণ্ডুটাকে কেউ যেন যত্নের সাথে চেঁচে নিয়ে গেছে। অত্যন্ত ভয়ঙ্কর সে দৃশ্য।   

কিন্তু কী এই লাশের পরিচয়? কে, কেন এমন নৃশংসভাবে খুন করল তাকে? এমন নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন এলাকার মানুষ। আর সেই উত্তরের সন্ধানেই বেরিয়ে পড়েন শ্যামপুকুর থানার পুলিশ অফিসার পঞ্চানন ঘোষাল এবং সুনীল কুমার রায়। 

প্রথমে তদন্তে তেমন ক্লু মিলছিল না। অবশেষে সোনাগাছির এক দালাল মারফৎ জানা গেল খুন হওয়া ওই ব্যক্তির নাম 'পাগলা'। ভালো নাম অতুল। সোনাগাছির পতিতাদের গান-বাজনা শেখাতেন তিনি। তাকেই এভাবে খুন করেছে খোকা গুন্ডা ওরফে কুখ্যাত খাঁদা গুন্ডা। কিন্তু কেন? আসলে এই খুনের নেপথ্যে ছিল ত্রিকোণ প্রেম। এক পতিতার ভালোবাসায় পাগল হয়ে নিরীহ 'পাগলা' মাস্টারকে হত্যা করে খাঁদা গুন্ডা। ইতিহাসে এই ঘটনা কুখ্যাত 'পাগলা হত্যা মামলা' নামে পরিচিত। 

খাঁদা গুন্ডা। এই নাম শুনলেই তখন ভয়ে কাঁপত গোটা শহর। সে হিংস্র যেমন ছিল, তেমন ছিল চতুর। চোখের নিমেষে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালাত সে। শেষ করে দিয়েছিল পুলিশের ইনফর্মারকেও। রূপ বদলাতেও বেশ পারদর্শী ছিল খাঁদা গুন্ডা। 

পাগলা হত্যা মামলায় এই খাঁদাকেই গ্রেফতার করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল পুলিশকে। এমনকি নিজের Dual Personality তৈরি করে এই দাগি অপরাধী। সেই নকল খাঁদাই দুবার পুলিশের জালে ধরা পড়ে। অথচ খাঁদা গুন্ডা অবাধে বিচরণ করতে থাকে কলকাতায়। পুলিশ তার খোঁজ পায়, কিন্তু নাগাল আর পায়না। বারবার পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে যায় সে। 

কিন্তু প্রশ্ন হল, খাঁদা গুন্ডা কিভাবে হয়ে উঠলেন 'রাজা অফ কুমারটুলি'? আসলে, খাঁদাকে গ্রেফতারের জন্য হন্যে হয়ে তল্লাশি শুরু করেন পুলিশ অফিসার পঞ্চানন ঘোষাল এবং তার দল। সোনাগাছি থেকে শহরের প্রায় প্রত্যেকটি প্রান্তেই দিনভর চলে তল্লাশি। বেশ কয়েকবার পুলিশের জালে পড়লেও, ধরা কিছুতেই পড়েনি। অবশেষে খাঁদারই সাকরেদ কেষ্ট ধরা পড়তেই, ফাঁস হয় রহস্য। জানা যায়, খাঁদা আর এ রাজ্যে নেই। সে দেওঘরে গিয়ে শুরু করেছে নকল রাজত্ব। সেখানে সে এক রাজপ্রাসাদ ভাড়া নিয়েছে। সকলকে বলেছে সে নাকি 'রাজা অফ কুমারটুলি'। 

জানা যায়, দেওঘরে গিয়ে প্রচুর অর্থ গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দেয় খাঁদা। দান-ধ্যানে বিশেষ মন দেয়। সেখানকার মানুষ তাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধাও করত। সত্যিই তাকে রাজা হিসাবেই মানত তারা। 

তবে দান-ধ্যান এর আগেও সে করেছে। কলকাতার বহু গরিব পরিবারকে সাহায্য করেছে খাঁদা। গরিব বাবার মেয়েকে বিয়ে দিয়েছে। বিধবাদের অন্নসংস্থান করেছে। আর পতিতাদের কাছে তো খাঁদা গুন্ডা নয়, ছিল ভগবান। অনেকে এই দাগি অপরাধীকে রবিনহুডের সঙ্গে তুলনা করত। 

তবে দেওঘরে গিয়েও মুক্তি পায়নি খাঁদা। সেখান থেকে বহু কষ্টে এই নকল 'রাজা'কে গ্রেফতার করেন দুঁদে ইন্সপেক্টর পঞ্চানন ঘোষাল। ৭৫টি চুরি ডাকাতির পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে পাগলা ও ইনফর্মার শিউচরণ খুনের মামলা রুজু হয়। যদিও খাঁদা নিজেই নাকি পঞ্চাননবাবুকে জানিয়েছিল, সে আরও অন্তত কুড়িটা খুন করেছে। তবে তার কোনো তথ্য নেই।

কলকাতা কাঁপানো খাঁদা গুন্ডার কেস আদালতে উঠলে তাকে ফাঁসির সাজা শোনানো হয়। অবশেষে ১৯৩৭ সালে ৩১ জুলাই ফাঁসি হয় খাঁদার। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে সে নাকি নিজেই ফুলের মালা গেঁথে গলায় পড়েছিল। 

খাঁদা গুন্ডা আজ ইতিহাসের অমোঘ গহ্বরে হারিয়ে গেছে। মানুষ মনেই রাখেনি এই দ্বৈতচরিত্রের অদ্ভুত এক ব্যক্তিত্বকে। যে অপরাধের পাশাপাশি করে গেছে সমাজসেবাও। 

খাঁদা গুন্ডা আজ আর নেই, তবে রয়েছে সেই মেথর গলিটা। যেখানে সে খুন করেছিল 'পাগলা মাস্টার'কে। যেখান থেকে পাগলার গলা কেটে ভাসিয়ে দিয়েছিল গঙ্গায়। সেই গলিটার নামটা কেবল বদলেছে। সেকালের মেথর গলিই যে আজকের 'গলাকাটা গলি'।   


তথ্যসূত্র: বাবু ও বারবনিতা- দেবারতি মুখোপাধ্যায়

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.