আশ্রয়হারা পাখিদের জন্য প্রায় দেড় লাখ বাসা বানিয়ে বিশ্বের নজরে আলোকচিত্রী

Odd বাংলা ডেস্ক: একদিকে যেখানে মাইলের পর মাইল বন কেটে উজার করা হচ্ছে আধুনিকায়নের নামে। সেখানে আশ্রয়হারা পাখিদের ঘর ফিরিয়ে দিতে মরিয়া তিনি। বন উজাড়, গাছ নিধনের ফলে পাখিদের আশ্রয় কমে যাচ্ছে। লোকালয়ে এরা ঠিকভাবে নিজেদের মানিয়েও নিতে পারে না। নিরাপদ আশ্রয় না থাকায় ডিম পাড়া বা বাচ্চা দেওয়ার সংখ্যাও কমছে দিন দিন। পৃথিবী হুমকির মুখে। 

 এই অবস্থায় পাখিদের জন্য বাসা বানান দিল্লির বাসিন্দা রাকেশ ক্ষত্রী। এ পর্যন্ত তিনি পাখিদের জন্য এক লাখ ২৫ হাজার বাসা বানিয়েছেন। ওয়ার্ল্ড বুক অফ রেকর্ডস-এ নাম উঠেছে তার নাম। লিমকা বুক অফ রেকর্ডস-এও তার কাজের কথা বলা হয়েছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা ম্যাকমিলান তাদের প্রকাশিত একটি বইয়ে গোটা একখানি অধ্যায়ই লিখেছে রাকেশ এবং তার কাজ নিয়ে।

রাকেশের কাজকে স্বীকৃতি দিয়েছে তাইওয়ানের সরকারও। এমনকি লন্ডনের হাউস অব কমন্সের পরিবেশ সংরক্ষণ সংক্রান্ত সম্মান 'গ্রিন অ্যাপেল' তিনি পেয়েছেন। রাকেশ পেশায় আলোকচিত্রী। তবে এখন তাকে সবাই চেনে ভারতের 'নেস্ট ম্যান' বা 'নীড় মানব' হিসেবে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাখির বাসা বানানোর প্রশিক্ষণ দিতে ডাকা হয় তাকে।

রাকেশ জানিয়েছেন, পাখির বাসা নিয়ে তার এই ভাবনাচিন্তার শুরু হঠাৎ করে। যদিও পাখিদের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ছোটবেলা থেকেই। গাছপালা ক্রমশ কমছে শহরে। আধুনিক কাঠামোর বাড়িতেও পাখির বাসা বাঁধার সুযোগ কম। আগে তা ছিল না। রাকেশ জানিয়েছেন, পুরনো বাড়ি ছিল খোলামেলা। ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছেন, বাড়ির বাসিন্দাদের মতো ঘুলঘুলিতে বাসা বাঁধা পাখিরও সমান গুরুত্ব ছিল। এমনকি, পাখির নিরাপত্তার কথা ভেবে যখন তখন সিলিং ফ্যান চালানোরও উপায় ছিল না তাদের।

রাকেশের কথায়, ‘‘বাড়িতে পাখির বাসা বাঁধাকে হয়তো শুভ লক্ষণ হিসেবে দেখা হত। আমার এখনও মনে আছে, আমাদের বলা হত, পাখির ডানা কাটলে তোমার কান কেটে নেয়া হবে।’’ তবে পরে বুঝেছি, বাস্তবেও পরিবেশ রক্ষায় পাখিদের ভালো রাখাটা কতটা জরুরি।

পাখির বাসা নিয়ে রাকেশের ভাবনা চিন্তা শুরু হয় আচমকাই। ঘটনাচক্রে একদিন অফিস যাওয়ার পথে কয়েকজন শ্রমিককে পাখির বাসা ভাঙতে দেখেছিলেন তিনি। সেই ঘটনা তার মনে প্রভাব ফেলে। দিল্লির অশোক বিহারের বাড়ি থেকে কাজের জায়গায় যাওয়ার পথে নিয়মিত একটি পুরনো বাড়িতে প্রচুর পাখির বাসা দেখতেন তিনি। সেই বাসাই ভাঙা হচ্ছিল। কাজে যাওয়ার বদলে সেদিন ওই বাড়ির মালিকের কাছে চলে যান তিনি। তাকে বলেন, পাখিদের বাসা-ছাড়া করলে তিনি এ নিয়ে আদালতে যাবেন।

এরপরেই শহরে পাখিদের কমতে থাকা বাসস্থান নিয়ে ভাবতে শুরু করেন তিনি। রাকেশের মনে প্রশ্ন ঘুরছিল, ওদের যদি বাসা বানিয়ে দেওয়া হয়, তবে কি ওরা সেখানে থাকবে? প্রথমে ডাবের খোলায় কাগজ ভরে আর চট বেঁধে বাসা তৈরি করে ঝুলিয়েছিলেন। কিন্তু সেই বাসায় পাখি আসেনি। পরে অন্য পদ্ধতিতে বাসা তৈরি করা শুরু করেন। বেতের গোল কাঠামো তৈরি করে তাতে খড় আর চটের আস্তরণ দিয়ে বাসা বানান। এই বাসায় পাখি আসতে থাকে।

টানা তিন দিন বাড়ির বাইরে ঝুলিয়ে রাখার পর চতুর্থ দিন রাকেশ দেখেন, পাখি এসেছে বাসায়। 'নেস্ট ম্যান' উৎসাহ পেয়ে যান। আরও বেশ কয়েকটি বাসা বানিয়ে বাড়ির বাইরে রেখে দেখেন, সেখানেও পাখিরা থাকতে শুরু করছে। রাকেশ বুঝতে পারেন, বাসা পছন্দ হয়েছে পাখিদের। রাকেশকে দেখে উৎসাহ পান পড়শিরাও। তারাও পাখির বাসা বানিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন রাকেশকে। 

রাকেশ জানিয়েছেন, এক সময় এই প্রতিবেশীরাই তার বাসা বানানো নিয়ে ঠাট্টা করেছিলেন। তবে তাদেরই বাসা চাইতে দেখে, বিজয়গর্ব অনুভব করেন রাকেশ। প্রথমে ২০টি বাসা বানান রাকেশ। অশোক বিহার চত্বরের বিভিন্ন জায়গায় সেই বাসাগুলো রাখার দিন কয়েকের মধ্যেই দেখা যায়, প্রত্যকটি বাসাতেই কোনো না কোনো পাখির পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।

পাখিদের আশ্রয় দিতে পেরে উৎসাহিত রাকেশ ঠিক করেন, তিনি নিজে থেকে যা শিখলেন, তা ছড়িয়ে দেবেন। স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের পাখির বাসা বানানো শেখাতে শুরু করেন রাকেশ। এরপর একে একে ডাক আসতে থাকে। কর্পোরেট সংস্থাগুলো বাসা বানানোর প্রশিক্ষণ দিতে ডাকতে শুরু করে। বিভিন্ন আবাসনের আবাসিক কল্যাণ সমিতিগুলোও রাকেশকে ডেকে পাঠাতে শুরু করে পাখির বাসা বানানো প্রশিক্ষণের জন্য। পেশাদার ফোটোগ্রাফার রাকেশ হয়ে ওঠেন 'নীড় মানব'।

৬ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৮০ বছরের বৃদ্ধ- সবাই যোগ দিতে শুরু করেন সেই সব কর্মশালায়। এ পর্যন্ত আড়াই লক্ষ মানুষকে বাসা বানাতে শিখিয়েছেন রাকেশ। প্রতিটি বাসা বানাতে খরচ পড়ে ২৫০ টাকা। আর রাকেশের কর্মশালায় যোগ দিতে হলে মাথা পিছু ৩৫০ টাকা দিতে হয় অংশগ্রহণকারীদের। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমন অজস্র প্রশিক্ষণ শিবির তৈরি করে ফেলেছেন রাকেশ। সব মিলিয়ে বাসা বানিয়েছেন এক লাখ ২৫ হাজার।

তবে রাকেশ সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছেন তার প্রয়াস বইয়ের পাতায় জায়গা পাওয়ায়। ছোটদের জন্য প্রকাশিত ম্যাকমিলানের একটি বইয়ে রাখা হয়েছে ওই অধ্যায়টি। রাকেশের কাছে এটাই তার জীবনের সেরা প্রাপ্তি। উৎসাহিত রাকেশ অবশ্য ইদানীং পাখির বাসা তৈরির প্রক্রিয়ায় নানা রকম বদলও আনছেন। তার মধ্যে সবচেয়ে পরিবেশ বান্ধব বাসাটি হল ফলের রসের ফেলে দেওয়া টেট্রা প্যাক থেকে তৈরি পাখির বাসা। এতে পরিবেশ দূষণও কমানো যাবে বলে মনে করেন তিনি।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.