৪ হাজার বছরের প্রাচীন বাংলা জনপদের সন্ধান

Odd বাংলা ডেস্ক: বাংলার ইতিহাস বলতে শুরুতেই আসবে সিন্ধু কিংবা আর্য সভ্যতা। তবে এই দুই সভ্যতায় বাংলা থেকে ছিল না। ভারতবর্ষের আনাচে-কানাচে বহু প্রাচীন কাল থেকেই মানুষ গড়ে তুলেছিল নানা জনপদ। তাদের প্রত্যেকের সংস্কৃতি, প্রত্যেকের জীবনধারা আলাদা আলাদা। একেক সভ্যতা ভেঙে গড়ে উঠেছে আরো দুই তিনটি সভ্যতা। মানুষের জাত,চেহারা আর সংস্কৃতির রথ সেখান থেকেই বদলেছে ত্রমেই। 

সম্প্রতি তেমনই এক প্রাচীন সভ্যতার সন্ধান পাওয়া গেল ওড়িশার বালাসোরের কাছে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, ভাগীরথীর মোহনা থেকে মহানদী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এই সভ্যতার পরিধি। আর তার বয়স ৪ হাজার বছরের কম নয়।

ওড়িশার প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একটি শাখা দীর্ঘদিন ধরে বালাসোর অঞ্চলে খননকার্য চালানোর চেষ্টা করে আসছিল। তাদের দৃঢ় ধারণা ছিল, এই অঞ্চলে মাটির নিচে পাওয়া যেতে পারে কোনো আশ্চর্য নিদর্শন। অবশেষে মাসখানেক আগে সেই নিদর্শনের সন্ধান পেলেন তারা। বালাসোর শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে দূর্গাদেবী অঞ্চলে পাওয়া গেল প্রায় ৪ হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন। প্রথমেই মাটি খুঁড়তে উঠে এসেছে অতি প্রাচীন এক দুর্গের ধ্বংসাবশেষ। এরপর মাসখানেক ধরে দফায় দফায় উঠে এসেছে ইতিহাসের নানা পর্বের মানুষের অস্তিত্বের নানা সাক্ষ্য।

প্রত্নতাত্ত্বিকরা বলছেন, এই ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রাপ্ত নিদর্শনগুলোকে মোটামুটি তিনটি ঐতিহাসিক কালপর্বে ভাগ করা যায়। এগুলো তাম্রযুগ, লৌহযুগ এবং প্রাচীন ঐতিহাসিক যুগের মধ্যে গড়ে উঠেছে। সময়কালের হিসাবে মোটামুটি ৪ হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত টিকে ছিল এই সভ্যতা। সেই হিসাবে বলা যায় প্রায় ৪ হাজার বছরের পুরনো এই সভ্যতা। 

প্রত্নতাত্ত্বিকরা মনে করছেন, ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে একই সময়পর্বে গড়ে ওঠা সভ্যতাগুলির মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন এবং বিভিন্ন অঞ্চলের নগরায়নের ধারা বুঝতে সাহায্য করবে এই খননকার্য। বর্তমান কিংবা গত দুই তিন শতাব্দীর গাঙ্গেয় উপত্যকায় গড়ে ওঠা সংস্কৃতি সবারি জানা। তবে এই সভ্যতাও গড়ে উঠেছিল সন্ধান পাওয়া এই সভ্যতার সময়কালেই। মহানদীকে কেন্দ্র করেও গড়ে উঠেছিল এক বিরাট সভ্যতা। তার বিষয়ে হয়তো অনেকেই খবর রাখি না। 

অনার্য জনজাতির হাতে তৈরি এই সভ্যতার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় ছিল গাঙ্গেয় অঞ্চলের। কিন্তু এই যোগাযোগের মধ্যবর্তী সেতুটিই খুঁজে পাচ্ছিলেন না ঐতিহাসিকরা। সাম্প্রতিক এই আবিষ্কারে সেই সেতুটি খানিকটা পরিষ্কার হল বলেই মনে করছেন তারা। বালাসোর অঞ্চল থেকে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে দুই মেদিনীপুরের উপকূল বরাবর এই সভ্যতা বিকশিত হয়েছিল বলেই মত প্রত্নতাত্ত্বিকদের।

তাম্রযুগের একটি বিরাট মাটির বাড়িরও সন্ধান পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা। সেই বাড়ির গোলাকার মেঝে লাল রঙে রাঙানো। তাকে ঘিরে থাকা দেয়ালে লাল ও কালো রঙের নানা নকশা। এমনকি তামার বাসনপত্রের উপরেও লালা মাটির প্রলেপ দেওয়া রয়েছে। মূলত কৃষিকাজই ছিল মানুষের জীবিকা। 

তবে সভ্যতার শেষের দিকে লোহার ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে ভারী শিল্পের ব্যবহারও নজরে এসেছে। এখনও পর্যন্ত এই সভ্যতার রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে কিছুই জানা যায়নি। তাই তো প্রশ্নের ডালপালা মেলেছে দিক বেদিক। পরবর্তীকালে কোন পথে এগিয়েছিল ইতিহাস? অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গকে ঘিরে গড়ে ওঠা দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে কি এর কোনো যোগসূত্র রয়েছে? বাংলার পূর্বসূরি কি এই সভ্যতাই?

এই সভ্যতার মানুষ কৃষিকাজের পাশাপাশি মাছ ও পশুপাখি শিকার করত। তেমন নমুনা খুঁজে পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা। সেই সময় মৃৎপাত্র ব্যবহার হতো। যেগুলোর রঙ ছিল খানিকটা লালছে। এছাড়াও নারীদের ব্যবহৃত পুতির মালা, জপমালাসহ আরো অনেক কিছুরই সন্ধান মিলেছে ধ্বংসাবশেষ থেকে। খুব শীঘ্রই এই সভ্যতার শুরু থেকে শেষ সামনে আসবে সবার, এমনটাই আশা করছেন সবাই।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.