নসবন্দি: ভারতের পুরুষদের নির্বীজকরণের লম্বা ইতিহাস, শুধুই কি রাজনৈতিক?


শুভেন্দু পাঠক: ৭০'র দশক। উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের পুরুষরা সেই সময় বাড়ি থেকে পালিয়ে বেড়াতেন। পাছে সরকারের লোকেরা পুরুষদের তুলে নিয়ে গিয়ে নসবন্দি বা নির্বীজকরণ করে দেয়। নসবন্দির কিছু উদাহরণ ইংরেজ সময়েও ছিল। কিন্তু আইন করে নির্বীজকরণ প্রথম ওই কংগ্রেস আমলেই হল। 

পরিবার পরিকল্পনা করতে গিয়ে সরকার একটা সময় জোর করে 'নসবন্দি' শুরু করে দেয়। ভারতে এই 'নসবন্দি' -র জনক হলেন ইন্দিরা গান্ধীর পুত্র সঞ্জয় গান্ধী। ১৯৭৫ সালে তাঁর নেতৃত্বেই ভারতের বুকে নির্বীজকরণ এক ভয়ানক রূপ নিয়েছিল। বিশেষত হিন্দি বলয়ের পুরুষরা তখন আতঙ্কে থাকতেন। কানপুর, এলাহাবাদে তো ট্রেনে টিকিট কেটে না উঠলে টিটিরা ট্রেন থেকে না নামিয়ে দিয়ে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে নির্বীজকরণ করে দিত। দেশ জুড়ে এই 'নসবন্দি' -র বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকতে। 

এই সময় মায়েরা ভয় পেত যে হাসপাতালে টিকা নেওয়ার সময় তাদের শিশু সন্তানকেও নির্বীজকরণ করে দেওয়া হবে। যদিও এটা একেবারেই গুজব ছিল। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের ক্ষেত্রে নির্বীজকরণ বাধ্যতামূলক হওয়া প্রয়োজন বলে সাফ জানিয়ে দেন সঞ্জয়। ঘনিষ্ঠ মহলে এ নিয়ে আপত্তি জানালেও সঞ্জয়কে বাধা দেওয়ার কোনও চেষ্টাই করেননি তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী কর্ণ সিংহ।  সেই সময়, প্রথম দিকে উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্য শিবিরে দৈনিক প্রায় ৩৫০ নির্বীজকরণ অস্ত্রোপচার হতো। ক্রমশ সেই সংখ্যা বাড়তে বাড়তে ৬ হাজার ৫০০-য় পৌঁছে যায়। আসলে সঞ্জয় গান্ধী স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের একপ্রকার টার্গেট বেঁধে দিয়েছিলেন, যে দিনে অন্তত এই সংখ্যক 'নসবন্দি' হতেই হবে। 


আমার নিজের খুড়তুতো জ্যাঠামশাই বীরেন্দ্রনাথ পান্ডে ছিলেন বিহার পুলিশের দারোগা। তাঁর পোস্টিং ছিল বিহারের পুর্নিয়াতে। তাঁর মুখেই শুনেছিলাম একবার নাকি এই নসবন্দি করানো নিয়ে পুলিশের সঙ্গে ভয়ানক মারামারি হয় স্থানীয় গ্রামবাসীদের। তাতে বেশ কয়েকজন নিহত হয়। পুলিশ জোর করে কিছু পুরুষদের গ্রাম থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল। গ্রামটি মূলত ব্রাহ্মণ বহুল ছিল। আর সেখানে তৈরি হয় সমস্যা। উল্টে গ্রামবাসীরা  পুলিশের ওপর চড়াও হলে পুলিশ গুলি চালায়। কিছু মানুষ মারা যায়। আসলে তখন মানুষের মধ্যে এই বিষয়ে সচেতনতার অভাবও ছিল। মানুষ ভাবতো নির্বীজকরণ মানে পুরুষাঙ্গই কেটে নেওয়া হবে। সেই সময় জনসংঘ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছিল কিন্তু আজ সেই জনসংঘ থেকে বেরিয়ে আসা বিজেপির উত্তরপ্রদেশ সরকারই নির্বীজকরণের আইন আনছে উত্তরপ্রদেশে। এটা কি কেবল উন্নয়নের লক্ষ্যে নাকি এর পেছনে আছে অন্য কোনও উদ্দেশ্য?

লুকনো অ্যাজেন্ডা: 'নসবন্দি' -কে ভারতের বুকে বাড়ে বাড়ে ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক ফায়দার জন্য। এবারও হয়তো তাই। কোনও একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা উত্তরপ্রদেশের সরকার কমাতে চাইছে। যদিও আইনে জোর করে নির্বীজকরণের কথা বলা হয়নি। কিন্তু যদি সরকারি স্বাস্থ্যকর্মীদের কোনও টার্গেট বেঁধে দেওয়া হয় তাহলে আবার সেই রক্তাক্ত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে পারে। যা অনভিপ্রেত।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.