অসংখ্য ভূমিকম্পেও নড়েনি, ২৫০০ বছর ধরে টিকে আছে স্তম্ভটি!
Odd বাংলা ডেস্ক: ভূমিকম্প, ঝড় বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টির শুরু থেকেই হয়ে আসছে। মানুষ প্রাচীনকাল থেকেই এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে টিকে আছে। প্রাচীনকালে বন্যা থেকে বাড়ি-ঘর রক্ষা করার জন্য পরিখা খনন কিংবা প্রাচীর তৈরি করা হত।
প্রাকৃতিক বিভিন্ন দুর্যোগ মোকাবিলায় বিভিন্ন প্রতিরোধী ব্যবস্থা গ্রহণ করত সবাই। এমনকি ঐতিহাসিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে প্রাচীন সভ্যতায় ভূমিকম্প প্রতিরোধী কাঠামো তৈরির বিষয়েও জ্ঞান ছিল। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, প্রাচীন ক্রেটিতে কাঠের উপাদান দ্বারা সংযুক্ত পাথরের ব্লক দিয়ে ভবন তৈরি করা হত। যেগুলো ভূমি কাঁপনের নমনীয়তা সৃষ্টির কাজ করত।
অতীতে ভবনগুলো বালির উপরে বা আলগা নুড়ির উপরেও নির্মিত হত। ভূমিকম্পের সময় যা কম্পন শোষণ করত। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে ট্রয়ের অ্যাথানা মন্দির বালির পুরু ভিত্তির উপর নির্মিত হয়েছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ২৭৩ অব্দে নির্মিত পেস্টামের ডোরিক মন্দিরগুলোও একই পদ্ধতিতে নির্মিত হয়েছিল।
প্রাচীন গ্রিস এবং পার্সিয়ায় অবশ্য স্থাপত্যের ক্ষেত্রে একটি নতুন কৌশল অবলম্বন করা হত। তারা স্থাপত্যের ভিত্তি এবং ভূগর্ভের মধ্য স্থানে বিশেষভাবে সিরামিক ও কাদামাটির একটি আস্তরণ তৈরি করত। যে কারণে ভূমিকম্পের সময় মূল স্থাপত্যে সামান্য ঝাঁকুনি লাগত।
এই কৌশলটি ‘বেজ আইসোলেশন’ নামে পরিচিত। যা বর্তমানে ভূমিকম্প প্রতিরোধী কাঠামো তৈরির অন্যতম উপায়। আধুনিক ভবন তৈরির ক্ষেত্রে প্রকৌশলীরা কম্পনস্থল থেকে মূল কাঠামো আলাদা করতে রাবার বিয়ারিং, বল বিয়ারিং এবং স্প্রিং সিস্টেম ব্যবহার করেন। ভূমিকম্প থেকে রক্ষার জন্য স্থাপত্যের বেজ আইসোলেশনের অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন সাইরাসের সমাধিস্তম্ভ।
এর অবস্থান প্রাচীন আছামেনিড সাম্রাজ্যের রাজধানী পাসারগাদে। সদাইরাস দ্য গ্রেটের সময় (৫৫৯-৫৩০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) পাসারগাদ আছামেনিড সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল। বর্তমানে এর অবস্থান আধুনিক ইরানে। ভূমধ্যসাগর থেকে সিন্ধু নদী পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশাল সাম্রাজ্যের শাসক হলেও সাইরাস দ্য গ্রেটের সমাধিস্তম্ভ অত্যন্ত সাধারণ প্রকৃতির।
সমাধিস্তম্ভটি অনেকটা ঘন আকৃতির। দৈর্ঘ্য ছয় মিটার এবং প্রস্থ পাঁচ মিটার। ছোট একটি প্রবেশ দ্বার আছে। ছাঁদটি ত্রিভুজাকার। ছয় স্তর বিশিষ্ট পিরামিডাল ভিত্তির উপর স্তম্ভের মূল অংশটি অবস্থিত। সমাধিস্তম্ভটির ভিত্তি চুনাপাথরের বেশ কয়েকটি স্তর দ্বারা নির্মিত। এর প্রথম স্তরটি বেজ পাথর, বালি, চুন দিয়ে তৈরি।
উপরের স্তরগুলো এমন ব্লক দিয়ে তৈরি করা যা ধাতব বারগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত কিন্তু বেজের সঙ্গে অবদ্ধ নয়। ফলে ভূমিকম্পের সময় উপরের স্তরগুলোতে খুব একটা ঝাঁকুনি লাগে না। সাইরাসের সমাধিস্তম্ভ নিঃসন্দেহে বিগত আড়াই হাজার বছর ধরে অসংখ্য ভূমিকম্প সহ্য করে টিকে আছে। সেগুলোর মাত্রা কতটা বেশি ছিল তা যদিও জানা যায়নি। তবে সমাধিস্তম্ভটি সম্পর্কে এখনো অনেক কিছুই অজানা।
তখন নির্মাতারা কি ভূমিকম্প প্রতিরোধকের বিষয়ে জানত কিনা তাও জানা নেই কারো। এমনকি গ্রেট সাইরাসের মূল সমাধিস্থল এটা কিনা সে বিষয়টিও এখনো রহস্য হিসেবেই থেকে গিয়েছে। আরিয়ান একজন প্রাচীন গ্রিক ঐতিহাসিক এবং আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সামরিক কমান্ডার ছিলেন। তার বর্ণনা অনুযায়ী, ম্যাসেডোনিয়ার রাজা পার্সেপোলিস লুট করার পর এই সমাধিতে গিয়েছিলেন।
প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ আরিয়ান আরো বর্ণনা করেছেন, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট অ্যারিস্টবুলাস নামক একজন যোদ্ধাকে সাইরাসের সমাধিস্তম্ভে প্রবেশের নির্দেশ দেন। এই যোদ্ধা সমাধিস্তম্ভের ভিতরে একটি সোনার বিছানা, পানপাত্রযুক্ত একটি সোনার কফিন, মূল্যবান পাথর দ্বারা সজ্জিত কিছু অলঙ্কার এবং একটি শিলালিপি দেখতে পান। তবে এই শিলালিপিটি পাওয়ার কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই।
কিছু ইতিহাসবিদ মনে করেন, আলেকজান্ডারের দেখার পর সমাধিস্তম্ভের ভিতর লুট হয়েছিল। কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়, সমাধাটি অন্যত্র পুনঃস্থাপনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। যাই হোক সাইরাস দ্য গ্রেটের সমাধিস্তম্ভ বিভিন্ন প্রশ্ন থাকলেও এর ভূমিকম্প প্রতিরোধী নির্মাণ কৌশল সত্যিই অনন্য। যা প্রাচীন সভ্যতার ভূমিকম্প প্রতিরোধী স্থাপত্য নির্মাণ জ্ঞানের অন্যতম নিদর্শন।





Post a Comment