গবেষণা: মৌমাছির শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি, মধুতে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা
ODD বাংলা ডেস্ক: সম্প্রতি নতুন গবেষণায় মৌমাছির দেহেও মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। প্লাস্টিক দূষণ থেকে বাদ যায়নি ছোট্ট পতঙ্গটিও। এর ফলে মধুতে মাইক্রোপ্লাস্টিক মিশে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন গবেষকরা। ফলে মধু খাওয়াও নিরাপদ হবে না মানব শরীরের জন্য।
বাতাসে মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি হয় প্লাস্টিকের কণা থেকেই। অতি ক্ষুদ্র হওয়ায় এগুলো বাতাস এবং জলে সহজেই মিশে যায়। বর্তমানে যা মৌমাছির মাধ্যমে এক জায়গা থেকে ছড়িয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়। বিজ্ঞানীরা অ্যান্টার্কটিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মৌমাছির দেহে পেয়েছেন এর উপস্থিতি। চিলি, আর্জেন্টিনা, কানাডা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাগ, প্লাস্টিকের প্যাকেজিংয়ের উপর মৌমাছি বাসা বানানোর কারণে এমনটা হতে পারে বলে মত তাদের।
টোটাল এনভায়রনমেন্টের সায়েন্সে প্রকাশিত সমীক্ষা অনুসারে, মৌমাছিদের উপর গবেষণা করে দেখা যায় এদের শরীরে থাকা প্রায় এক-ছয় ভাগ মাইক্রোপ্লাস্টিকের মধ্যে ছিল ৫২ শতাংশ প্লাস্টিক এবং প্রায় ৩৮ শতাংশ ফাইবার। মৌমাছির শরীরে আরো তেরোটি বিভিন্ন ধরনের পলিমার পাওয়া গেছে। যার মধ্যে বেশিরভাগ পলিয়েস্টার রয়েছে। যা সিনথেটিক ফাইবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও রয়েছে পলিথিন এবং পলিভিনাইল ক্লোরাইডের কণা।
১৯ টি মৌমাছির উপর ডেন্মার্কের কপেনহেগেনে করা হয় এই পরীক্ষা। এদের সবগুলোই ছিল শ্রমিক মৌমাছি। যার ৯ টি কোপেনহেগেন থেকে সংগ্রহ করা। আর ১০ টি সেখানকার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চল থেকে। গবেষণায় দেখা যায়, গ্রামের মৌমাছির চেয়ে শহরের মৌমাছির শরীরে প্লাস্টিকের উপস্থিতি বেশি। এর কারণ হিসেবে ডেনমার্কের গবেষকরা দায়ী করছেন শহরের দূষিত বাতাসকেই।
প্রথমে মৌমাছিগুলোকে কিছুটা ঠাণ্ডা জায়গায় রাখা হয়। তারপরে এদের পা এবং দেহের সঙ্গে সংযুক্ত কণাগুলো সরিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়েছে। একটি মাইক্রোস্কোপ এবং ইনফ্রারেড আলো ব্যবহার করে কণাগুলোর আকার, আকৃতি এবং উপাদানের ধরন অনুসারে আলাদা করা হয়েছে।
এই মাইক্রোপ্লাস্টিকগুলোর উৎস অস্পষ্ট। একটি বিষয় প্রমাণিত হয়েছে যে, মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ বায়ু , মাটি এবং জলে সমানভাবেই উপস্থিত। গবেষকরা মনে করছেন এই প্লাস্টিকগুলো বিভিন্ন পোকামাকড়ের শরীরে লেগে থাকে। এরপর সেগুলোকে খাবার হিসেবে গ্রহণ করার ফলে মৌমাছির শরীরে তা প্রবেশ করেছে। বায়ুবাহিত ফাইবারগুলো যেহেতু বাতাসে ভেসে বেড়ায়। একসময় তা উড়ন্ত পোকামাকড়ের সঙ্গে আটকে যায়।
গবেষক দল বিশ্বাস করেন, তাদের এই অনুসন্ধানটি পরিবেশের দূষণকে আরো ভালোভাবে নিরীক্ষণ করতে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এটি মৌমাছি ছাড়াও পরাগায়ণকারী পতঙ্গের জন্য হুমকি স্বরূপ। জার্নাল অব হ্যাজারডাস মেটেরিয়ালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় চীনের বিজ্ঞানীরা বলছেন, মধুর মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব মানব শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
গবেষকরা দুই সপ্তাহের জন্য মধুচক্রের সময় মৌমাছিকে মাইক্রোপ্লাস্টিক যুক্ত খাবার দেন এবং তাদের মৃত্যুর হার পর্যবেক্ষন করতে থাকেন। এর ফলাফলে অবশ্য কোনো পরিবর্তন দেখতে পাননি তারা। বরং তারা খেয়াল করেন যে, মৌমাছিরা পলিস্টেরিন এবং টেট্রাসাইক্লিনের সংমিশ্রণ গ্রহণ করে এবং যখন রোগ প্রতিরোধের জন্য মৌমাছিরা একটি সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক মিশ্রণ গ্রহণ করে, তখন মৌমাছির মৃত্যুর হার ২০ শতাংশেরও কম থেকে প্রায় ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এই ফলাফলের ভিত্তিতে চীনের গবেষক দল সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, মাইক্রোপ্লাস্টিক মৌমাছির শরীরের জন্য খুব বেশি ঝুঁকিপূর্ণ নয়। যা অন্যান্য রাসায়নিকের বিষক্রিয়ায় হতে পারে।
এরইমধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিককে সমুদ্র দূষণের অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, বায়ুবাহিত মাইক্রোপ্লাস্টিক নদী দূষণের চেয়েও বেশি সমুদ্র দূষণের একটি বৃহত্তর উৎস। গবেষণা মতে প্রতিবছর ২ লাখ টনেরও বেশি ক্ষুদ্র প্লাস্টিকের কণা স্থলভাগ থেকে সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর একটি উপাদান মাইক্রোপ্লাস্টিক।





Post a Comment