বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন গাছ পালো, অবিশ্বাস্যভাবে পার করেছে ১০৮১ টি বসন্ত

 


ODD বাংলা ডেস্ক: এই রেডউড গাছটি অনেকেই হয়তো স্যোশাল মিডিয়ায় দেখেছেন। আর এর বয়স জেনেও খানিকটা কৌতূহল তো হয়েছেই বটে! সিলিকন ভ্যালির জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত পালো অল্টোর নামকরণ হয়েছে দীর্ঘ এই রেডউড গাছের অনুকরণে। ১৯ শতকে গাছটির উচ্চতা ছিল ১৬২ ফুট। কিন্তু, কয়লা ট্রেনের ধোঁয়ার দূষণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমে যায় গাছটির উচ্চতা। হাজার বছর ধরে গাছটির টিকে থাকা সত্যিই বিস্ময়কর!

স্বজাতির অন্য সব বৃক্ষ যখন অপেক্ষাকৃত স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায় মাঝে অরণ্য যাপন করছে, তখন সবার থেকে আলাদা হয়ে একাকি নগরে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে এই রেডউড গাছটি। মোটা মোটা শিকড়গুলো সব কনক্রিটের দেয়াল এবং রেললাইনের মাঝে চাপা পড়েছে। এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে গাছটি পাশ ঘেষে যাওয়া ট্রেনের কয়লা আর ডিজেলের ধোঁয়া সহ্য করে আসছে।


ভূমিকম্প এবং রেকর্ড সৃষ্টি করা খরার সময়েও কীভাবে যেন বেঁচে গেছে গাছটি। প্রকৃতির বাইরে তাকে মানুষেরও কম অত্যাচার সহ্য করতে হয়নি। বহু মানুষ বিভিন্ন সময় গাছটির গায়ে সৃষ্টি করেছে চিত্রকর্মসহ বিভিন্ন গ্রাফিটি। ১ হাজার ৮১ বছর বয়স এল পালো অল্টো নামের এই রেডউড গাছের। গাছের নামেই শহরের নামকরণ করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে ১২০ ফুট দীর্ঘ এই গাছ পল অল্টো শহরের প্রতীকী চিহ্নে পরিণত হয়েছে। সিলিকন ভ্যালির জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত এই শহরের প্রকৃত জন্ম এই গাছ ঘিরেই।


১১ শতাব্দী কেটে যাওয়ার পরেও টিকে থাকার মূল কারণ গাছের প্রতি মানুষের ভক্তি । বৃহদাকৃতির এই গাছটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে শহরের মানুষের বহু স্মৃতি ও আবেগ। "গাছটি পালো অল্টো শহরের সূত্রপাতের চিহ্ন বহন করে," বলেন শহরের সাবেক নগর বন কর্মকর্তা ওয়াল্টার পাসমোর। মে মাসে পদ ছাড়ার আগ পর্যন্ত গত নয় বছর ধরে তিনি গাছটির দেখাশোনা করে আসছেন।


"বহু উদ্ভাবক, নেতা এবং সৃজনশীল চিন্তকের জন্ম দেওয়া নিয়ে পালো অল্টো শহর সবসময় গর্ব করে থাকে। অনেকে এই গাছেও সেই প্রতিচ্ছবি দেখতে পাবেন।" কয়েক শতাব্দী ধরে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা এল পালো অল্টো এখনও নিরাপদ নয়।


ক্যালিফোর্নিয়ার যাত্রীবাহী ট্রেন ক্যালট্রেনের রেললাইন গাছটি থেকে মাত্র ২৫ ফুট দূরে অবস্থিত। ডিজেল ট্রেনের ধোঁয়ার কারণে গাছটিকে নিত্যদিন দূষণের সম্মুখীন হতে হয়। সম্প্রতি ডিজেলচালিত ট্রেন থেকে বিদ্যুৎ চালিত ট্রেন ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পাসমোরসহ অন্যদের মতে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে গাছটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেকাংশেই দূর হবে।


তবে, আরও কিছুদিনের জন্য রেডউড এই গাছকে সব সহ্য করে টিকে থাকতে হবে। ক্যালট্রেইনের নতুন প্রকল্পটি চলতি বছর বাস্তবায়নের কথা থাকলেও এখন আর তা হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইলেকট্রনিক ট্রেনের পরিকল্পনা ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে।


তবে, পুরো এল পালো অল্টোর অস্তিত্বই বেশ অস্বাভাবিক একটি বিষয়। রেডউড গাছ বৃষ্টি পছন্দ করে থাকে। এদের বৃদ্ধির জন্য ঘন কুয়াশা সহায়ক। সাধারণ রেডউড গাছের জন্য বার্ষিক পাঁচ থেকে দশ ফিট বৃষ্টিপাতের প্রয়োজন হয়। পালো অল্টোতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দুই ফিটের কম।


১৯ শতকে গাছটির দৈর্ঘ্য এখনকার থেকেও অনেক বেশি ছিল। তখন এই গাছের উচ্চতা ছিল ১৬২ ফুট পর্যন্ত। কিন্তু, রেললাইন স্থাপনের পর ধোঁয়াজনিত দূষণের গাছের ওপর দিকের শাখা-প্রশাখার বিভিন্ন অংশ মারা যায়। রেডউড গাছ সাধারণত উচ্চতায় ৪০০ ফিট পর্যন্ত হয়ে থাকে। আর তাই, একই প্রজাতির অন্যান্য গাছের তুলনায় গাছটি আকারে ছোট। শুধু তাই নয়, হাজার বছরের গাছটি কেবল মধ্যবয়সী। দেশটির সবথেকে বয়স্ক রেডউড গাছের বয়স প্রায় আড়াই হাজার বছর বলে ধারণা করা হয়।


গাছটির জন্ম নিয়েও রয়েছে রহস্য। পাসমোরের বিশ্বাস, রেডউড এই গাছের বীজ পর্বতমালা থেকে সান ফ্রান্সিস্কিটো খাঁড়ি বেয়ে এখানে আসে। খাঁড়ির সরু জলের প্রবাহ থেকে জল গ্রহণ করে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গাছটি বেঁচে আছে। 


অন্যদিকে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে খাঁড়ির জল কমে আসায় গত কয়েক দশকে গাছের শিকড়গুলো জল সংকটে পড়ে। তার ওপর ঘুণ এবং কমপ্যাক্ট মাটির কারণে অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে। ১৯৫০ এর দশকে গাছটি ক্রমশ নেতিয়ে পড়ে। সেসময় শহরের একজন আরবোরিস্ট জর্জ হুড গাছটির দেখাশোনা শুরু করেন। তিনি গাছটিতে জল সরবরাহের বিশেষ ব্যবস্থা করেন। গাছটির গুঁড়ি বেয়ে উচ্চ চাপযুক্ত পাইপের মাধ্যমে গাছের উপরের অংশে জল ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। যার ফলে গাছটিতে কৃত্রিম শিশিরের মতো কুয়াশার তৈরি হয়। 


রেডউড গাছ কেবল তাদের শিকড় থেকেই নয়, বরং শৃঙ্গ থেকেও জল গ্রহণ করে থাকে। হুড গাছটিকে বোকা বানাতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন গাছটি যেন মনে করে যে সে উপকূল অঞ্চলেই আছে, আর সেখানেই কুয়াশা থেকে প্রতিদিন জল পাচ্ছে, বলেন শহরের আরেক অবসরপ্রাপ্ত আরবোরিস্ট ডেভিড ডকটার। ২০০৪ সালে এল পালো অল্টোর বীজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হয়। গাছটি মারা গেলেও তার পরবর্তী প্রজন্মকে টিকিয়ে রাখতে এই উদ্যোগ নেয়া হয়।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.