সেজেগুজে মৃতদেহরা হাটছে গ্রামের পথে!

ODD বাংলা ডেস্ক: অনেক বছরের পুরাতন মৃতদেহ কবর থেকে উঠে সেজেগুজে গ্রামের পথে হাঁটছে। দেখলে মনে হবে, কোনো ভৌতিক সিনেমার দৃশ্য। তবে এটি কোনো ভৌতিক সিনেমা নয়, ইন্দোনেশিয়ার টুরাজান আদিবাসীদের মানেনে উৎসবের দৃশ্য এটি।

ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসির টুরাজান অধিবাসীরা মৃতদেহকে কবর থেকে তুলেএই উৎসব পালন করে। প্রথমে মৃতদেহ কবর থেকে তুলে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করা হয়। এরপর তাকে নতুন কাপড় পরিয়ে সাজিয়ে গ্রামের রাস্তায় নিয়ে হেঁটে বেড়ানো হয়। তারা বিশ্বাস করে, মৃতদেহকে যত্ন করলে মঙ্গল হবে। টুরাজনরা মৃতদেহ সৎকারকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানের জন্য তারা সারাজীবন ধরে টাকা জমায়। টুরাজানদের মানেনে উৎসব শত বছরের পুরনো প্রথা।

ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি টুরাজান আদিবাসীরা প্রতিবছর মৃত আত্নীয়-স্বজনদের কবর থেকে তুলে আনেন। তারপর মৃতদেহকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করেন। এরপর ওই ব্যক্তি জীবিত থাকতে তার যে প্রিয় পোশাক ছিলো, সেটি তাকে পরানো হয়। নতুন পোশাকে সাজিয়ে মৃতদেহকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের পথে হাঁটেন টুরাজানরা। মৃত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা আর নিজেদের মঙ্গল কামনায় টুরাজান আদিবাসীরা মানেনে উৎসব পালন করেন।

কবর

থেকে লাশ তুলে উৎসব করার রীতি শুরু হয় শতবর্ষ আগে। এই রীতি সৃষ্টির পেছনে একটি গল্প চালু আছে। গল্পটি এরকম- ‘পশু শিকারী পং রুমাসেক শিকার করতে পাহাড়ে যান। পাহাড়ের মধ্যে একটি মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। পং মৃতদেহটি নিয়ে আসেন এবং নিজের জামা কাপড় পরিয়ে কবর দেন। এই আদিবাসী গোষ্ঠীর বিশ্বাস, পং সৃষ্টিকর্তার আর্শীবাদ প্রাপ্ত হয়েছিলেন। ধনসম্পদের মালিক হয়েছিলেন। তারপর থেকে তারা মনে করেন মৃতদেহের যত্ন নিলে মঙ্গল হয়। তাই তারা কবর থেকে প্রতি বছর মৃতদেহ তুলে তাদের সেবাযত্ন করেন।’

কবর থেকে তোলা মৃতদেহগুলো নিয়ে তারা গ্রামের একটি সোজা রাস্তা ধরে হাঁটেন। তারা বিশ্বাস করেন, সোজা পথ তাদের ঐশ্বরিক শক্তি হাইয়াং এর সঙ্গে দেখা করিয়ে দেবে।

টুরাজানদের জীবনে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে প্রচুর খরচ করেন। অনেকে জাঁকজমকপূর্ণ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানের জন্য সারা জীবন ধরে অর্থ সঞ্চয় করেন। আবার অনেকে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠান করতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। কয়েকদিন ধরে এ অনুষ্ঠান চলে। মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তির জন্য মহিষ বা শূকর জবাই করা হয়। জবাই দেওয়া পশুর শিংগুলো মৃত ব্যক্তির বাড়ির সামনে ঝুলিয়ে রাখেন আত্মীয়র। যতবেশি শিং থাকবে, মৃত ব্যক্তির সম্মান তত বৃদ্ধি পাবে।

টুরাজানরা মৃত্যুর এক বছর পর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠান করে। এক বছর পর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠানকে তারা পুইয়া বলে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানের সময় মৃতদেহকে একটি পাথরের গুহার মধ্যে রেখে দেওয়া হয়। অনেক সময় মৃতদেহ চুরি হয়ে যায়। তাই অনেকে ঘরের বারন্দায় রেখে দেন মৃতদেহ। ঘরে রেখে দেওয়াকে ‘টাউ টাউ’ বলে। টুরাজানরা মৃতব্যক্তিকে সমাধিস্থ না করা পর্যন্ত মৃত মনে করেন না। তারা মনে করেন, সে অসুস্থ বা ঘুমাচ্ছে। দাঁত ওঠার আগে কোনো শিশু মারা গেলে তাকে কাপড়ে পেঁচিয়ে একটি গাছের মধ্যে গর্ত করে রেখে দেওয়া হয়। তারা মনে করেন গাছটি বেঁচে গেলে শিশুর আত্মা গাছের অংশ হয়ে যাবে।

জীবিত

থাকাকালে মৃত ব্যক্তি যে স্থানে বেশি সময় কাটিয়েছেন বা যে স্থানে মারা গেছেন, সে স্থানে কবর দেওয়া হয়। অনেক সময় টুরাজানদের সমাধিস্থ করার স্থান নিয়ে পরিবারের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে যায়। তারা মনে করেন, ভুল স্থানে সমধিস্থ করা মানে মৃত ব্যক্তিকে হারিয়ে ফেলা। মৃতব্যক্তিকে সমাধি থেকে একমাত্র মানেনে অনুষ্ঠানের সময়ই তোলা হয়। জীবিত ব্যক্তিরা তার পূর্ব পুরুষকে শ্রদ্ধা জানাতে সমাধি থেকে লাশ তোলেন। টুরাজানরা বিশ্বাস করে, মৃত ব্যক্তির আত্মা অবশ্যই গ্রামে আসবে। কোনো ব্যক্তি দূরে কোথাও মারা গেলে তার আত্মীয়রা আত্মাকে গ্রামে ফিরিয়ে আনতে ওই স্থানে ভ্রমণ করেন। সাড়ে ৬ লাখ মানুষের এক জনগোষ্ঠী টুরাজান সম্প্রদায়। তারা খ্রিস্টান ও মুসলিম ধর্মের অনুসারী। অল্প পরিমাণ মানুষ ‘আলুক টুডুলু’ ধর্ম পালন করেন।

ফটোগ্রাফার হারমান মরিসান ইন্দোনেশিয়ার লুমবুকে বাস করে। তিনি টুরাজানদের এই অদ্ভুত অনুষ্ঠানের ছবি তুলতে সুলাওয়েসিতে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘এটি খুবই বিচিত্র অনুষ্ঠান। অনেক মৃতদেহকে স্যুট টাই পরান। 

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.