বিস্ময় নারীর দুঃসাহসিক অভিযানে বেঁচে যান সমুদ্রে ডুবা ২৫ জন



 ODD বাংলা ডেস্ক: মানব সভ্যতা গড়ে তোলায় নারী-পুরুষের আছে সমান অবদান। অবশ্য কালে কালে নারীর চলার পথে সৃষ্টি করা হয়েছে প্রতিবন্ধকতা। সমাজ-সংসারের বেড়াজালে আটকানোর চেষ্টা করা হয়েছে চার দেওয়ালের মধ্যে। তাদের সৃষ্টিশীলতা-প্রতিভা বিকাশে পদে পদে বাঁধা দেওয়া হয়েছে। তারপরও নারী থেমে থাকেনি বলয়বন্দি জীবনে। নিজের পথরেখায় থাকা বন্ধন কেটেছে অদম্য প্রতিভায়।

সৃষ্টিশীলতা-প্রতিভার পাশাপাশি সাহসী নারীরাও সৃষ্টি করেছেন ইতিহাস। তেমনই একজন বিস্ময় নারী অ্যাডা লুইস। তিনি দুঃসাহসিক অভিযানে সমুদ্রে বিপন্ন হতে যাওয়া ২৫ জনের জীবন রক্ষা করেছেন। পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা।


অ্যাডা লুইসের জন্ম ১৮৪২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। যুক্তরাষ্ট্রের সব থেকে ছোট অঙ্গরাজ্য রোড আইল্যান্ডের নিউপোর্টে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পিতা হোসিয়া লুইস ছিলেন রাজস্ব-মেরিনের ক্যাপ্টেন। চার সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন অ্যাডা লুইস। হোসিয়া লুইস পরবর্তী সময়ে লাইম রকের একটি বাতিঘর রক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। অ্যাডা লুইসকে ১৮৫৪ সালে প্রথম লাইম রকে আনা হয়। প্রথমে তারা বাতিঘরের কিছুটা দূরের একটি বাসায় বসবাস করতেন। বাতিঘরের পাশে ১৮৫৭ সালে বাতিঘর রক্ষকের জন্য একটি দোতলা বাড়ি তৈরি করা হয়। 


অ্যাডা ও তার পুরো পরিবার সেখানেই বসবাস করতে থাকে। এর চার মাসেরও কম সময়ের মধ্যে অ্যাডার বাবার একটি স্ট্রোক হয়। তখন অ্যাডা বাতিঘর ও পরিবারের অনেক কাজে সাহায্য করতে থাকেন। লাইম রক প্রায় পুরোপুরি জলে ঘেরা ছিল, তাই মূল ভূখণ্ডে পৌঁছানোর একমাত্র উপায় ছিল নৌকা। ১৫ বছর বয়সে অ্যাডা লুইস নিউপোর্টের সেরা সাঁতারু হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। একই সঙ্গে ভালো নৌকাও চালাতে পারতেন।


অ্যাডা লুইস ও তার মা ১৮৫৭ থেকে ১৮৭৩ সাল পর্যন্ত তার বাবার পক্ষে লাইম রকের বাতিঘরের কাজ চালিয়ে নেন। ১৮৭৩ সাল অ্যাডার বাবা মৃত্যু বরণ করলে তার মা বাতিঘরের রক্ষক নিযুক্ত হোন। তবে তিনি ১৮৭৮ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এরপর অ্যাডা লুইস ১৮৭৯ সালে বাতিঘর রক্ষক হিসেবে আনুষ্ঠানিক নিয়োগ পান। প্রতি বছর ৭৫০ ডলার বেতনে নিয়োগ পান তিনি। এক সময় দেশের সর্বোচ্চ বেতনপ্রাপ্ত বাতিঘর রক্ষক ছিলেন অ্যাডা লুইস। তার উল্লেখযোগ্য পরিষেবার স্বীকৃতি এবং দায়িত্বের বাইরে গিয়ে মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য অতিরিক্ত বেতন দেওয়া হতো তাকে।


তবে অ্যাডার মানুষের জীবন বাঁচানোর উদ্ধার অভিযান শুরু হয় অনেক আগে থেকেই। মাত্র ১২ বছর বয়সে অ্যাডা প্রথম উদ্ধার কাজ করেন। সেসময় চারজনকে তাদের নৌকা ডুবে যাওয়ার পর সমুদ্র থেকে উদ্ধার করেন। অ্যাডার সবচেয়ে বিখ্যাত উদ্ধার অভিযানের ঘটনাটি ছিল ১৮৬৯ সালের। এ উদ্ধার অভিযানের জন্য অ্যাডা জাতীয়ভাবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। শীতকালীন ঝড়ের সময় একটি নৌকা ডুবে যায়। এর আরোহী দুইজন ছিলেন সৈন্য। অ্যাডা ঘটনা শুনার পর কালক্ষেপণ না করে তাদের উদ্ধার করতে নিজের নৌকা নিয়ে ছুটে যান। এবং সফলভাবে তাদেরকে উদ্ধার করে আনেন।


১৮৬৯ সালের উদ্ধারের পরে অ্যাডার খ্যাতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। নিউ ইয়র্ক ট্রিবিউন, হার্পার্স উইকলি, লেসলির ম্যাগাজিনসহ অসংখ্য পত্রপত্রিকা তাকে নিয়ে বিশেষ লেখা প্রকাশ করে। এরপর অনেক পুরস্কার ও সম্মাননাও পান তিনি। তবে ১৮৮১ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি আরো দুজনের জীবন বাঁচানোর জন্য অ্যাডা লুইস সর্বোচ্চ স্বীকৃতি পান। ১৮৮১ সালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছ থেকে বিরল গোল্ড লাইভসেভিং মেডেল -এ ভূষিত হোন। প্রথম নারী হিসেবে অ্যাডা লুইস এ পদক পেয়েছিলেন।


লাইম রকে তার ৫৪ বছর অতিবাহিত করা সময়ে অ্যাডা লুইস মোট ২৫ জনের জীবন বাঁচিয়েছিলেন সমুদ্র থেকে। অনেকে বলেন এ সংখ্যা ২৫-এর থেকেও বেশি। কারণ, তিনি নিজে কোনো রেকর্ড রাখতেন না। তার জীবদ্দশায় অ্যাডা লুইসকে ‘আমেরিকার সবচেয়ে সাহসী নারী’ বলা হতো। তার কীর্তিগুলো জাতীয় সংবাদমাধ্যমে বিস্তারিত বর্ণনা করা হতো। হাজার হাজার মানুষ তার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। এক গ্রীষ্মে অ্যাডার বাবা গুণেছিলেন প্রায় নয় হাজার মানুষ তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। তিনি অসংখ্য উপহার, চিঠি, এমনকি বিয়ের প্রস্তাবও পেয়েছিলেন।


১৯১১ সালে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে অ্যাডা লুইস মৃত্যু বরণ করেন। তাকে কমন বিউরিং গ্রাউন্ডে সমাহিত করা হয়েছিল। ১৯২৪ সালে রোড আইল্যান্ড আইনসভা আনুষ্ঠানিকভাবে লাইম রকের নাম পরিবর্তন করে অ্যাডা লুইস রক করে। এর তিন বছর পরে বাতিঘরটি স্বয়ংক্রিয় করা হয়। অ্যাডা লুইসের স্মৃতি বিজড়িত বাতিঘরটি ১৯৬৩ সালে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছিল।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.