১
আকাশটা আজ সকাল থেকেই বেশ চনমনে। সূর্যের তীব্রতা আজ বেশ স্পর্শকাতর। এমন দিনের শুরুতে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছে অনির্বাণ। খবরের কাগজ জুড়ে আজকাল শুধু বিজ্ঞাপন আর বিজ্ঞাপন আর তাছাড়া খুন, জখম, এক্সিডেন্ট, শিলতাহানির ঘটনার ছড়াছড়ি। এমন সুন্দর দিনের শুরুতে এই বাজে খবরগুলো অনির্বাণ বড্ড অপছন্দ করে। প্রতিদিন তাই সে প্রথমেই খেলার পেজটা খুলে পড়তে শুরু করে। খেলার খবরে অন্তত একটু পিজিটিভিটির সুগন্ধ মেলে। কিন্তু আজ সকালে খবরের কাগজে আই.ভি.এফ(IVF)-এর একটা বিজ্ঞাপন দেখে তার পজিটিভিটি এক মুহূর্তে বদলে গেল । বিজ্ঞাপনটা দেখার সাথে সাথেই তার অন্তর থেকে একটা পচা দুর্গন্ধ যেন দীর্ঘশ্বাসকে সঙ্গী করে বাইরে বেড়িয়ে এলো। সে খবরের কাগজটা নামিয়ে রেখে চায়ের কাপের অবশিষ্ট চা এক চুমুকে শেষ করে বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরাল। এমন সময় স্নান সেরে ভেজা কেশজুগলে তোয়ালে বোলাতে বোলাতে ঘরে প্রবেশ করে নন্দিনী বলল, “সকাল সকাল সিগারেটটা না খেলে হয় না!!? কতবার বলেছি খালি পেটে সিগারেট খেও না, কিন্তু কে কার কথা শোনে।“
কথাগুলোর মধ্যেকার একরাশ বিরক্তি উপেক্ষা করে অনির্বাণ লম্বা একটা ধোঁয়া ছেড়ে সিগারেট নিভিয়ে নন্দিনীর কাঁধে হাত রেখে বলল, “ওসব বাদ দাও। বলছি শোনো না, আজ পেপারে আই ভি এফের একটা বিজ্ঞাপন দেখলাম।“
কথাটা শুনেই নন্দিনী যেন মুখটা আরও গম্ভীর করে বলল, “কতবার বলেছি অনির্বাণ আমি ওসব পারব না।“
-“কিন্তু নন্দিনী তাই বলে আমরা কি কোনোদিন সন্তানের মুখ দেখব না!!?”
-“আমি তাই বলেছি নাকি!!?”
-“তবে তোমার ওই কথার মানেটা কী!!?”
-“আমার কথার একটাই মানে আমি ওইভাবে সন্তানের জন্ম দিতে চাই না। দেখ আমাদের দুজনের কিছু সমস্যা আছে তার জন্য ডাক্তার আছে। আমরা চিকিৎসা করাব।“
-“নন্দিনী বছর দুয়েক হয়ে গেল কিন্তু কোনো সুরাহা মিলল কই!!?”
নন্দিনী এই প্রশ্নের কোনো জবাব দিল না, সোজা হেঁটে ঘরের বাইরে বেড়িয়ে গেল। অনির্বাণ এক দুবার হাঁক দিয়ে ডাকল, “নন্দিনী!! নন্দিনী!!”
নন্দিনী ফিরে তাকাল না, অনির্বাণের ডাককে উপেক্ষা করে সে সোজা হাঁটা দিল রান্নাঘরের দিকে। অনির্বাণ হতাশ হল বটে কিন্তু ঘড়ির দিকে চোখ যেতেই সে দ্রুত তার হতাশা কাটিয়ে স্নানঘরের দিকে পা বাড়াল। স্নান সেরে দ্রুত ব্রেকফাস্ট করে সে অফিসের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়ল। ব্রেকফাস্ট টেবিলে দুজনের মধ্যে এক চিলতে বাক্যবিনময়ও হল না। মাঝে মাঝে খালি দুজনে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। অনির্বাণ চলে যাওয়ার পরে অনির্বাণের মা নন্দিনীকে বললেন, “কিরে দুজনে আবার ঝগড়া করেছিস!!?”
নন্দিনী একটু আলতো হেসে বলল, “না মা তেমন কিছু না আজ ওর বড্ড তাড়া ছিল তাই একাই অফিসে বেড়িয়ে গেছে, আমার আজকে এমনিতেও সেকেন্ড হাফে ক্লাস পড়েছে।“
-“আমি অজুহাত জানতে চাইনি। কী হয়েছে একটু খুলে বলবি!!?”
নন্দিনী একটু চুপ করে থেকে বলল, “মা ওর আবার সেই একই কথা। আমি কী নিজে মা হতে চাই না তুমি বলো!!?”
-“এবার কী বলেছে শুনি!!?”
-“আবার আই.ভি.এফ(IVF)।“
কথাটা শুনেই অনির্বাণের মা কেমন যেন থমকে গেলেন। কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পরে বললেন, “তুই ওকে কেন বলছিস না, যে সমস্যাটা অনির্বাণের তরফ থেকে বেশি। অনির্বাণের পক্ষে আই.ভি.এফ(IVF) সম্ভব নয়।“
-“মা এই কথাটা শুনলে ও সম্পূর্ণরূপে ভেঙ্গে পড়বে। আমি চাই না যে ও ভেঙ্গে পড়ুক।“
অনির্বাণের মা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন তার আগেই নন্দিনী উঠে গিয়ে বলল,”মা আমি আসছি।“
নন্দিনী একটা উবের বুক করে কলেজের দিকে প্রস্থান করল। নন্দিনী বিদ্যাসাগর কলেজের বাংলা ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর। বয়েস আন্দাজে বছর তিরিশের একটু বেশি হবে। বিগত চার বছর হল কলেজের চাকরিটা পেয়েছে। অনির্বাণ আর নন্দিনী স্বামী-স্ত্রী। দুজনের বিয়ে হয়েছে তিন বছর, অবশ্য তার আগে বিগত পাঁচ বছর ধরে তারা প্রেম করেছে। অনির্বাণের বয়স বছর পঁয়তিরিস, সে সেক্টর ফাইভে একটা সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানিতে চাকরি করে। দুজনে মিলে যা রোজগার করে তা এক কোথায় বিলাসবহুল জীবনযাপন করার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু মানুষের জীবন সুখ দুঃখের মেল্বন্ধনে গোড়ে ওঠে। সব মানুষের জীবনে কিছু না কিছু সমস্যা থাকবেই। সমস্যা ব্যাতিত মানবজীবন মূল্যহীন। অনির্বাণ আর নন্দিনীর জীবনের সমস্যা হল সন্তানহীনতা।
২
অফিসের লাঞ্চ ব্রেকে সুদীপ্তর সাথে দাঁড়িয়ে সিগারেটে টান দিচ্ছে অনির্বাণ। অনির্বাণের মুখটা আজকে বড্ড ম্লান হয়ে আছে, সেইদিকে তাকিয়ে সুদীপ্ত বলল,“কীরে বৌদির সাথে ঝগড়া হয়েছে নাকি!!?”
অনির্বাণ বলল, “ঝগড়া নয়। আমাদের দুজনের মাঝে সেই একই দঁড়ি টানাটানি বলতে পারিস।“
-“কেন আবার কী বুদ্ধি দিয়েছিস বৌদিকে!!?”
-“আমি আই ভি এফের কথা বলছিলাম।“
-“বৌদি যখন রাজি হচ্ছে না নিশ্চয়ই কিছু সমস্যা আছে।“
-“সমস্যাটা কোথায় আমি জানি।“
কথাটা বলেই অনির্বাণের মুখটা কেমন যেন ম্লান হয়ে গেল। সেটা লজ্জায় না অভিমানে সেটা সুদীপ্ত সঠিকভাবে আন্দাজ করতে পারেনি। সে অনির্বাণের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। অনির্বাণ খানিকক্ষণ চুপচাপ থাকার পরে সিগারেটের লম্বা ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “সমস্যাটা আমার কিন্তু নন্দিনী আমাকে কিছুতেই সেই কথাটা মুখের উপর বলতে চাইছে না।“
-“আচ্ছা তুই বৌদির দিকটা একবার ভেবে দেখ। বৌদি তোকে ভালোবাসে বলেই ব্যাপারটা লুকিয়ে গেছে। আর কি অন্য কোনো উপায় নেই!!?”
-“স্পার্ম ব্যাঙ্ক থেকে স্পার্ম ব্যাবহার করতে হবে।“
সুদীপ্ত বলল, “বৌদির সেখানে আপত্তি থাকলে আমার মতে তোর বৌদির পাশে থাকা উচিত। দেখ বৌদি তোকে এতো সাপোর্ট দিচ্ছে আর তুই বৌদির সিচুয়েশনটা বুঝতে পারছিস না!!?”
সুদীপ্তর কথাগুলো বড্ড কানে লাগল অনির্বাণের। তার মনে মনে নিজেকে বড্ড দোষী বলে মনে হল। তার মনে হল সে যেন একার হাতে নন্দিনীর জীবনটাকে অন্ধকার গিরিখাতের অন্দরে ঠেলে দিয়েছে। আর সময়ের সাথে সাথে যেন সেই গিরিখাত আরও গভীর থেকে গভীরতর হয়ে উঠছে।
আচমকা পাশ থেকে সুদীপ্তর ডাকে তার তন্দ্রা ফিরল। সুদীপ্ত বলল, কিরে ঠিক আছিস!!?”
অনির্বাণ নিজেকে একটু সামলে বলল, “হ্যাঁ ঠিক আছি। চল কাজে লেগে পড়ি আজ একটু তাড়াতাড়ি আমি বাড়ি ফিরব।“
-“কেন রে!!? বিকেলে আজ আমাদের সাথে একটু পার্টি করবি না!!?”
-“না রে আজ আর ভালো লাগছে না।“
-“আরে ভালো না লাগলেই তো পার্টি করতে হয়।“
-“আচ্ছা দেখছি এখন চল অনেক কাজ বাকি আছে।“
বেলা বাড়ার সাথে সাথে রোদের তীব্রতা বড্ড বেড়েছে। উবের থেকে নেমে কলেজের টিচার্স রুম অবধি যেতে যেতে নন্দিনী ঘামে ভিজে গেল। টিচার্স রুমে ঢুকে নিজের টেবিলে বসে সে ব্যাগ থেকে জলের বোতল বার করে গলায় ঢেলে নিল। তাকে দেখে নীলাঞ্জনা ম্যাডাম বললেন, “যা গরম পড়ছে না এই দুপুরের সময়টায়, সত্যি বাবা সহ্য করা যায় না।“
নন্দিনী একটু হেসে বলল, “তা যা বলেছ। এমন ওয়েদার সত্যি বড্ড শরীর খারাপ করে।“
-“আমার ছেলে এই তিনদিন হল জ্বরে ভুগছে। কতবার বলেছি স্কুল থেকে এসে ঠাণ্ডা জল খাবি না। কে কার কথা শোনে!!?”
-“তোমার ছেলে এবার মাধ্যমিক দেবে না !!?”
-“হ্যাঁ রে, তাই নিয়ে যে আমি কত চিন্তায় আছি আর কী বলব!!”
-“তুমি আবার বড্ড বেশি চিন্তা কর, অপু ভালো ছেলে ভালই রেজাল্ট করবে।“
-“তাই যেন হয় রে। আচ্ছা তোর ক্লাস কখন আজকে!!?”
নন্দিনী ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, “এই মিনিট দশেক পড়েই আছে। তোমার!!?”
-“আমার আবার তিনটের সময়।“
-“আচ্ছা দীপাদি কিছুদিন হল আসছে না, কিছু খবর জানো!!?”
-“আরে দীপা প্রেগন্যান্ট, প্রথম প্রথম কাউকেই কিছু বলেনি। আর মাস তিনেকের মধ্যেই ডেলিভারির ডেট রয়েছে তাই কিছুদিনের লিভ নিয়েছে।“
কথাটা শুনেই নন্দিনীর মুখটা কেমন যেন ম্লান হয়ে গেল। সে আলতো একটা হাসি হেসে বলল, “যাই আমার ক্লাস আছে।“
সে দ্রুতপায়ে টিচার্স রুম থেকে বেড়িয়ে গেল। করিডোরের সামনে দাঁড়িয়ে চারদিকে এতো মানুষজনের মাঝেও নিজেকে কেমন যেন একাকী মনে হল নন্দিনীর। একফালি তীব্র নিস্তব্ধতা যেন ক্রমে তাকে গ্রাস করতে লাগল। আচমকা তার দুচোখ থেকে কয়েক ফোঁটা নোনতা পানি গড়িয়ে পড়ল করিডোরের মেঝেতে। স্নিগ্ধ নিস্তব্ধতার সাথে সাথে সেই নোনতা পানি যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে তার অন্তরের সুপ্ত বেদনার সমার্থক হয়ে দেখা দিল।
৩
বিকেলে অফিস শেষে সুদীপ্ত অনির্বাণকে পাকড়াও করল। অনির্বাণ অনেকবার তাকে কাটানোর চেষ্টা করলেও অবশেষে পরাজিত হয়ে সে তাদের সঙ্গী হতে বাধ্য হল। সকাল থেকেই মনটা বড্ড উদাস হয়ে রয়েছে অনির্বাণের। একটু পার্টি করলে যদি মনটা ভালো হয় এই উদ্দেশ্যেই সুদীপ্ত অনির্বাণকে নিয়ে এসেছে। তাদের অফিসের কাছাকাছি একটা ভালো ডিস্ক আছে। এখানেই সবাই মিলে আজ একটু মজা করবে। ডিস্কে জোড়ে গান বাজছে, কিছু অল্প বয়েসি ছেলেমেয়ে নাচানাচি করছে। অনির্বাণরা একটা টেবিলে বসে বিয়ার খাচ্ছে আর নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করছে। কিছুক্ষণ অনির্বাণের বেশ ভালই লাগছিল আচমকা তার ফোনটা বাজল। ফোনের স্ক্রিনে নন্দিনীর নামটা দেখে আবার তার মনমরা ভাবটা ফিরে এলো। সে ফোনটা তুলল না। সুদীপ্ত বলল, “কীরে ফোন তুললি না কেন!!?”
-“ধুর ভালো লাগছে না।“
-“একবার তুলে বলে দে না, যে ফিরতে দেরি হবে। বৌদি নাহলে মিছিমিছি টেনশন করবে।“
অনির্বাণ বিয়ারটা এক চুমুকে শেষ করে বলল, “ওয়েটার একটা সিক্সটির হুইস্কি প্লিজ।“
অনির্বাণের দেখাদেখি বাকিরাও অর্ডার দিল। ধীরে ধীরে তাদের অফিসের আলোচনা বদলে গেল ব্যাক্তিগত জীবনের সমস্যার অন্দরে। অনির্বাণ এমনিতে বেশি ড্রিঙ্ক করে না কিন্তু আজ তার মনটা বড্ড উদাস হয়ে আছে তাই সে বেশি মদ্যপান করে ফেলেছে। অনির্বাণ গ্লাসের শেষ হুইস্কিটা শেষ করে বলল, “মানুষ সারাজীবন টাকা পয়সার পিছনে ছোটে কিন্তু যখন সে টাকা পেয়ে যায় তখন সেই শূন্যতা অন্যকিছু অধিকার করে বসে।“
সুদীপ্ত এবং বাকিরা অনির্বাণের মতে সহমত পোষণ করল। অনির্বাণ একটু থেমে আবার বলতে শুরু করল, “জানো ভাইরা আমার জীবনেও একদিন টাকা ছিল না, কিন্তু আজ সেই শূন্যতা অধিকার করে বসেছে একটা ফুটফুটে বাচ্চার স্পর্শ।“
সুদীপ্ত বুঝল ব্যাপারটা বড্ড পার্সোনাল হয়ে যাচ্ছে তাই সে বলল, “এই অনির্বাণ তোর একটু বেশি চরে গেছে চুপ কর।“
অনির্বাণ তাকে একটা ধমক দিয়ে বলল, “ধুর ধুর তুই জানিস না আমার চরে না!!?”
সুদীপ্ত আবারো বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে চল এখন বাড়ি চল। এই চল সবাই আজকের মত উঠি অনেক দেরি হয়ে গেছে।“
অনির্বাণ তবু কথা শুনল না, ক্রমে ব্যাপারটা আরও একটু বাড়াবাড়ির দিকে এগোলে অফিসের বাকিরা সুদীপ্তর ইশারা বুঝতে পেরে নিজেদের মত বিল পেমেন্ট করে বেড়িয়ে পড়ল। সুদীপ্ত অনির্বাণকে বলল, “তোকে বাড়ি ড্রপ করে আমি আবার এসে আমার গাড়িটা নিয়ে যাব।“
অনির্বাণ বলল, “আরে তুই যা বাড়ি যা। আমি গাড়ি চালিয়ে ঠিক চলে যাব।“
সুদীপ্ত কোনোমতেই রাজি হল না কিন্তু অপরদিকে অনির্বাণও নাছোড়বান্দা। এমন সময় নন্দিনী ফোন করল অনির্বাণকে। অনির্বাণের হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে সুদীপ্ত বলল, “বৌদি তুমি বেশি চিন্তা করো না। আমি সাথে আছি, আজ একটু বেশি ড্রিঙ্ক করে ফেলেছে। আমি ওকে বাড়িতে নামিয়ে তারপর বাড়ি যাব।“
নন্দিনী বলল, “সে ঠিক আছে তাই বলে আমার ফোনটা কেন ধরছিল না!!?”
ফোনটা আচমকা অনির্বাণ কেড়ে নিয়ে বলল, “ফোন তুলে নতুন কি এমন কথা বলতাম শুনি!!? আমি তোমার জীবনে অন্ধকার টেনে এনেছি।“
-“অনির্বাণ আমি তোমাকে কোনোদিন ব্লেম করেছি!!? তুমি এইভাবে কথাগুলো বলছ কেন!!?”
-“যা সত্যি তাই বলছি। তুমি বলনি কিন্তু মনে মনে কী একবারও ভাবনি!!? আমার সাথে কেন যে বিয়ে করতে গেলে, জীবনটাই শেষ হয়ে গেল তোমার।“
-“অনির্বাণ প্লিজ তুমি বাড়ি ফিরে এসো তারপর কথা হবে।“
-“না আমি কেন ফিরব!!? তোমার সামনে আমি আর যেতে পারব না।“
-“উফ কি যাতা বলছ। ফোনটা সুদীপ্তকে দাও।“
অনির্বাণ কোনো কথা না বলে ফোনটা কেটে দিল। ফোনটা কেটে যাওয়ার পরে নন্দিনী কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। সে আজ অনির্বাণের মনের অন্দরের কথাগুলো তার মুখ থেকে শুনেছে, সে জানত অনির্বাণের মনে অনেক কষ্ট কিন্তু সেই বেদনার তীব্রতা অনুমানে সে পরাজিত হয়েছে। সেই পরাজয়ের গ্লানি ক্রমে তার চোখ থেকে অশ্রু রূপে ঝড়ে পড়ল।
৪
নন্দিনী বিছানায় বসে কাঁদতে কাঁদতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল সেটা খেয়াল করেনি। এখন ঘুমটা ভাঙলে সে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত ১২টা বাজে। সে অনির্বাণের ফোনে ফোন লাগাল। ফোনটা সুইচ অফ বলছে। অগত্যা সে সুদীপ্তর ফোনে ফোন লাগাল। সুদীপ্তর ফোনটা রিং হয়ে গেল কিন্তু সে ধরল না। রাত ক্রমে বেড়ে চলেছে নন্দিনীর চিন্তা ক্রমে দুশ্চিন্তার রূপ ধারন করছে। সে আরও কয়েকবার সুদীপ্তর ফোনে ফোন লাগাল কিন্তু কেউ উত্তর দিল না। অনির্বাণের মা নিজেও টেনশন করছেন কিন্তু তবু তিনি নন্দিনীকে শান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। আচমকা নন্দিনীর ফোনটা বেজে উঠল। ফোনের স্ক্রিনে একটা আননোন নম্বর ভেসে উঠল। সে ফোনটা দ্রুত তুলে বলল, “হ্যালো।“
ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো, “বৌদি আমি সুদীপ্ত। আমাদের এক্সিডেন্ট হয়েছে। বাইপাস অ্যাপোলোতে ভর্তি আছি।“
নন্দিনী কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “অনির্বাণ!!?”
-“ঠিক আছে চিকিৎসা চলছে মাথায় একটু চোট লেগেছে সেলায় পড়েছে।“
নন্দিনী এবং অনির্বাণের মা দুজনে দ্রুত হাসপাতালে ছুটে গেলেন। অনির্বাণ আর সুদীপ্তর ঘরে ঢুকে নন্দিনী দেখল সুদীপ্তর পাশে তার বৌ দাঁড়িয়ে একাধিক বাক্যবিনিময় করছে। অনির্বাণ পাশের বেডে শুয়ে আছে। ডাক্তার এসে নন্দিনীকে বললেন, “জাস্ট একটু মাথা ফেটেছে চিন্তার কোনো কারণ নেই।“
নন্দিনী এতক্ষণে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। সুদীপ্তকে জিজ্ঞেস করল, “কীভাবে হল এক্সিডেন্টটা!!?”
সুদীপ্ত বলল, “ফুটপাথে দুটো বাচ্চা খেলছিল আচমকা একটা বাচ্চা রাস্তার মাঝে চলে এলো ব্যাস বাচ্চাটাকে বাঁচাতে গিয়ে আমরা সোজা গার্ড ওয়ালে হিট করলাম।"
সেদিন রাতে অনির্বাণের জ্ঞান ফিরলে সে দেখল নন্দিনী তার পাশে বসে ঘুমিয়ে আছে। সে আলতো করে নন্দিনীর হাতটা স্পর্শ করলে তার ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। নন্দিনী তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল তারপর তার চোখ থেকে দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
অনির্বাণ বলল, “আমাকে ক্ষমা করে দাও প্লিজ। আর কোনোদিন এইসব বলব না।“
নন্দিনী তখনো চুপ করে অনির্বাণের দিকে তাকিয়ে রইল।
অনির্বাণ নন্দিনীর হাতটা চেপে ধরে বলল, “জানো আজ যখন ওই বাচ্চাটা আমাদের গাড়ির সামনে চলে এলো তখন মনে হল এই শহরে কত অনাথ শিশু আছে নন্দিনী যারা মা বাবার স্পর্শ থেকে বঞ্চিত। আমরাও শিশুর স্পর্শ থেকে বঞ্চিত। চল না এমনই একজন শিশুকে আমরা আমাদের সন্তানরূপে গ্রহন করি।“
সে তার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, “নিশ্চয়ই।“ কথাটা বলেই নন্দিনীর দুচোখ থেকে অশ্রুর ফোঁটা ঝড়ে পড়ল।
দিন কয়েক বাদে এক সুন্দর রদঝলমল দিনে তাদের দুজনের হাতে হাত রেখে অনাথ আশ্রমের বাইরে বেড়িয়ে এলো এক স্পর্শকাতর শিশু। তারা তিনজনে একে অপরের স্পর্শকাতরতা নির্মূল করে সমাজের বুকে মানবতার নিদর্শনের আলো ছড়িয়ে দিল। অপরদিকে এই শহরের বুকে অনাথ আশ্রমের জানলার বাইরে চেয়ে রইল হাজারো স্পর্শকাতর চোখ। তাদের স্বপ্নের অন্দরে আজও হানা দেয় সেই অদৃশ্য মানবতা।
** আই.ভি.এফ(IVF)- কৃএিম গর্ভসঞ্চারন পদ্ধতি।






Post a Comment