৩০ হাজার ফুট উচ্চতায় প্যারাগ্লাইডিং, নানা বিপত্তি কাটিয়ে গড়লেন ইতিহাস

 


ODD বাংলা ডেস্ক:  ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৭। ইভা উস্নেরিকা নামক একজন ৩৫ বছরের জার্মান প্যারাগ্লাইডার ফিলিপাইনে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য তার ২০০ বন্ধুদের সঙ্গে প্রস্তুতির জন্য সাউথ ওয়েলস পর্বতের উপরে উপস্থিত হয়। আবহাওয়া সেদিন খুব বেশি ভালো ছিল না। তবে তারপরও সবাই প্যারাগ্লাইডিংয়ের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ইভা তার সঙ্গে থাকা সমস্ত গ্যাজেট ভালোভাবে চেক করে নেয়। তারপর ঠিক ১২ টা ৫৭ মিনিটে সে তার প্যারাসুটে করে প্যারাগ্লাইডিং শুরু করে। প্রথমদিকে সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। তবে কিছুক্ষণ পর সে যা দেখতে পায়, তা দেখে আঁতকে ওঠে। সে বুঝতে পারে তাদের সঙ্গে খারাপ কিছু হতে চলেছে। 

কারণ আবহাওয়া মুহূর্তেই ভয়ানক রূপ ধারণ করে। যা ভয়ানক ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত ছিল। অবস্থা বেগতিক দেখে সমস্ত প্যারাগ্লাইডাররা ল্যান্ড করার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ইভা ল্যান্ড করার জন্য কোনো সময় পায় না। আর তার সঙ্গে সেটাই ঘটে, যা সে ভেবেছিল। কিছু সময়ের মধ্যেই সেই ভয়ানক ঘূর্ণিঝড় ইভাকে গ্রাস করে নেয়। তবে সৌভাগ্যবশত বাকি প্যারাগ্লাইডাররা সহিসালামতে ল্যান্ড করতে পেরেছিল। চারদিকে প্রচণ্ড বজ্রপাত, বাতাসের প্রবল গতি এবং শীতল বৃষ্টির ফলে ইভা যেন জমে যাচ্ছিল। ইভা চারদিকে অন্ধকার দেখছিল। 


ইভার কাছে মনে হচ্ছিল তাকে যেন মহাসমুদ্রে ক্ষুধার্ত হাঙ্গরের সামনে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। ইভা তার টিমের সঙ্গে বিভিন্নভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু এতে কোনো লাভ হয় না। কারণ ইতিমধ্যেই সমস্ত সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। তার কম্পাসও কাজ করছিল না। আর দুর্ভাগ্যবশত তার সবথেকে কাছের সঙ্গী একজন চাইনিজ ব্রজপাত ল্যান্ড করার পূর্ব মুহূর্তে ঝড়ের কবলে পড়ে। এবং ভয়ানক বজ্রপাতের কারণে তার মৃত্যু হয়। আর এই দিকে প্রবল বাতাস ইভাকে সাত হাজার মিটার উচ্চতায় টেনে নিয়ে গিয়েছে। ইভা ভাবছিল সে আর কয়েক সেকেন্ডও টিকে থাকতে পারবে না। 


কারণ এমন উচ্চতায় বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ নেই বললেই চলে। ফলে শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়। আর আমাদের শরীর তখন ফুসফুসে মজুদ থাকা সমস্ত অক্সিজেন ব্যবহার করতে থাকে। আর এভাবেই পর্যাপ্ত অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে ইভার প্রাণ চলে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা দেখা দেয়। এমনকি সেই মূহুর্তে তাপমাত্রা -৪৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস ছিল। হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা আর অক্সিজেনের ঘাটতিতে ইভা যেন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিল। এমন অবস্থায় শেষমেশ সে অজ্ঞান হয়ে যায়। ইভা তার কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলে। ১০০ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা বেগে বাতাস ইভাকে নয় হাজার ৯৪৬ মিটার উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। যা কিনা মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতার চেয়েও প্রায় এক হাজার মিটার বেশি।


আর এমন উচ্চতায় কোনো রকম নিরাপত্তা এবং সরঞ্জাম ছাড়া বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব। আর এই উচ্চতায় তাপমাত্রা পৌঁছায় -৫৫ ডিগ্রী সেলসিয়াসে। আর এমন অবস্থায় ইভার মৃত্যুর সম্ভাবনা বহুগুণে বেড়ে যায়। সেই সঙ্গে ব্রেইন ড্যামেজ এবংঅরগ্যান ফেইলিওরের আশঙ্কাও দেখা দেয়। আর এমন অবস্থায় ইভার মেটাবলিজম ডাউন হতে পারতো। ইভা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার কারণে পুরো ভর একদিকে ঝুঁকে যাওয়ার কারণে ইভা প্যারাসুটে করে ৩০০ ডিগ্রী এঙ্গেলে ঘুরতে থাকে। এমন অবস্থায় ইভার বেঁচে ফেরা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তার এখানে আচমকা একটা অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে। ইভার প্যারাসুট আচমকা নিচের দিকে প্রচণ্ড গতিতে পড়তে থাকে। 


জানলে অবাক হবেন, তার প্যারাসুট ২০০ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টায় গতিবেগে নিচের দিকে পড়ছিল। যা কিনা পর্বতের চূড়া থেকে লাফ দিলে যে গতিতে নিচে পড়তে থাকে তার সমান। কিছু সময় পর ইভা ছয় হাজার ৯০০ মিটার উচ্চতায় চলে আসে। আর এমন উচ্চতায় পর্যাপ্ত অক্সিজেন এবং বায়ুমণ্ডলের কারণে ইভার শরীর উত্তপ্ত হতে থাকে। ফলে প্রায় ৪৫ মিনিট অজ্ঞান থাকার পরে ইভা জ্ঞান ফিরে পায়। তবে বিপদ এখনো শেষ হয় নি। কারণ দীর্ঘ সময় -৫৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় থাকার ফলে তার শরীর পুরোপুরিভাবে বরফ হয়ে গিয়েছিল। 


এমন অবস্থায় ইভা তার শরীরের কোনো অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিন্দুমাত্র নাড়াতে পারছিল না। তবে সে বুঝতে পারছিল এটাই তার জীবনের শেষ সুযোগ। যেভাবেই হোক এখান থেকেই তাকে কিছু একটা করতে হবে। তখনও ইভা তার প্যারাসুটকে কোনো ভাবেই কন্ট্রোল করতে পারছিল না। সে তার জীবনের সর্বোচ্চ দিয়ে একবার শেষ চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নেয়। তার শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে তার প্যারাসুটের কন্ট্রোলের উপর হাত রাখার চেষ্টা করে। আর অন্যদিকে ইভার টিম ঝড় থেমে যাওয়ার কারণেই তাকে খুঁজতে শুরু করে। ইভার টিম ভেবেছিল ইভা হয়তো বা এতোক্ষনে মারা গিয়েছে। 


দীর্ঘ সময় ধরে সে তার জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করার পরে ৩টা ৩০মিনিটে অচেনা একটি জায়গায় ল্যান্ড করে। ইভার কাছে মনে হচ্ছিল সৃষ্টিকর্তা যেন তাকে দ্বিতীয়বার জীবন দিল। বিপদ কিন্তু এখনো শেষ হয়নি। কারণ প্রচন্ড ঠাণ্ডায় থাকার কারণে তার পুরো শরীর প্রায় অবশ হয়ে গিয়েছিল। সেই সঙ্গে তার শরীরের মেটাবলিজম ডাউন হয়ে গিয়েছিল। আর এমন অবস্থায় তার প্রয়োজন ছিল কারো সহযোগিতা। যে তাকে এখান থেকে এই অবস্থা থেকে বের করে নিয়ে যেতে পারবে। কারণ এখনও সে তার শরীরকে কোনো রকম কন্ট্রোল করতে পারছে না। আর এদিকে ইভার টিম এখনো ইভাকে তন্নতন্ন করে খুঁজতে থাকে।


ইভা তার রেডিও বের করে টিমের সঙ্গে আবারো সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করতে থাকে। তবে তার রেডিও দুর্ভাগ্যবশত কাজ করছিল না। ইভা তখন যেন তার শেষ সঞ্চিত সাহস টুকুও হারিয়ে ফেলেছিল। ইভা ভাবতে থাকে এত কিছু ঘটে যাওয়ার পরেও বেঁচে ফিরে আসার শেষ সুযোগটাও হারিয়ে ফেলছে। তবে তখন এমন একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে, যা সে কোনোদিনও ভাবতেই পারেনি। তার ফোন বেজে ওঠে, সে ভুলে গিয়েছিল যে তার সঙ্গে একটি ফোন আছে। এটা তার সেই সঙ্গীর ফোন ছিল, যে তার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে আসছিল। ইভা কল রিসিভ করে দ্রুত তার লোকেশন জানিয়ে দেয়।


আর কিছু সময়ের মধ্যেই তার সঙ্গীরা তাকে বাঁচানোর জন্য চলে আসে। ইভা তার সঙ্গীদেরকে দেখে যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। ইভার সঙ্গীদের জন্য এটা খুবই আবেগপূর্ণ একটি মুহূর্ত ছিল। কারণ একদিকে তাদের এক হারিয়ে যাওয়া সঙ্গীকে ফিরে পেয়েছে, অন্যদিকে তাদের একসঙ্গে প্রাণ হারিয়েছে। এ যেন হাসি কান্নার একটি মিলবন্ধন ছিল। ইভা হয়তো বেঁচে ফিরতে পারতো না। তবে সে বেঁচে ফিরেছে তার শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার কারণে। 


ইভা শুধু বেঁচেই ফিরে নি। সে একটি ওয়ার্ল্ড রেকর্ডও করেছে। তার ওয়ার্ল্ড রেকর্ডটি ছিল ৩০ হাজার ফুট উচ্চতায় কোনো রকম নিরাপত্তা, সরঞ্জাম এবং গ্যাজেট ছাড়া মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরে আসা। যা এর আগের রেকর্ডটি ছিল ২৪ হাজার ফুট। ইভার প্যারাগ্লাইডিংয়ের প্রতি এতটাই ঝোঁক ছিল যে, সে এই ভয়ানক ঘটনার মাত্র ছয়দিন পরেই সে অন্য আরো একটি পর্বতে উপস্থিত হয় প্যারাগ্লাইডিং শুরু করার জন্য।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.