‘মেঘের যোদ্ধা’ চাচাপোয়ার রহস্যময় শক্তি

 


ODD বাংলা ডেস্ক:  প্রাচীন সভ্যতা-সংস্কৃতি যেন রহস্যের আধার। এর পরতে পরতে রয়েছে রহস্যময় অনেক কাহিনি। তেমনি একটি প্রাচীন সংস্কৃতির জনগোষ্ঠী চাচাপোয়া। প্রাক-কলম্বিয়ান আমেরিকায় ইনকাদের বৃহত্তম সাম্রাজ্য ও সমৃদ্ধ সভ্যতা ছিল। তারা তাদের সাম্রাজ্যের নাম রাখে ‘তাওয়ান্টিনসুই’, যার অর্থ ‘চারটি সংযুক্ত প্রদেশ’।

কারা চাচাপোয়া


পেরুর প্রাচীন ইনকা সভ্যতার লোকেরা ওই অঞ্চলের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতো। এসব জনগোষ্ঠীর অঞ্চল বিজয় করে বা শান্তিপূর্ণভাবে তারা নিজেদের অধীনে নিয়ে আসতো। আধিপত্য বিস্তার করে অন্যান্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীগুলোর উপর চাপিয়ে দিতো নিজেদের সার্বভৌমত্ব। এভাবেই দক্ষিণ-পশ্চিম আমেরিকার একটি বৃহৎ অংশকে তাদের ‘তাওয়ান্টিনসুই’ বা সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। তারা সূর্যদেবতার উপাসনা করতো। এদের শাসককে ‘সাপা ইনকা’ বলতো যার অর্থ ‘সূর্য পুত্র’। তাদের বিশ্বাস ছিল শাসক সূর্যের পুত্র। সে পার্থিব রাজা হলেও তার স্বর্গীয় বিষয়ে অধিকার ছিল বলে বিশ্বাস করতো চাচাপোয়ারা।


তারপরেও, এমন কিছু গোষ্ঠী ছিল, যারা অন্যদের তুলনায় বিশেষত ‘অজেয়’ ইনকাদের প্রতিরোধ করেছিল ও কোনো কোনো গোষ্ঠী তাদের কঠোর হৃদয়েও কাঁপন ধরিয়েছিল। এমনই একটি গোষ্ঠী ছিল চাচপোয়া। চাচপোয়াদের বিশ্বাস তারা নিজেদের ‘মেঘের যোদ্ধা’ শামান-জাদুকর ও মমিদের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে ইনকাদের প্রতিহত করতে পেরেছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল মৃত মমিরা জীবিতদের মতো ক্ষমতাবান।


আন্দিজ পার্বত্যাঞ্চলের একটি প্রাচীন জাতি চাচাপোয়া। আন্দিজ পর্বতের পূর্ব ঢালে বর্তমান পেরুর আমাজন নদী সংলগ্ন আমাজোনাস অঞ্চলে তাদের সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। ধারণা করা হয় ৭৫০- ৮০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে এই অঞ্চলে চাচাপোয়া সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। ইনকাদের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের শত্রুতার সম্পর্ক ছিল। বহু চেষ্টার পর ১৪৭৫ খ্রিষ্টাব্দে ইনকারা তাদের সাম্রাজ্যভুক্ত করতে সক্ষম হয়। আর তারাই ‘চাচাপোয়া’ নাম দিয়েছিল। কেচুয়া ভাষায় যার অর্থ ‘মেঘের যোদ্ধা’।


‘মেঘের যোদ্ধা’


চাচাপোয়া জনগোষ্ঠীর লোকেরা ‘মেঘের যোদ্ধা’ হিসেবেই খ্যাতি পেয়েছিল। প্রাচীন উৎসগুলো থেকে জানা যায়, এই রহস্যময় নৃগোষ্ঠীর লোকেরা ইনকা অঞ্চলের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর তুলনায় সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন প্রকৃতির ছিল। তাদের চেহারাও ওই অঞ্চলের অন্য জনগোষ্ঠীর মিলত না।  


চাচাপোয়ার ‘মেঘের যোদ্ধারা’ ছিল প্রধান শিকারি। তারা শত্রুদের মাথা নিজেদের বিজয় চিহ্ন হিসেবে রাখতো। ‘সারকোফাগাস’ শব্দটি প্রথম গ্রিক ভাষায় ব্যবহৃত হয়। যার অর্থ ‘মাংস খাওয়া’। তবে চাচাপোয়ায় এর প্রয়োগ অনেকটা ভিন্ন অর্থে হয়েছিল। এর সঙ্গে সমাধিস্থ করার বিষয় যুক্ত হয়। তবে তাদের মৃতদেহ কেবল সরকোফগিতেই সমাধিস্থ করা হতো না, বরং বিশেষ অবকাঠামো তৈরি করে তার দেয়ালেও মৃতদেহ দাফন করা হতো।


চাচাপোয়াস শহরের উত্তর-পূর্বে পেরুর কারাজিয়ায় একটি পাহাড়ে, দূর থেকে মানব মুখের একাধিক মূর্তির অবকাঠামো দেখা যায়। এগুলো মূলত মূর্তি নয়। চাচাপোয়াদের নির্মিত এই অবয়বগুলো বাস্তবে সরকোফগি, যার মধ্যে মমিকৃত মৃতদেহ সমাধিস্থ করা হয়েছিল। করাজিয়ার সরকোফগি ‘মেঘের যোদ্ধাদের’ সমাধি। খ্যাতিমান যোদ্ধাদের মমিগুলো সারকোফগির অভ্যন্তরে সমাধিস্থ করা হয়েছিল।


তাদের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন মধ্যে বিশাল দুর্গও আছে। সেখানে পাহাড়ের চূড়ার উপর তৈরি দেওয়ালে ঘেরা প্রাচীন বসতির ধ্বংসস্তূপও পাওয়া গেছে। প্রতিরক্ষার জন্যই ‘মেঘের যোদ্ধা’ খ্যাত চাচাপোয়ারা এগুলো নির্মাণ করেছিল বলে গবেষকদের ধারণা।


জীবিতদের মধ্যে মৃতদের বাস


এই রহস্যময় সভ্যতার মানুষেরা দেহ ও আত্মাকে পৃথকভাবে বিবেচনা করতো না। তাদের বিশ্বাস ছিল, মৃত্যুর মধ্যমে মূলত মৃতদের জগতে বেঁচে থাকার ইঙ্গিত দেয়। এ কারণেই তারা মৃতদের বাড়িঘর তৈরি করেছিল, যেখানে মৃতদের মমি রাখা হতো।


সেসময় মেসোমেরিকা (মেসোমেরিকা একটি সাংস্কৃতিক এবং ভৌগলিক অঞ্চল যা মেক্সিকোর দক্ষিণাঞ্চল থেকে মধ্য আমেরিকা পর্যন্ত বিস্তৃত) জুড়ে জাদুকরদের শঙ্কা ছিল যে, যদি কোনো বন্য প্রাণী বা অন্য কিছু মৃত ব্যক্তির বিরক্ত করলে মমিগুলো ভয়াবহ অভিশাপ দিতো। ইনকারাও চাচাপোয় মমিদের ভয় করতো, তাদেরকে অ্যানডেড হিসেবে বিবেচনা করতো। পৌরাণিক কাহিনি, কিংবদন্তি বা কল্পিত কাহিনি অনুযায়ী অ্যানডেডরা মৃত কিন্তু তারা বেঁচে থাকা মানুষের মতো জেগে উঠতে পারে এবং সমস্ত অহংকারী বা অবজ্ঞাকারীদের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। ফলে তাদের সমীহ করে চলতো।


চাচাপোয়ার এই রহস্যময় দৃশ্য কুয়েলাপে পাওয়া যায়। সেখানে উঁচু অবকাঠামোর দেয়াল নির্মাণ করে মৃতদের সমাধিস্থ করা হয়েছিল। সেখানে কয়েক ডজন এই অদ্ভুত সমাধি পাওয়া যায়। ‘মেঘের যোদ্ধারা’ মৃতদেহ উঁচু চূড়ায়ও সমাহিত করা হয়েছিল।


উঁচু চূড়া তাদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হতো, বিশেষত অনুষ্ঠানগুলোর জন্য। সে কারণেই চাচাপোয়াদের সমাধি ও অন্যান্য অবকাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যে সূর্য উদিত হওয়ার ঠিক বিপরীত দিকে সমাধিগুলো তৈরি করা হতো। এছাড়া চাচাপোয়ার শামান-জাদুকররা তাদের পবিত্র অনুষ্ঠান, উত্সব পালন করতো নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী।


মন্দিরের অনুষ্ঠানের মধ্যে ত্যাগের আচার অনুষ্ঠানও ছিল। কুয়েলাপে প্রত্নতাত্ত্বিকগণ মন্দিরের কেন্দ্রীয় কক্ষে প্রচুর প্রাণীর হাড় খুঁজে পেয়েছিলেন। প্রাপ্ত দেহাবশেষ থেকে বোঝা যায় এই প্রাণীগুলো হিংসাত্মকভাবে হত্যা করা হয়েছিল। গবেষকদের ধারণা সেখানে মানুষ বলি দেয়ারও রীতিও প্রচলিত ছিল।


প্রাচীন পেরু ছিল অনেক সংস্কৃতির আবাসস্থল, তাদের মধ্যে বেশিরভাগ এখনও আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে বেশ রহস্যময়। চাচাপোয়া সংস্কৃতি তাদের মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য। এ অঞ্চলের অন্যদের কাছ থেকে তাদের সম্পূর্ণ আলাদা বৈশিষ্ট্য এবং আচার ছিল। তবে রহস্যময় চাচাপোয়াদের সম্পর্কে এখনো অনেক কিছুই অজানা রয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.