রহস্যময় এক পোশাকের সাহায্যে মহামারি ঠেকানোর বৃথা চেষ্টা!

ODD বাংলা ডেস্ক: বিভিন্ন শতাব্দীতে নানা মহামারি পৃথিবীতে এসেছে। এতে প্রাণ গিয়েছে বহু মানুষের। তবে মহামারির পর আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে পৃথিবী। প্রাচীন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ানক প্লেগ মহামারি ইউরোপে ‘ডার্ক এজ’র সূচনা করেছিল। 

তখন এই রোগের তেমন কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থাও ছিল না। পৃথিবীতে ৫০ বছরেরও বেশি সময় টিকে ছিল ব্যাধিটি। এতে বিশ্বব্যাপী আড়াই কোটি মানুষ প্রাণ হারায়। তবে অনেক ইতিহাসবিদের মতে, সংখ্যাটা ১০ কোটির মতো। পুরো ইউরোপ, এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা এবং আরব জুড়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল প্লেগ। মারা যাওয়ার মতো আর কেউই ছিল না যেন! 

করোনাভাইরাসের মতোই তখন প্লেগের কোনো ওষুধ ছিল না। তাই ব্যক্তিগত সুরক্ষায় ছিল রোগ প্রতিরোধের একমাত্র উপায়। অন্যদিকে চিকিৎসকরা সংক্রমিত ওই ব্যাধি থেকে বাঁচতে আলখেল্লা ব্যবহার করতো। চিকিৎসকদের সুরক্ষা দিতে তৈরি করা হয়েছিল বিশেষ কালো রঙা এক পোশাক। যেটি এখন পিপিই নামে পরিচিত। করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষা পেতে যেটি এখন সারাবিশ্বে একমাত্র রক্ষাকবজ। তবে চিকিৎসকরাই নয় পাশাপাশি ভাইরাসে আক্রান্তদের সংস্পর্শে আছেন এমন ব্যক্তিরাও ব্যবহার করছেন পিপিই। 

ধারণা করা হয়, প্লেগের সময় পোশাকটি ফরাসি চিকিৎসক চার্লস ডি ল অর্ম আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি ছিলেন ফরাসি রাজার (হেনরি চতুর্থ, লুই দ্বাদশ এবং লুই দ্বাদশ) প্রধান চিকিৎসক। ইতালির মেডিসি পরিবারের সেবাতেও এই চিকিৎসক নিয়োজিত ছিলেন। চিকিৎসকদের সুরক্ষার জন্য তিনি এই পোশাকটি তৈরি করেন। প্রথমে প্রাসাদে এটি ব্যবহার শুরু হয়। 

এরপর বাইরেও প্লেগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেলে অন্য চিকিৎসকদের ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি। তখনকার সময়ে শুধু চিকিৎসকরাই এই পোশাক ব্যবহার করতেন। এটি একপ্রকার চিকিৎসকদের ইউনিফর্ম হয়ে গিয়েছিল। এর নাম দেয়া হয়েছিল প্লেগ স্যুট। প্লেগ চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে চিকিৎসকরা বেশি ঝুঁকিতে পড়েন। আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে অনেক চিকিতসক আক্রান্ত হতে থাকেন প্লেগে। 

তখন চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিতদের প্রাথমিক কর্তব্য ছিল প্লেগে ক্ষতিগ্রস্থদের চিকিৎসা করা এবং রোগ নিরাময় করা। এমনকি মৃতদের কবর দেয়ার ভারও ছিলও চিকিৎসকদের কাঁধেই। এতে করে প্লেগ চিকিৎসকরা প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছিলেন। এরপর চিকিৎসকদের সুরক্ষায় ব্যবহার শুরু হয় ডি ল অর্মের তৈরি বিশেষ পোশাক।

তবে যে তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে পোশাকটি বানানো হয়েছিল সেটি ভুল ছিল। তাই এটি প্লেগের মহামারি ঠেকাতে পারেনি। সে সময় ডাক্তাররা যে পিপিই পরতেন, তার মধ্যে ছিল পা পর্যন্ত ঢাকা একটি লম্বা কোট। এর বাইরের আবরণে মোমের প্রলেপ দেয়া হতো। এছাড়া তারা ছাগলের চামড়ার তৈরি টুপি আর গ্লাভস পরতেন, চোখে থাকত চশমা। হাতে থাকত একটি লাঠি, পায়ে বুট জুতা। 

হাতের লাঠির সাহায্যেই তারা দূর থেকেই রোগীদের সেবা করতেন। তখনকার পিপিই এর সবচেয়ে চমকপ্রদ জিনিস ছিল মাস্ক। এটি দেখতে ছিল পাখির ঠোঁটের মতো। নাকের কাছ থেকে শুরু হওয়া এই ঠোঁট ছিল আধা ফুট লম্বা। নাকের পাশে দুটি ছোট ছিদ্র ছিল। যা নাক দিয়ে নিশ্বাস নেয়ার জন্য। এছাড়াও ছিল বড় বড় দুটি চোখ। 

তখন সবার ধারণা ছিল, প্লেগ মহামারিটি পাখিদের দ্বারা ছড়িয়ে পড়েছিল। তাই পিপিইর মাস্কটি পাখির ঠোঁটের মতো করেই তৈরি করা হয়েছিল। লম্বা ঠোঁটের ভেতর পারফিউম, সুগন্ধি, ফুলসহ বিভিন্ন পদার্থ রাখা হতো। ডাক্তাররা থেরিয়াক নামে এক ধরনের ওষুধি মিশ্রণ ব্যবহার করতেন। যাতে পুদিনা বা গোলাপের পাপড়িসহ ৫৫ ধরনের পদার্থ মিশ্রিত থাকত।  

আবিষ্কারক ডি ল অর্ম ধারণা করেছিলেন, পাখির মতো ঠোঁট থাকায় এর সুগন্ধির মিশ্রণে প্লেগের দূষিত বাতাস ডাক্তারদের নাক এবং ফুসফুসে যেতে বাধা দেবে। তবে এ উদ্ভট পিপিই কোনো কাজেই আসেনি। কারণ প্লেগ কোনো দূষিত বাতাসের মাধ্যমে তা ছড়াতো না। এর জন্য দায়ী ছিল এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া। এই ব্যাকটেরিয়াটি ইঁদুরের মাধ্যমে মানুষের শরীরে আসে। 

দুর্ভাগ্যবশত ডি ল অর্মের তৈরি পোশাক চিকিৎসকদের প্রাণ রক্ষা করতে পারেনি। সাবধানতা সত্ত্বেও অনেক চিকিৎসক প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ডি ল অর্মের তৈরি মাস্কটি এখন ইতালির মুখোশ ক্যার্নিভালে পরা হয়। এছাড়াও পরবর্তী সময়ে এটি বিভিন্ন নাটকের জন্য থিয়েটারে ব্যবহার করা হয়েছিল। বর্তমানে ডেনমার্কের বিজ্ঞান জাদুঘর স্টেনোতে এমন মাস্ক সংরক্ষিত আছে।  

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.