সিন্দুক : অতীতের এক আভিজাত্য

 


ODD বাংলা ডেস্ক: মহারাজাদের বসতি, জমিদারদের ঘর, ব্যবসায়ীদের ব্যবসাকেন্দ্র কিংবা গ্রামীণ ধনী শ্রেণির ঘরে হরহামেশাই দেখা মিলত একটি মস্ত সিন্দুকের। গানে, কবিতায় এখনও আছে সিন্দুকের কথা। কবি এবং শিল্পীরা মনের সিন্দুকের কথা বারবার বলেছেন। সেই সিন্দুকে ভালোবাসার মানুষটিকে বন্দী করে রাখার বাসনার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু যে নিদর্শন নিয়ে এত গান, কবিতা, বর্তমানে তার কি অস্তিত্ব আছে?

সিন্দুক মানে বড় মজবুত বাক্সবিশেষ। ভারতের সমাজে সিন্দুকের ব্যবহার ঠিক কবে শুরু হয়েছিল তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে গ্রামে সিন্দুকের ব্যবহার অনেক পুরনো। সম্পদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার স্বার্থে প্রাচীনকাল থেকে এর ব্যবহার হয়ে আসছে।


যতদূর জানা যায়, উনিশ শতকে ব্যাংকে আমানত রাখার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সীমিত আকারে ব্যাংকিং হতো। বিশ শতকের গোড়া থেকে মধ্যভাগ পর্যন্ত ব্যাংকের কাজ করত পোস্ট অফিসগুলো। তার আগ পর্যন্ত উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা সিন্দুকেই ভরসা করতেন। নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার, জমির দলিলসহ মূল্যবান যা কিছু রাখা হতো এর ভেতরে। বাইরে ভারি তালা ঝুলিয়ে দেয়া হতো। গ্রামে তখন চুরির ঘটনা যেমন ঘটত তেমনি হতো ডাকাতি। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সম্পদ রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখত সিন্দুক।


বর্তমান প্রজন্মের যারা সিন্দুক চেনেন না, তাদের জানিয়ে রাখা ভালো, সিন্দুক হচ্ছে বড় এবং উঁচু এক প্রকার বাক্স। ছোট আকারের সিন্দুকও আছে। সিন্দুকে চারটি পায়া থাকে। বড়গুলোতে ছয়টি। সিন্দুক ব্যাংকের ভোল্টের মতো কাজ করত। জোতদার, জমিদার এবং গৃহস্থরা নিজেদের সম্পদ এই ভোল্টে রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাতেন।


সিন্দুকের ভেতরে রাখা সম্পদের নিরাপত্তার স্বার্থে খুব মজবুত ও ভারি কাঠ অথবা স্টিল দিয়ে তৈরি হতো এর কাঠামো। বলা হয়ে থাকে- প্রাচীন সিন্দুকের গায়ে কুড়াল দিয়ে কোপ দিলে কুড়ালই দূরে ছিটকে যেত। সিন্দুক থাকত অক্ষত। মূল্যবান সম্পদের নিরাপত্তায় অনেকে আবার খাটের সমান করে সিন্দুক তৈরি করতেন। বাংলার দারুশিল্পীরা কাঠের সিন্দুক এবং খাটের নির্মাণ কৌশল অবলম্বন করে সিন্দুক-খাটের প্রবর্তন করেন। পালঙ্ক জাতীয় সিন্দুকের ওপর থাকত ঘুমানোর ব্যবস্থা। সামান্য শব্দ হলে, শক্ত হাতে সিন্দুকের গায়ে কেউ হাত রাখলে মুহূর্তেই চোখ কচলে ঘুম থেকে উঠে পড়তেন গৃহস্থ! ফলে চোররা কোনো সুবিধা করতে পারত না।


সম্পদ সুরক্ষার পাশাপাশি, সিন্দুকের গায়ে চমৎকার কারুকাজ করা হয়। পালঙ্ক জাতীয় সিন্দুকের চার কোণে প্রায়শই চারটি ফুলকলি নকশা দেখা যেত। জমিদার ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির ব্যবহৃত সিন্দুকগুলো ছিল আধুনিক কারুকাজের। সাধারণ পরিবারের কর্তারাও সিন্দুকে নিজ নিজ রুচি অনুযায়ী নকশা করিয়ে নিতেন।


বাটালির সাহায্যে সিন্দুকের কাঠ খোদাই করে ফুল, লতা-পাতা, বাঘ, সিংহ, পাখি, পৌরাণিক কাহিনীর বিভিন্ন চরিত্র, মসজিদ, মন্দির, দেব-দেবীর ফিগার ইত্যাদি আঁকা হতো। কখনও দুই দিকে, কখনও তিনদিকে কারুকাজ করা হতো। অধিকাংশ ক্ষেত্রে উলম্ব আয়তকার খোপে বিভিন্ন নকশা করে তা সিন্দুকের গায়ে বসানো হতো। এভাবে দারুণ নান্দনিক হয়ে উঠত একেকটি সিন্দুক।


সাধারণত প্রাচীন সিন্দুকের দৈর্ঘ্য হতো ছয় থেকে সাত ফুট পর্যন্ত। প্রস্থে তিন থেকে চার ফুট। উপরিভাগ দরজার কপাটের মতো বড় ঢাকনা দিয়ে আটকানো থাকত। মাঝখানে থাকে বর্গাকৃতির একটি ছোট ঢাকনা। ভেতরে জিনিসপত্র সংরক্ষণ করার জন্য ছোট ছোট খোপ বা কুঠুরির ব্যবস্থা করা হতো। এমন প্রাচীন আদলের সিন্দুক বর্তমানে প্রদর্শিত আছে জাতীয় জাদুঘরে।


গ্রামের পুরনো বাড়িতে খোঁজাখুঁজি করলে এখনও সিন্দুকের অস্তিত্ব চোখে পড়ে। এমনকি রাজধানী শহরেও সন্ধান মিলবে সিন্দুকের। তবে সিন্দুক এখন আর ততটা ব্যবহার করা হয় না। ফ্লাটে এত জায়গা কই? তবে সিন্দুককে ভুলে যাওয়াও কষ্টের। তবে বংশের অমূল্য নিদর্শন হিসেবে অনেকেই আজও সংরক্ষণ করে এই বস্তুটাকে। সিন্দুক টিকে আছে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হয়ে।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.