৫০ হাজার বছরের পুরোনো লেকের জল হঠাৎই গোলাপি হয়ে গেল!

 


ODD বাংলা ডেস্ক: গাছপালার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে গোলাপি রঙের হ্রদ। না! একেবারেই কল্পনা নয়, অস্ট্রেলিয়ায় এমন অসংখ্য গোলাপি হ্রদ রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন মিডল আইল্যান্ডে রয়েছে অন্যতম বিখ্যাত গোলাপি হ্রদ লেক হিলিয়ার। লেক হিলিয়ারের কথা এরইমধ্যে প্রায় সারাবিশ্বই জানে। তবে সম্প্রতি গোলাপি জলরাশির দেখা মিলেছে ভারতে।  

অবাক হচ্ছেন? হ্যাঁ খোদ ভারতের মহারাষ্ট্রের বুল্ধানা জেলায় অবস্থিত লোনার হ্রদের জলের রঙের এমন আকস্মিক পরিবর্তন দেখা যায়। এ নিয়ে দেশটির বাসিন্দা ও গবেষকদের মনে নানা ধরনের প্রশ্ন ও কৌতূলের সৃষ্টি হয়েছে। 


২০২০ সালের ১২ জুন মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এক প্রতিবেদনে জানায় এই লেকের কথা। লোনার হ্রদ ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাই থেকে ৫০০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। এটি প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে পৃথিবীতে আছড়ে পড়া একটি গ্রহাণুর আঘাতে সৃষ্টি হয়েছে। হঠাৎ করে হ্রদটির জলের রঙের এমন পরিবর্তন হওয়ায় এ নিয়ে স্থানীয় গবেষকদের মনেও সৃষ্টি হয়েছে নানা কৌতূহল।   


স্থানীয় গবেষকরা ইতোমধ্যে হ্রদটির জল সংগ্রহ করে এর রং পরিবর্তনের কারণ খুঁজতে শুরু করেছেন। তবে এখনো এই রং পরির্তনের সঠিক কারণ বুঝতে পারেননি তারা। গবেষকদের মতে, জলের লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেলে অথবা জলে থাকা লাল বর্ণের জলজ শৈবালের কারণে অথবা দুটোর সম্মিলিত প্রভাবের ফলেও জলের রঙের এমন পরিবর্তন হতে পারে। তবে এটি এখনো নিশ্চিত নয়।


সম্প্রতি লোনার হ্রদের জলের রং পরিবর্তনের একটি ভিডিও টুইটারে পোস্ট করা হয়েছে। ভিডিওটি পোস্ট করা হয়েছে মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকারের পর্যটন বিভাগের টুইটারে। পোস্টটি করেছেন স্থানীয় ভূতত্ত্ববিদ গজানন খারাত। ওই টুইট পোস্টে তিনি জানান, এর আগেও হ্রদটির জলের বর্ণ পরিবর্তন হতে দেখা গেছে। তবে কোনোবারই এবারের মতো এতটা স্পষ্ট ও দৃশ্যমান ছিল না।   


তিনি আরো বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, চলতি বছরে হ্রদটির জলের লবণাক্ততা অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই জলের রং লোহিত বা আংশিক গোলাপি বর্ণ ধারণ করেছে। অথবা লাল রঙের জলজ শৈবালের উপস্থিতির কারণে এমনটা হয়েছে। তীব্র উত্তাপে হ্রদটির জল অনেকটা শুকিয়ে যাওয়ায় এই রং পরিবর্তন আরো তীব্রভাবে দৃশ্যমান হয়েছে।


 ২০১৫ সালে মিডল আইল্যান্ডের লেক হিলিয়ারের জলের রং নিয়ে গবেষণা শুরু করেন এক্সট্রিম মাইক্রোবায়োমি প্রজেক্ট (এক্সএমপি)-এর এক দল বিজ্ঞানী। সে হ্রদের জল কেন গাঢ় গোলাপি, তার সন্ধান শুরু করেন তারা। এক্সএমপির বিজ্ঞানীরা প্রথমে ভেবেছিলেন, লেক হিলিয়ারের আশপাশের লবণাক্ত পরিবেশে বেশ কিছু এক্সট্রিমোফিল থাকার জন্য হয়তো তার জলের এ রকম রং। এক্সট্রিমোফিল হলো তীব্র প্রতিকূল পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারা কিছু আণুবিক্ষণিক জীব। মিডল আইল্যান্ডে গিয়ে বিজ্ঞানীরা প্রথমেই লেক হিলিয়ারের জলের নমুনা সংগ্রহ করেন। এরপর এক্সট্রিমোফিলগুলোর ডিএনএ বিশ্লেষণ করেন তারা।   


পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বিজ্ঞানীরা দেখেন, লেক হিলিয়ারের জলে রয়েছে দশ ধরনের ব্যাকটিরিয়া। যেগুলো লবণাক্ত পরিবেশে বেঁচে থাকে বহুদিন। তা ছাড়াও এখানে রয়েছে, বিভিন্ন প্রজাতির ডানালিয়েলা অ্যালগি বা শ্যাওলা। যার বেশির ভাগের রংই সবুজের পরিবর্তে গোলাপি বা লাল রঙের। এ ধরনের শ্যাওলার রঙের জন্যই কি লেক হিলিয়ারের জলের রং গোলাপি? না! এর থেকে অবাক করে দেয়া তথ্য পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ওই নমুনায় যে সব ব্যাকটেরিয়া মিলেছে, তার মধ্যে ছিল এক বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়াও। বিজ্ঞানীরা জানান, লেক হিলিয়ারের জলের যে নমুনা সংগ্রহ করেছেন তারা, তার ৩৩ শতাংশ জুড়ে ছিল স্যালিনিব্যাকটের রাবার নামের এক বিশেষ ব্যাকটেরিয়া।   


তবে লোনার হ্রদের জলের রং কেন এমন পরিবর্তন হল তা নিয়ে গবেষণা চালিয়েই যাচ্ছেন গবেষকরা। গজানন আরো জানান, হৃদটির জলের রং আকস্মিভাবে পরিবর্তন হওয়ার কারণ অনুসন্ধান করার জন্য ইতোমধ্যে দেশটির নানা গবেষণাগারে জলের নমুনা পাঠানো হয়েছে। নমুনা পরীক্ষার পরই এর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। 


প্রসঙ্গত, দেশ-বিদেশে পর্যটকদের কাছে লোনার হ্রদ খুবই জনপ্রিয়। পাশাপাশি এটি সৃষ্টির পেছনে ঐতিহাসিক কারণ থাকায় বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা এই হৃদ নিয়ে গবেষণা করছেন। অস্ট্রেলিয়া ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত গ্রেট সল্ট লেকের জলের কিছু অংশে এমন গোলাপি আভা দেখা গেছে।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.