মিশরীয় সভ্যতার আগেও যারা বানাতেন মমি



 ODD বাংলা ডেস্ক: মমির কথা উঠলেই মনে আসে মিশরের কথা। এ বুঝি তাদের একক ঐতিহ্য। ফলে দক্ষিণ আমেরিকার একেবারে প্রান্ত দেশ পেরু এবং চিলির সীমান্ত অঞ্চল থেকে যখন একের পর এক মমি পাওয়া যাচ্ছিল, তখন সেদিকে দৃষ্টিই দেননি অধিকাংশ  গবেষকরাই।


অধিকাংশ গবেষকদের বিশ্বাস ছিল, মমি তৈরির প্রক্রিয়া একান্তই মিশরীয়দের। এ আবিষ্কারে অন্য কোনো জাতির কোনো অবদান নেই।


কিন্তু গত এক শতাব্দী ধরে দক্ষিণ আমেরিকার আরিকা এবং পারিনাকোটা অঞ্চলে মমি উদ্ধারের ঘটনা বাড়তেই থাকে। কখনো নতুন বাড়ি তৈরি করতে গিয়ে মাটির নিচ থেকে পাওয়া যেত অদ্ভুত সব মৃতদেহ। কখনো আবার কোনো পোষ্য কুকুর হঠাৎ রাস্তার ধারে মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে বের করে আনত পুরাতন সব মরদেহের অংশ। এমনকি অনেক সময় শোনা যেত স্থানীয় শিশুরা মৃতদেহের মাথার খুলি নিয়ে ফুটবল খেলছে।


প্রথমদিকে স্থানীয়দের কাছে বিষয়টা আতঙ্ক ও উদ্রেক মনে হয়েছে। তবে ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন তারা। এসবের ফলে ঐতিহাসিকদের পক্ষে আর নির্বিকার হয়ে থাকা সম্ভব হল না। আর এই সময়েই সমস্ত মমি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে এলেন দুই নারী। তাদের নাম ‘আনা মারিয়া নিয়েটো’ এবং ‘পাওলো পিমেন্টাল’। একটু একটু করে তাদের গবেষণা এগিয়ে যায়।


দক্ষিণ আমেরিকার অতি প্রাচীন চিচোরো জনজাতির ইতিহাস আবিষ্কার করতে করতে চমকে উঠেছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরাও। আর সম্প্রতি চিচোরো জনজাতির ইতিহাসের নিদর্শন হিসেবে আরিকা ও পারিনাকোটা অঞ্চলকে আন্তর্জাতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে খোদ ইউনেস্কো।


দক্ষিণ পেরু ও উত্তর চিলির সীমান্ত অঞ্চলে চিচোরো জনজাতির বসবাস শুরু হয় আনুমানিক সাত হাজার বছর আগে। অর্থাৎ মিশরীয় সভ্যতার চেয়েও অন্তত দুই হাজার বছরের পুরনো এই চিচোরো সভ্যতা। আর এখানকার মমিদের বয়সও ততটাই প্রাচীন। তেমনই প্রাচীন মমি তৈরির পদ্ধতিও। তবে প্রায় সব মমিই মানুষ কৃত্রিমভাবে তৈরি করেছে, প্রকৃতির নিয়মে মৃতদেহ যেভাবে মমিতে পরিণত হয়, তেমনটা নয়। এমনটাই জানাচ্ছেন ঐতিহাসিকরা।


অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মমির শরীরের মধ্যে কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাওয়া যায়নি। অনুমান করা হয়, পচনের হাত থেকে বাঁচাতে সেইসব অঙ্গ বের করে নেওয়া হতো। তারপর সমুদ্রের জল আর রোদে শুকিয়ে ফেলা হত চামড়া। প্রায় পুড়ে যাওয়া চামড়ার ভিতরে বাঁশ-লাঠি দিয়ে তৈরি করা হত কাঠামো। অনেক ক্ষেত্রে অবশ্য হাড়গুলো দিয়েই কাঠামো অবিকৃত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এরপর মাথায় কালো চুল এবং কাদা দিয়ে তৈরি মুখোশ পরিয়ে দেওয়া হত।


মিশরীয়দের চেয়ে চিচোরোদের মমি তৈরির পদ্ধতি যেমন আলাদা, তেমনই আলাদা ছিল রীতিনীতিও। মিশরে শুধু রাজপরিবারের সদস্য এবং অভিজাত মানুষদেরই মমি পাওয়া যায়। কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকায় নারী-পুরুষ, শিশু এমনকি মৃত ভ্রূণের মমিও পাওয়া গিয়েছে। আর এইসমস্ত মমির ক্ষেত্রে সামাজিক পদমর্যাদার কোনো বিষয় ছিল না। চিচোরো সমাজও অনেক বেশি সাম্যবাদী ছিল বলেই অনুমান ঐতিহাসিকদের। এইসমস্ত মমি সেই নমুনাই বহন করে।


এখনও অবধি কয়েক হাজার মমি উদ্ধার করা হয়েছে আরিকা ও পারিনাকোটা অঞ্চলে। তার মধ্যে মাত্র ৩০০টি মমি মিউজিয়ামে জায়গা পেয়েছে। তবে সমস্ত মমিকেই এক জায়গায় এনে পৃথক একটি মিউজিয়াম তৈরির প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন আনা মারিয়া নিয়েটো এবং পাওলো পিমেন্টেল।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.