মোবাইল আসক্তি ছাড়াতে ছেলেকে মঙ্গোলিয়ায় নিলেন বাবা



 ODD বাংলা ডেস্ক: জেমি ক্লার্ক একজন কিশোরের বাবা। যিনি একাধারে স্কাইয়ার্স, পর্বতারোহী ও ট্রেকার। একটি বিশেষ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ছেলে খোবকে নিয়ে মঙ্গোলিয়ার পাড়ি জমান এ ব্যক্তি। সেই গল্প শুনাচ্ছিলেন মি. ক্লার্ক ও তার ছেলে খোব।

মঙ্গোলিয়ার একটি প্রত্যন্ত উপত্যকায় মোটরসাইকেলে চড়ছিলেন অভিযাত্রী মি. ক্লার্ক। সাইকেলের ইঞ্চিনের ঘূর্ণিপাক ও বাতাসের প্রতিধ্বনির সময় তিনি উদ্দেশ্যহীনভাবে চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। বেশ কয়েক ঘণ্টার পর তিনি তার নড়ে যাওয়া হেলমেট ঠিক করেন এবং একটি ম্যাপ দেখেন।


দুঃসাহসিকতাকে মি. ক্লার্ক ভালোবাসেন। যেখানে নির্জনতা, প্রাকৃতিক দৃশ্য ও নিজের লক্ষ্যবস্তুর দায়িত্বশীলতা রয়েছে। কিন্তু যখন মোটরসাইকেলে চালকের আসনে থাকা তার ১৮ বছরের ছেলে খোব থেমে যায়, তখন সেই লম্বা যাত্রার বিরতি হয়। সেই সময় তার চিন্তায় ছিল উপন্যাস ও সঙ্গে ছিল উদ্বেগ।


তখন মি. ক্লার্ক বলছিলেন, ওহ আমার বিধাতা, এটি ছিল ভয়ঙ্কর! আমি আমার চিন্তা থেকে বিষয়টি মুছতে পারছি না। কিন্তু কেন বাবা ও ছেলে এমন দুঃসাহসিক অভিযাত্রা শুরুর সিদ্ধান্ত নেন।


মি. ক্লার্ক ছেলে খোবের সংস্পর্শ হারানো অনুভব করছিলেন। তিনি ছেলেকে তার আলবেরটার ক্যালগারি বাড়িতে সবসময় মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখতেন।


ছেলের মোবাইল প্রীতির জন্য তিনি নিজেকে আংশিকভাবে দোষারূপ করেন। কারণ সবার মতো তার একটি ব্ল্যাকবেরি ব্র্যান্ডের স্মার্টফোন ছিল, যেটিতে ছোট ছেলেকে নিয়ে গেমস খেলা উপভোগ করতেন তিনি।


মি. ক্লার্ক বলেন, যদি আমাদের ব্যক্তিগত ও পরিবারে কোনো আসক্তি থাকে, তবে এটি আমরা (বাবা-মা) স্থায়ী করি। তিনি আরো বলেন, আমরা বুঝতে পারি নিরব যন্ত্র আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে। আমরা এর বিপরীতে যেতে পারছি না।


এই ইস্যুটি কয়েক বছর আগে মাথায় আসে, যখন আমি একটি সাপ্তাহিত ছুটিতে আমার ৫০ তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করতে পরিবার নিয়ে স্কাই লজে (বরফযুক্ত খোলা আকাশের নিচে ঘর) যাই। যেখানে কোনো ওয়াই-ফাই বা মোবাইলের যন্ত্রণা নেই।


ছেলে খোব বলেন, আগে কোনো সাপ্তাহিক অবকাশে মোবাইল ছাড়া থাকার অভিজ্ঞতা হয়নি। এটি আমার জন্য ছিল অদ্ভুত। 


খোব স্বীকার করেন যে, মোবাইল ছাড়া তিনি খুব রাগান্বিত ছিলেন। কারণ একটি সংকীর্ণ এলাকায় গিয়েছিলেন তারা। যেখানে তিনি স্ন্যাপচ্যাট ও ইন্সট্রাগাম ছাড়া ছিলেন। বাড়িতে ফেরার পর তার বন্ধুরা কি ভাববে এমন ধারণা করছিলেন তিনি।


তিনি আরো বলেন, পারিবারিক জীবনে প্রযুক্তির ভূমিকা নিয়ে বাবার মাথায় চিন্তা পেয়ে বসে। তিনি সমস্যাটির সমাধানের পথ খোঁজেন। 


দীর্ঘদিন পর হঠাৎ বাবা ক্লার্ক মঙ্গোলিয়ায় মোটরসাইকেলের মাধ্যমে ভ্রমণের স্বপ্ন দেখেন। তিনি আমাকে নিয়ে কেন অভিযাত্রা করবেন না? এমন প্রশ্ন পেয়ে বসে বাবার মনে।


খোব আরো বলেন, প্রায় এক বছর আগে বাবা আমাকে মঙ্গোলিয়ায় যাওয়ার প্রস্তাব দেন। এটি কোনো সক্রিয় প্রস্তাব ছিল না। আমি দ্রুত সিদ্ধান্ত দিলাম না। কিন্তু এটি একটি মজার ধারণায় রূপান্তর হয়েছিল। ইহা ছিল একটি উত্তেজনাময় যাত্রার প্রস্তুতি।


যখন মোটরসাইকেলের লাইসেন্স পাই এবং লম্বা যাত্রার অনুশীলন করি। এর আগেই বাবা দুইবার এভারেস্টের চূড়ায় উঠেছিলেন। কিন্তু আমি কোনো সময় পর্বত চড়িনি। তাই সে অনুশীলন করছিলাম।


যদিও ভ্রমনটি নিশ্চিতভাবে ইন্সট্রাগাম নির্ভর ছিল। তবুও বাড়িতে ফেরার আগ পর্যন্ত অনলাইনে ছবি দেয়া থেকে বিরত ছিলাম আমরা। মোবাইল থেকে দূরে থাকাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।


খোব আরো বলেন, আমি চিন্তা করেছিলাম মোবাইল ছাড়া ভালো সময় পার করছি। তবে প্রতিটা বিষয়ে বিরক্ত ছিলাম। বাসায় যখন বিরক্ত হতাম, তখন ইউটিউব বা নেটফ্লিক্স দেখতাম। তবে ভ্রমণে এসে আমি কি করছি? মোবাইলের বদলে সামনের তারা দেখতে হচ্ছে এবং ইচ্ছামতো ঘুরতে হচ্ছে।


তিনি বলেন, বাবা এ ব্যাপারে সঠিক ছিলেন। আমরা সড়কে তাবু বা মঙ্গোলিয়ার লোকের মতো বড় তাবুতে রান্না করে ভালো সময় কাটাতাম। আমি আশ্চর্য হয়েছিলাম যে, বাবা কাজের পরিবেশ ও পরিবার ছেড়ে আমার সঙ্গে সমবয়সীর মতো আচরণ করেন।


এদিকে অনুরূপভাবে মি. ক্লার্ক আশ্চর্য হয়েছিলেন যে, তার ছেলে কতটা ম্যাচিউর। তখন তার বাবার সঙ্গে এমন বাবা-ছেলের সম্পর্ক ছিল না।


মি. ক্লার্ক বলেন, এ ভ্রমণ খোবকে দেখার নতুন পথ দেখায়। আমি তাকে শিশু হিসেবে দেখেছিলাম। যে তার জ্যাকেট টেবিলে রাখত, খাবারের পর পরিষ্কার করত না। তাকে আমি এক যুবক হিসেবে দেখার সামর্থ্য লাভ করলাম। আমি অভিভূত যে, সে চাপের মধ্যে ভালোভাবে কাজ করতে পারে।


মি. ক্লার্ক বলেন, আমাদের ভ্রমণ শেষ। আমি ও আমার ছেলে অভিজ্ঞতা প্রয়োগের চেষ্টা করছি, যা আমরা প্রতিদিন শিখেছিলাম। আমি উপলব্ধি করেছি যে, প্রযুক্তি মূল্যবান ও ব্যবহার করা উচিত। অপরদিকে ছেলে উপলব্ধি করেছে যে, প্রযুক্তি কিভাবে জীবন থেকে সময় কেড়ে নেয়।


ছেলে খোব বলেন, আমি প্রযুক্তিকে ব্যবহারের চেষ্টা করছি। যেভাবে আমি চাই, কিন্তু আসক্তের মতো না।


তিনি আরো বলে, যখন আমরা মোবাইলের মাধ্যমে মানুষের দলে থাকি তখন একটি সামাজিক সময় কাটাচ্ছি বলে আমরা মনে করি। কিন্তু প্রত্যেকেই নিজের মোবাইলে ব্যস্ত থাকি। যে অভ্যাসটি আমি পরিবর্তনের চেষ্টা করেছি। এটিও উপলন্ধি করেছি যে, মানুষের প্রতি ভালোভাবে মনোযোগ না দেয়াটা অভদ্রতা।


কমনসেন্স মিডিয়ার পেরেন্টিং মিডিয়ার সম্পাদক ক্যারোলিন নর বলেন, শিশুর সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করতে কোনো বাবাকে পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তে যেতে হবে না। সারা বছরকে ঘিরে বাড়িতে একটি নির্ধারিত সময় ভাগ করতে পারেন বাবা-মা। বিশেষ করে ছুটির দিন। 


তিনি আরো বলেন, সন্তানদের সঙ্গে অনির্ধারিত সময় মজাদার জিনিস করা যেতে পারে। যেমন গেমস খেলা, হাঁটা, এমনকি চলচ্চিত্র দেখা যেতে পারে। ছুটির সারাদিন সোফায় শুয়ে মোবাইলে ব্যস্ত থাকা সহজ। কিন্তু শিশুদের লালন করতে বাবা-মাকে একটি মডেল আচরণ করতে হবে।


মিসেস নর বলেন, বাবা-মার সঙ্গে সন্তানদের যোগাযোগ কেন মূল্যবান। এটিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেন মানুষ হিসেবে যোগাযোগহীন, সীমিত সময় নিয়ে পরিবারকে মূল্যায়ন করা হয়। আপনি স্পষ্ট করে বলুন, আমি পরিবারকে সময় দিতে আমার মোবাইল বন্ধ করলাম।


মিসেস নর আরো বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার সবার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে করি বেশির ভাগ সময় বাবা-মা’রা উদ্বিগ্ন থাকেন যে, মিডিয়ার প্রভাবে আমাদের বাচ্চাদের আচরণ পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে উন্নয়নের অংশ হিসেবে পপ সংস্কৃতিতে বাচ্চারা ঝুঁকে পড়ছে। পাশাপাশি তারা পারিবারিক সময়ে অনীহা প্রকাশ করছে।


তিনি বলেন, কৈশোর জীবনে সামাজিক অ্যাপ টিকটক এবং স্ন্যাপচ্যাট মিশ্রিত হয়েছে। এসব সামাজিক অ্যাপগুলো টাকা ও বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে বানানো হয়। যেটি দ্বিগুণ ঘৃণ্য বিষয়।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.