ক্রাউন শাইনেস : যে কারণে একে অপরের থেকে দূরে থাকে গাছেরা
ODD বাংলা ডেস্ক: একটি গাছ স্পর্শ করে না তার কাছের গাছটিকেই। যেন ঘড়ের পাশে থাকা প্রতিবেশী থেকে দূরত্ব বজায় রাখার মতো বিষয়। গাছের মধ্যকার ফাঁক যায়গা দেখলে মনে হতে পারে ছোঁয়াচে রোগীর মতোই দূরে রেখেছে একে অন্যকে। গাছদের মধ্যে এ ধরনের দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টিকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন ‘ক্রাউন শাইনেস’।
বলে রাখা ভালো, সব গাছের ক্ষেত্রে ক্রাউন শাইনেস ঘটে না। আবার সব বনে ক্রাউন শাইনেসের দেখা নাও পাওয়া যেতে পারে। ব্ল্যাক ম্যানগ্রোভ (Avicennia germinans), পাইন গাছ (Pinus contorta), জাপানিজ লার্চ (Larix kaempferi), ইউক্যালিপ্টাসের কিছু প্রজাতি ছাড়াও আরো কিছু প্রজাতির মধ্যে ক্রাউন শাইনেস দেখা যায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির গাছের মধ্যেও এটি দেখা যায়। আবার একই গাছের একাধিক ডালের মধ্যেও এটি দেখা যেতে পারে।
এক গাছের সঙ্গে আরেক গাছের দূরত্ব বজায় রাখার এমন দৃশ্য বিশ্বের বিভিন্ন জায়গাতেই দেখা যায়। কোস্টারিকার ম্যানগ্রোভ থেকে শুরু করে মালয়েশিয়ার কর্পূর গাছেও এ ধরনের দূরত্ব চোখে পড়ে।
গাছদের মধ্যে এ শূন্যস্থান সৃষ্টি হওয়ার আসল কারণ এখনও উদঘাটন করতে পারেনি বিজ্ঞানীরা। একেক বিজ্ঞানী একেক তত্ত্ব দিয়েছেন। তবে বেশিরভাগ বিজ্ঞানীরা স্বীকার করেছেন, ক্রাউন শাইনেসের পেছনে একক কোনো কারণ না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।
কিছু বিজ্ঞানী প্রথমদিকে অনুমান করেছিলেন যে, সালোকসংশ্লেষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আলোর অভাবের কারণে গাছগুলো তাদের মধ্যকার এই শূন্যস্থানগুলো পূরণ করতে পারে না।
জীববিজ্ঞানী এবং ট্রি ফাউন্ডেশনের পরিচালক মেগ লোম্যানের মতে, এ ধরনের ক্রাউন শাইনেস স্যোশাল ডিসট্যান্সিংয়ের বৃক্ষ-সংক্রান্ত সংস্করণও হতে পারে। যে মুহুর্ত থেকে আপনি গাছগুলোর মধ্যে দূরত্ব বাড়াতে পারবেন, তখন থেকে আপনি গাছগুলোর উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারবেন। আইসোলেশনের (বিচ্ছিন্নতা) এটাই সৌন্দর্য। গাছগুলো আসলে তাদের নিজেদের স্বাস্থ্যরক্ষা করে চলেছে।
১৯৫৫ সালে উত্তর-পূর্ব অস্ট্রেলিয়ায় ইউক্যালিপ্টাসের এক জাতের গাছের ওপর এক গবেষণা করা হয়। এতে বলা হয়, এখানে প্রচণ্ড বাতাসের কারণে এক গাছ আরেক গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায়। এতে গাছগুলোর শীর্ষের পাতা এবং ডাল ভেঙে যায় এবং এক গাছের সঙ্গে আরেক গাছের মধ্যে জায়গা তৈরি হয়। ১৯৮৪ সালের এক গবেষণায় জানানো হয়েছে, কিছুক্ষেত্রে বায়ুর প্রভাবে গাছের মধ্যে যে দোলা লাগে, তার কারণে ক্রাউন শাইনেস তৈরি হতে পারে। গবেষকদের মতে, যত বেশি বাতাস ম্যানগ্রোভে প্রবাহিত হচ্ছিল, গাছগুলোর শীর্ষের মধ্যে দূরত্বও তত বাড়ছিলে।
ক্রাউন শাইনেসের পেছনে গাছের নিজস্ব সুবিধার বিষয়টি জড়িত বলে মনে করেন গবেষক লোম্যান। তিনি বলেন, গাছের অন্যতম একটি অঙ্গ হচ্ছে তার পাতা। গাছ চায়, যেকোনো মূল্যে তার পাতাকে রক্ষা করতে। যদি বাতাসের কারণে এর কোনো একটি ডাল আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তাহলে তা গাছটির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এজন্যও গাছেরা দূরত্ব বজায় রেখে বসবাসের চেষ্টা করে।
প্রতিটি গাছ তার প্রতিবেশীদের এমন একটি প্যাটার্নে বা ছাঁচে যেতে বাধ্য করে, যা ক্ষতিকারক প্রতিযোগিতা হ্রাস করে। বাস্তুসংস্থান সংক্রান্ত মিথস্ক্রিয়া বেশ জটিল বিষয়। ফলে ক্রাউন শাইনেসের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।




Post a Comment