বাঁচুন জরায়ুর ক্যান্সার থেকে!
ODD বাংলা ডেস্ক: বিশ্বব্যাপী মারণব্যাধিগুলোর মধ্যে ক্যান্সার অন্যতম। জরায়ু মুখের কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে যে পিণ্ডের আকৃতির গঠন তৈরি হয় তাকেই জরায়ুমুখ ক্যান্সার বলে। আমাদের দেশে ক্যান্সারজনিত কারণগুলোর মধ্যে এটি দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। তবে আগে কিন্তু এটা প্রথম অবস্থানেই ছিল।
তবে আশার কথা হলো, বর্তমানে টিকার আবিষ্কার ও সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে এটির অবস্থার অনেকটা উন্নতি হয়েছে। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নিলে জরায়ুমুখ ক্যান্সার সম্পূর্ণ ভালো হয়।
জরায়ুমুখ ক্যান্সারের কারণ
♦ অল্প বয়সে বিয়ে বা যৌনমিলন
♦ অপ্রাপ্ত বয়সে গর্ভধারণ
♦ অধিক সন্তান গ্রহণ
♦ বহুগামিতা
♦ ধূমপান
♦ জরায়ুমুখে ভাইরাসের (হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস) সংক্রমণ।
জরায়ুমুখ ক্যান্সারের লক্ষণগুলো
♦ অনিয়মিত মাসিক
♦ তলপেটে চাপ চাপ অনুভব করা
♦ মাসিক পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও রক্তপ্রবাহ
♦ রক্ত ও বাদামি দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব
♦ যৌনমিলনের সময় ব্যথা ও স্রাব
জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে করণীয়
ঔষধি প্রতিরোধকের চেয়ে আচরণগত প্রতিরোধকের দিকে বিজ্ঞানীরা বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন। যেমন— বাল্যবিবাহ রোধ; অধিক সন্তান প্রসব; ধূমপান করা (এমনকি পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হওয়া); পানের সঙ্গে জর্দা, সাদাপাতা, দাঁতের গোড়ায় গুল (তামাকের গুঁড়া) রাখা ইত্যাদি কারণে এই ক্যান্সারে আক্রান্তের আশঙ্কা বাড়ে। আর সুষম খাবার গ্রহণ; দৈনিক তিন-চারবার ফল, শাকসবজি, তরকারি খাওয়া; পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যসম্মত, সুশৃঙ্খল জীবনযাপন ও সামাজিক অনুশাসন মান্য করা এই রোগ প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
প্রাথমিকভাবে জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে ১৩ থেকে ১৪ বছরের কিশোরীদের টিকা দিতে হবে। জরায়ুমুখ ক্যান্সারের ভ্যাকসিনে প্রায় শতভাগ সুফল পাওয়া যায়। টিকা দেওয়ার পাশাপাশি কি এদের স্ক্রিনিংয়ের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। সর্বোপরি জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, স্ক্রিনিং সেন্টারে গিয়ে সব মাকে স্ক্রিনিং করাতে হবে।
স্ক্রিনিংয়ের তিনটি পদ্ধতি রয়েছে
♦ ভায়া টেস্ট
♦ প্যাপ স্মেয়ার বা এলবিসি
♦ এইচপিভি ডিএনএ টেস্ট
ভায়া টেস্ট
এই টেস্টটি সরকারিভাবে করা হয়। সব সরকারি জেনারেল হাসপাতালগুলোতে এই টেস্টের সুবিধা রয়েছে এবং বিনা মূল্যে করা। এই টেস্টের মাধ্যমে নির্ণয় করা হয় যে জরায়ু মুখের ক্যান্সারের আশঙ্কা আছে কি না। ভায়া টেস্টের পর দুই ধরনের কার্ড দেওয়া হয়। একটি হচ্ছে লাল কার্ড এবং অন্যটি হচ্ছে নীল কার্ড। যাঁদের নীল কার্ড দেওয়া হয় তাঁদের বলা হয় আপনার জরায়ুতে ক্যান্সারের কোনো লক্ষণ নেই এবং আবার তিন বছর পর এই পরীক্ষাটি করুন। আর যাঁদের লাল কার্ড দেওয়া হয় তাঁদের বলা হয় আপনি নিকটস্থ কোনো হাসপাতালে গিয়ে কলপোস্কপি ও বায়োপসি করাবেন।
কিভাবে কলপোস্কপি পরীক্ষা করা হয়?
একজন নারীরোগ বিশেষজ্ঞ হাসপাতাল বা তাঁর ব্যক্তিগত চেম্বারে কলপোস্কপি পরীক্ষা করে থাকেন। কলপোস্কপ (Colposcope) নামের একটি বিশেষ ক্যামেরার মাধ্যমে জরায়ুমুখ ও যোনিপথ অতি সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। কোনো জায়গা অস্বাভাবিক মনে হলে সেখান থেকে কিছু কোষ বা সেল নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। একে প্যাপ স্মেয়ার (Pap smear) বলে। প্রয়োজন হলে সন্দেহজনক স্থান থেকে যন্ত্রের সাহায্যে চিমটি দিয়ে কোষ কলা (Tissue) নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। একে বায়োপসি (Biopsy) বলা হয়। কলপোস্কপি পরীক্ষায় সাধারণত নিম্নলিখিত সমস্যাগুলো ধরা পড়ে।
♦ জরায়ুমুখ বা সারভিক্সের ক্যান্সারের পূর্ব লক্ষণ।
♦ যোনিপথে/যোনিমুখে ক্যান্সারের পূর্ব লক্ষণ।
♦ জরায়ুমুখের প্রদাহ।
♦ যৌনরোগ।
ভ্যাকসিনের মাধ্যমে চিকিৎসা
সাধারণত ১০ বছর বয়সের পর থেকেই জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধক টিকা নেওয়া যায়। মোট তিন ডোজ টিকা নিতে হয়। প্রথম ডোজের এক মাস পর দ্বিতীয় ডোজ এবং প্রথম ডোজের ছয় মাস পর তৃতীয় ডোজ টিকা নিতে হয়। টিকা গ্রহণের পাশাপাশি নিয়মিত পরীক্ষা করালে জরায়ুমুখ ক্যান্সারের আক্রমণ হার কমিয়ে আনা যায়। ভাইরাস এইচপিভি-১৬, এইচপিভি-১৮, এইচপিভি-৬, এইচপিভি-১১-এর প্রতিরোধক টিকা আবিষ্কৃত হয়েছে। আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) নিয়মানুযায়ী ৯ থেকে ২৫ বছর বয়সে এ টিকা কার্যকর হয়।
আমাদের দেশে দুই ধরনের ভ্যাকসিন পাওয়া যায়—সার্ভারিক্স ও গার্ডাসিল। এই ভ্যাকসিনগুলো অবশ্য সরকারিভাবে দেওয়া হচ্ছে না। তবে বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতালে অথবা চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে এই ভ্যাকসিনগুলো তিনটি ডোজের মাধ্যমে দেওয়া হয়। এতে তিন থেকে চার হাজার টাকার মতো খরচ হয়।
ভ্যাকসিন বা টিকা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
♦ বিবাহিত জীবন যাপন করা নারীদের এ টিকা তেমন কার্যকর হয় না।
♦ গর্ভাবস্থায় এ টিকা নেওয়া এখনো অনুমোদন পায়নি।
♦ এইচভিপি ইনফেকশন হয়ে যাওয়ার পর বা ক্যান্সার হয়ে যাওয়ার পর টিকা দিলে কোনো কাজে আসে না। কারণ এ টিকা ইনফেকশন দমন করতে পারে না এবং ক্যান্সারের গতিও রুদ্ধ করতে পারে না।
♦ এ টিকা গ্রহণকারীকেও নিয়মিত পেপস স্মেয়ার পরীক্ষায় যেতে হবে।
এ ছাড়া স্বামী-স্ত্রী বা যেসব নারী ও পুরুষের একাধিক যৌন সঙ্গী রয়েছে বা অল্প বয়সে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছে, এমন ক্ষেত্রে কনডম ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে ভাইরাসের সংক্রমণ রোধ করা সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, জরায়ুমুখ ক্যান্সার একটি প্রতিরোধযোগ্য ক্যান্সার। জনসচেতনতাই পারে জরায়ুমুখ ক্যান্সার নির্মূল করতে। আসুন সচেতন হই—জরায়ু ক্যান্সার প্রতিরোধ করি।
একনজরে
♦ জরায়ু ক্যান্সারকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ এই অসুখে আক্রান্ত হলেও অনেক নারী এটির লক্ষণ বুঝতে পারেন না।
♦ একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতিবছর সারা বিশ্বে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ নারী এই জরায়ুমুখ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন।
♦ সারা বিশ্বে প্রায় সাড়ে তিন লাখ নারী এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
♦ ভারতে প্রতিবছর ১২ হাজার নতুন রোগী এই রোগে শনাক্ত হন এবং প্রায় ছয় হাজার নারী মৃত্যুবরণ করেন।
♦ এটি বিশ্বের একমাত্র ক্যান্সার, যার টিকা আবিষ্কার হয়েছে।
♦ ভ্যাকসিন শতভাগ না হলেও ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ এই জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে।





Post a Comment