স্বর্গীয় যৌনতার জটিল বিজ্ঞান
ODD বাংলা ডেস্ক: পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকে বেঁচে থাকার তাগিদে মানবজাতি সংঘবদ্ধ বসবাস শুরু করে। একে অন্যের দ্বারা উপকৃত হতে থাকে। পাহাড়ের গুহায় বা বনে-জঙ্গলে মানুষ যখন বসবাস করত তখনও সঙ্গীই তাদের একমাত্র অবলম্বন ছিল। এই সংঘবদ্ধ বসবাসের তাগিদেই মানুষের মনে জন্ম নেয় স্নেহ, আবেগ, ভালোবাসা, প্রেম নামক কিছু অনুভূতি। নৃবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব বা দর্শনের নানা উপাত্ত থেকে জানা যায়, সেই প্রাচীন বা আদিম সাম্যবাদী সমাজ থেকে যেসব বৈশিষ্ট্য মানুষ তার নিজের দেহে থাকা ডিএনএ বা জিনে বহন করে তাদের মধ্যে আবেগ-ভালোবাসাও অন্যতম।
সন্তানের সঙ্গে পিতা-মাতার স্নেহ-মায়া কিংবা ভাই-বোনের মাঝে মমত্ববোধের কারণে জন্ম নেয়া যে রক্তের টান থাকে, সেটাই ভালোবাসা। কখনো বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর, ছাত্রের সঙ্গে শিক্ষক, আত্মীয় কিংবা প্রতিবেশীর সঙ্গেও ব্যক্তির সৃষ্টি হয় গভীর টান; এগুলোও একেক প্রকার ভালোবাসা। বিবাহিত দাম্পত্য জীবনের নারী-পুরুষের মধ্যে পরম ভরসা ও যৌন বন্ধন জনিত খুনসুটির সাক্ষী হয়েই গভীর পারস্পরিক অনুভূতি সৃষ্টি হয়, এই সুখের আরেক নাম ভালোবাসা। এগুলো সবই নানা ধরনের সম্পর্কের ভালোবাসার উদাহরণ। এতসব সম্পর্কের বাইরেও আরো এক প্রকারের প্রসিদ্ধ আবেগ অনুভূতি গড়ে তুলেছে মানব সভ্যতা। এই আবেগি সম্পর্কের নাম প্রেমিক-প্রেমিকার প্রেম বা প্রেমতাত্ত্বিক ভালোবাসা। সব প্রকারের ভালোবাসাকে পাশ কাটিয়ে রক্তের সম্পর্কহীন মানব-মানবীর প্রেম নিয়ে কথা হবে আজ।
শত প্রকারের ভালোবাসার মাঝেও এই ধরনের ভালোবাসা বা প্রেম নামক অনুভূতি হয়ত সবার জীবনেই কম-বেশি নাড়া দেয়। তবুও আমারা কি ঠিক জানি- কোনো মানব-মানবীর আবেগকে আকড়ে সৃষ্টি হওয়া এই ভালোবাসার সংজ্ঞা কি? কেন আমরা ভালোবাসি? কেনই বা ভালোবাসা আমাদের প্রতিনিয়ত আকৃষ্ট করে? কেনই বা ভালোবাসা ছাড়া বাঁচতে মন চায় না? ভালোবাসার ভালো-মন্দ ফলাফল কি? সুখের সন্ধানে সৃষ্ট এই ভালোবাসা কি কোনো অসুখ সৃষ্টি করে? নাকি ভালোবাসা নামক প্রপঞ্চটি স্বর্গীয় সুখের সন্ধান দিতে মরণ অবধি ভর করে মানুষের মনের পিঞ্জরে?
আসলে ভালোবাসা কি? ভালোবাসা একটি বেঁচে থাকার আর্তনাদ। ভালোবাসা একটি স্পর্শের অনুভূতির নাম। ভালোবাসা একটি জলমেহনায় দুজনের সুখের বিলাপ সাধন। ভালোবাসা হচ্ছে আত্মার সঙ্গে আত্মার মিলন। দুজনার মনের মিলনে সৃষ্ট এক জটিল জাল ভালোবাসা। এমন সব কথা একান্তই বানানো। ভালোবাসার কোনো প্রসিদ্ধ প্রামাণ্য সংজ্ঞা আজও পাওয়া যায়নি। তবে মানুষের হৃদপিণ্ডে জন্ম নিয়েছে ভালোবাসার নানা সজ্ঞায়ন। যেমন ১) মনের গভীরে আবেগের সমান ব্যসার্ধ নিয়ে অঙ্কিত বৃত্তে যে সুখের বসত তাকে ভালোবাসা বলে। ২) অনুভবে হৃদয় স্পর্শ করার নামই ভালোবাসা। ৩) মনের সুখের খোঁজে একজনকে স্পর্শ, পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাস করাতে পারাই হচ্ছে ভালোবাসা। তবে সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, মানুষের মন ও জৈবিক চাহিদার সংমিশ্রণে অন্যকারো প্রতি জন্ম নেয়া নানারূপ অনুভূতির মানসিক চাপই হচ্ছে ভালোবাসা।
এটি কি নিছক কোনো অনুভূতি, নাকি বৈজ্ঞানিক কোনো ব্যাখ্যা আছে ভালোবাসার? বিজ্ঞান বলছে, মানুষের দেহের অভ্যন্তরে অনেকগুলো হরমোনের প্রভাবে জন্ম হয় ভালোবাসা। টেস্টোরন, প্রজেস্টেজন, ডোপামিন, এডরোনালিন, সেরোটোনিন, অক্সিটোসিন নামক হরমোনের প্রভাবেই গতিশীল হয় মানুষের ভালোবাসা।
মানব মানবীর প্রেমের রয়েছে নানা রূপ। প্রতিবেশী, পরিচিতা, স্কুল কলেজের জুনিয়র মেয়েটি, কর্মক্ষেত্রে কলিগ বা সহপাঠীর প্রতি আকর্ষণ- বন্ধুত্বপূর্ণ মেলামেশা তারপর প্রেম। সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে ভালোবাসার টানে কেউ কেউ অন্য দেশে বিয়ে করতে চলে আসছে। রাজার মেয়েকে কোটাল পুত্রের ভালোবাসার সেই প্রাচীন গল্পের মতোই ধনী-গরিবে আজও সৃষ্টি হচ্ছে হাজারো ভালোবাসা। রাধা-কৃষ্ণের মতই কালো ফর্সা বর্ণের যুগল জুটিতে সৃষ্টি হয় প্রেম। ভিন্ন ধর্মের অনুসারী নারী-পুরুষের মধ্যেও গড়ে ওঠে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও প্রেম। আবার সবকিছু জেনে শুনেই যৌন পল্লির পতিতাকে ভালোবেসে সংসার বাধে কোনো এক প্রেমিক পুরুষ।
প্রেম আপাত দৃষ্টিতে সুখকর বিষয় হিসেবে গণ্য হলেও নানা কারণে মানব মনে প্রেমের উদ্ভব ঘটে। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি লালসা বা যৌন আকর্ষণ ভালোবাসা সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ। সুন্দরের প্রতি আকর্ষণ মানুষের জীবনে ভালোবাসার সূত্রপাত ঘটায়। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিল ভালোবাসার কারণে পরিণত হয়। আবার নানা কারণে সৃষ্ট ফ্রাস্টেশন থেকেও উদ্ভব ঘটে প্রেম ভালোবাসার। অধিক বিষণ্ণতা থেকে সৃষ্ট আবেগ মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়। একাকীত্ব ও পরিবারের স্নেহহীনতা মানুষের জীবনে প্রেমের চাহিদা বাড়ায়। আবার কখনো বা অভাবের তাড়না থেকেও ভালোবাসার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। বিপদগ্রস্ত কোনো মানুষের জীবনে উপকারী ব্যক্তিটি ভালোবাসার পাত্রে পরিণত হয়। প্রত্যাশার তুলনা কম প্রাপ্তির ফলে নব সুখের খোঁজ ভালোবাসার সন্ধান দেয়।
প্রেমের আছে অনুকূল প্রতিকূল প্রতিক্রিয়া। প্রেমের জোরে দুজনেই বসত করে দুজনের মনের অন্তরালে। এই প্রেম মানুষকে সাহসী থেকে দুঃসাহসী করে তোলে। ইদানীংকালে প্রেমের কারণে ধর্ম বদল, অন্য ভূখণ্ডের কারো সাথে প্রেম করে দেশ ত্যাগ, বয়সের বাধা অতক্রম, প্রেমিকের হাত ধরে গৃহ ত্যাগসহ আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে। প্রাথমিক বা মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী পর্যন্ত আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নিচ্ছে প্রেমে ব্যর্থতার ফলে। কখনো বা ভালোবাসা সৃষ্টি করে প্রতিহিংসা আর তা থেকে ঘটে চলছে নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা। এসিড নিক্ষেপের মতো ঘটনাও ঘটেছে শুধু প্রেমের কারণে।
ভালোবাসা পবিত্র, তবে নানা কারণে বর্তমানে তা হচ্ছে বিশ্বাস বিচ্ছিন্ন ও কলুষিত। ব্রেকাপ শব্দটি এখন সর্বসাধারণের পরিচিত। বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাবে অশ্লীলতার বিস্তার, পার্কে ছেলে মেয়েদের অবাধ শারীরিক মেলামেশা, ভালোবাসা নামক শব্দটাকে অপবিত্র করে তুলছে প্রতিনিয়ত। বিদেশি সিরিয়াল কৌশলে যৌনতা শেখাচ্ছে শিশু কিশোরদের। অতি আধুনিক আর্ট ফিল্ম বহুবিধ প্রেমের দৃশ্য আমাদের দেশের টিনেজারদের প্রেম করতে লালায়িত করে তুলছে প্রতিদিন। যার ফলে বর্তমান সমাজের অধিকাংশ ভালোবাসা হয়ে যাচ্ছে যৌনতা কেন্দ্রিক। এ ছাড়াও অসামাজিত যোগাযোগ মাধ্যমে পার করা সময়গুলো মধুময় করে তুলতে অশ্লীলতায় জড়িয়ে যাচ্ছে তরুণরা। সব মিলেয়ে ভালোবাসা হয়ে যাচ্ছে ভার্চুয়াল এক বিনোদনের উপাদান মাত্র।
ভালোবাসার শুরুটা যেমনি হোক সেটি বিয়ে, সংসার, সন্তান উৎপাদনে রূপ নিলে ভালোবাসায় পূর্ণতা আসে। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই ভালোবাসার নামে প্রেমিক প্রেমিকার এই সম্পর্কটাকে পবিত্র রাখার লক্ষে আমাদের নৈতিক শিক্ষার উন্নয়ন সাধন খুব জরুরি হয়ে পরেছে। তাছাড়া আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারের এ ব্যাপারে উদ্যোগি হওয়া দরকার। কারো কাছে ভালোবাসা যেন নিশ্চুপ ব্যাধিতে পরিণত না হয়। ভালোবাসা হোক মানুষের মনে আবেগের স্থাপনা। হাসি কান্নায় দুজনের প্রতি দুজনের সাপোর্ট হয়ে ভালোবাসা বেঁচে থাকুক মানব মনের গহীনে। প্রতিটি যুগলের ভালোবাসা সৃষ্টি করুক মনের বেলাভূমিতে স্নিগ্ধ স্বচ্ছ গোধূলি। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি ভালোবাসাকে বলা হয় স্বর্গীয় যৌনতা। কলুষিত না হোক এমন স্বর্গীয় যৌনতা।





Post a Comment