তরুণীর প্রাণ কেড়ে নিলেন জাদুকর পি সি সরকার, কী হলো শেষে?

 


ODD বাংলা ডেস্ক: জাদুসম্রাট পি. সি. সরকার। সারা বিশ্বের কাছে সুপরিচিত একটি নাম। পি. সি. সরকার জাদুবিদ্যায় কল্পনা, উদ্ভাবনীর ক্ষমতা, প্রদর্শনভঙ্গি, পরিবেশনের মুর্ছনা, জাঁক-জমকপূর্ণ পোশাক, থিয়েটারের কায়দায় দৃশ্যপট, স্বদেশি কায়দায় বাজনাসহ অভিনয়ে দক্ষ সুন্দর-সুন্দরী সহকারী-সহকারিনীর সঙ্গে আল্ট্রাভায়োলেট আলোর ব্যবহার করতেন। তিনিই প্রথম এসবের প্রবর্তক।

ভারতীয় ভাবধারায় সর্বোপরি মহারাজার চোখ ধাঁধানো পোশাক, ঘড়ি ধরা সময়ানুবর্তিতা সবমিলিয়ে পি. সি. সরকার আর জাদুবিদ্যা সমার্থক হয়ে গেছে। তিনি ছিলেন শিল্পীর শিল্পী। তার খেলার বিন্যাসে সম্পূর্ণ ভারতীয় মেজাজের রুচিশীল চিন্তা-ভাবনার প্রমাণ করে। পি. সি. সরকার যেন নিজেই একটা জাদুবিদ্যার বিশ্ববিদ্যালয়। তার কাছ থেকে সারা বিশ্ব অনেক কিছুই পেয়েছে। অবহেলিত এক কৃষ্টির অগ্রদূতকে চিনল পৃথিবীর মানুষ। জাদুসম্রাট পি. সি.সরকারের ছিল ব্যক্তিত্বপূর্ণ, সৌম্য, শান্ত চেহারা, অতিসুন্দর বাচনভঙ্গি, আর মানুষ হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত সহজ, সরল আর অনাড়ম্বর। সারা বিশ্ব ঘুরেছেন, তাতে মনের পরিধি বেড়েছে। নানা ধরণের মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছেন এবং নানা রকম অভিজ্ঞতার সঞ্চয় করেছেন। তিনি সফল হতে পেরেছিলেন। নিত্যনতুন ইন্দ্রজালের মায়াস্পর্শে তিনি ছিলেন চিরমুখর। জাদু কথাটাকে তিনি প্রবাদে পরিণত করেছিলেন।


পি. সি.সরকারের আসল নাম প্রতুল চন্দ্র সরকার। জন্ম অবিভক্ত বাংলার টাঙ্গাইল জেলার আশোকপুর গ্রামে, ১৯১৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। গ্রামে মাদারিদের জাদু দেখে প্রথম আকর্ষিত হন ম্যাজিকে। তবে প্রথম ম্যাজিক দীক্ষাগুরু ছিলেন তার এক মামা, দীনেশ চন্দ্র নন্দী। নিজের মামা না হলেও তিনি খুব ভালবাসতেন ভাগ্নেকে। তাস, রুমাল, কয়েন ইত্যাদি দিয়ে খুব ভাল ক্লোজ-আপ ম্যাজিক দেখাতেন তিনি। ভাগ্নের বায়নার জেরে কিছু খেলা বানিয়েও দিয়েছিলেন তাকে। তবে এখানেই শেষ নয়। তারপর বিস্তর পড়াশোনা, নিজের গবেষণা এবং বুদ্ধিমত্তার জোরেই পৃথিবীর জাদুকরদের শ্রেষ্ঠ আসনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন পি. সি. সরকার। তার জীবনের অনেক ঘটনাই অবাক করে। পরিচয় দেয় তার শ্রেষ্ঠত্বের।


১৯৫৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ব্রিটেনে গেছেন ম্যাজিক দেখাতে। বিবিসি (ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন) লন্ডন থেকে ১৫ মিনিট অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ পেলেন। এর আগে কোনোদিন বিবিসিতে তিনি খেলা দেখাননি। বৈদ্যুতিক করাত দিয়ে তরুণীকে দ্বিখণ্ডিত করার খেলাটা দেখাবেন বলে ঠিক করলেন। তার জন্য প্রথমে তিনি রিহার্সাল দিয়ে নিলেন যাতে ১৫ মিনিটের মধ্যেই খেলাটা শেষ করতে পারেন। লাইভ টেলিকাস্ট। ভুল হয়ে গেলেই বিপদ। শুধরানোর কোনো উপায় নেই। ভুল মানে ভুল। অর্থাৎ ক্যামেরার সামনে সঠিক সময়সীমার মধ্যে তরুণীটিকে কাটা এবং জোড়া দেওয়া শেষ করতে হবে।


তারিখটা ছিল ৯ এপ্রিল, ১৯৫৬। বিবিসির লাইম গ্রোভ স্টুডিয়োয় ক্যামেরাম্যান-ডিরেক্টর কয়েকবার সময়-বিষয়গুলো দেখে নিলেন। তারপর শুরু হয়ে গেল টেলিকাস্ট। খেলাটা ধীরে ধীরে দেখাতে লাগলেন তিনি। তরুণীকে কাটা হয়ে গেল বৈদ্যুতিক করাত দিয়ে। জোড়া লাগানোর সময় জাদুকরের আন্তরিক চেষ্টাতেও তরুণী বেঁচে উঠলেন না। তখন প্রচণ্ড উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হল। জাদুসম্রাট পি. সি. সরকারের নাটকীয়তা এবং পরিবেশন যেন জন্মগত প্রতিভা। তিনি তার চোখে-মুখে এমন হাবভাব ফোটালেন যেন বিরাট দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। তরুণী আর প্রাণ ফিরে পেল না। সময় শেষ। এবার নতুন টেলিকাস্ট শুরু হয়ে গেল।


অনুষ্ঠানের প্রযোজক ভীষণ চটে গেলেন জাদুসম্রাটের ওপর। জাদুসম্রাটও এমন ভাব দেখালেন যেন খুবই অপরাধ করে ফেলেছেন। কিছুক্ষণ বাদে আসল নাটক শুরু হল গোটা লন্ডন শহর এবং শহরতলি জুড়ে। এক পাকা জাদু শিল্পী খেলা দেখাতে গিয়ে প্রাণ কেড়ে নিলেন সহকারিণীর! হুমড়ি খেয়ে পড়লেন সাংবাদিকরা ব্রডকাস্টিং সেন্টারে। জনগণের ঘনঘন টেলিফোন। সংবাদপত্রের অফিসে ফোন এল এত বেশি যে লন্ডন শহরে দুঘণ্টার জন্য টেলিফোন লাইন অচল হয়ে গিয়েছিল।


পরের দিন ১৯৫৬ সালে ১০ এপ্রিল তারিখে লন্ডনের সমস্ত খবরের কাগজে বড় বড় করে প্রথম পাতায় বের হলো ‘চিন্তা করবেন না মেয়েটা সুস্থ আছে। পুরোটাই জাদুসম্রাট পি. সি.সরকারের জাদুর চালাকি।’ জাদুর ইতিহাসে এমন প্রচণ্ডরকমের প্রচার করতে এর আগে কেউ কখনও পারেনি।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.