যেভাবে তৈরি হয়েছে বিশ্বসেরা এই ভবন
ODD বাংলা ডেস্ক:স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরীর পরিবেশবান্ধব ব্যতিক্রমী নকশায় সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত অঞ্চলে নির্মিত 'ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল' জিতে নিয়েছে বিশ্বসেরা নতুন ভবনের খেতাব। ২০২১ সালের রিবা আন্তর্জাতিক পুরস্কারে বিজয়ী হয়েছে হাসপাতাল ভবনটি। ফ্রেন্ডশিপ এনজিও'র সহায়তায় নির্মিত এই হাসপাতালটি বাংলাদেশের দুর্যোগপ্রবণ দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। উপকূলীয় এই অঞ্চলটি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সরাসরি প্রভাবগ্রস্ত।
ওডিল ডেক, এস ডেভলিন, জিন গ্যাং, রোসানা হু এবং গুস্তাভো উট্রাবোর সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক জুরি বোর্ড হাসপাতালটিকে রিবা আন্তর্জাতিক স্থাপত্য পুরস্কারে ভূষিত করেছেন। জুরি বোর্ডের প্রধান ওডিল ডেক হাসপাতাল ভবনটির পরিবেশবান্ধবতা ও মানবিক দিকের প্রশংসা করে বলেছেন, "তুলনামূলকভাবে পরিমিত বাজেট ও কঠিন সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ভালো ডিজাইনের মাধ্যমে কত সুন্দর স্থাপত্য তৈরি করা যায় তার নিদর্শন এটি।"
যে জায়গায় এখন হাসপাতালটি দাঁড়িয়ে আছে, তা একসময় ছিল শস্যক্ষেত। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের জলের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় জায়গাটি এখন পরিণত হয়েছে চিংড়ির ঘেরে। আর সেই আঁকাবাঁকা খালের কোলঘেঁষেই নির্মিত হয়েছে হাসপাতাল কমপ্লেক্সটি। হাসপাতালের ইনডোর ও আউটডোরের জন্য রয়েছে দুটি আলাদা জায়গা। দুটি জায়গার নিরাপত্তা ব্যবস্থাও দুই রকম। এ কারণে পুরো ভবনকে দুটি ভাগে আলাদা করতে হয়েছে। তবে, জায়গা স্বল্পতার কারণে ভবনের ভেতর দিয়ে প্রাচীর দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানান স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরী। ১০ ফুট চওড়া একটি জলাধারের মাধ্যমে ইনডোর এবং আউটডোরকে আলাদা করা হয়েছে।
কাশেফ চৌধুরী বলেন, "হাসপাতাল নির্মাণের বিভিন্ন দিক মাথায় রেখেই ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, বৃষ্টির জল ধারণ করা, খুব তাড়াতাড়ি বৃষ্টির জল সরিয়ে নেওয়ার মতো পরিবেশবান্ধব খুব ছোট ছোট বিষয় ধরে ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কাজটি করা হয়।"
গ্রীষ্মকালের প্রচণ্ড গরম থেকে বাঁচতে ভবনের ভেতরের জলাধারে বৃষ্টির জল ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও ভবনের প্রতিটি ছাদে ও উঠানে বৃষ্টির জল ধরে রাখারও ব্যবস্থা রয়েছে। দেশের উপকূলীয় দক্ষিণাঞ্চলে বিশুদ্ধ খাবার জলের সংকট থাকায় বর্ষাকালে স্থানীয়রা বিশুদ্ধ জল সংরক্ষণের যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। আর এ কারণেই কাশেফ চৌধুরী ভবনটির নকশা এমনভাবে করেছেন যেন বৃষ্টির জল ধরে রাখা যায়। জমে থাকা এই জল সংরক্ষণের জন্য ভবনের উভয় পাশে রয়েছে দুটি স্টোরেজ ট্যাঙ্ক।
আরবানার এই স্থপতি হাসপাতালটি নির্মাণে ব্যবহার করেছেন স্থানীয় ইট। এতে কমে এসেছে নির্মাণ খরচ। এছাড়া, বিভিন্ন আকৃতির ইটের মাধ্যমে ভবনের দেওয়ালগুলোকে নানান রকম ডিজাইন দেওয়া হয়েছে। ফলে দেওয়াল ভেদ করেও স্থাপনাটির ভেতরে পর্যাপ্ত আলো বাতাস চলাচল করতে পারে।
জুরি বোর্ড প্রধান ও স্থপতি ওডিল ডেক ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালটিকে 'মানুষের জন্যে নির্মিত একটি ভবন' হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, "কাশেফ চৌধুরী/আরবানা ভবনটিকে এমন নকশা দিয়েছেন, যা এর চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মানানসই। হাসপাতালটি জটিল বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো যেমন- জলবায়ু পরিবর্তন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইত্যাদির কথা মাথায় রেখে নির্মাণ করা হয়েছে।"
রিবা'র সভাপতি সাইমন অলফোর্ড বলেছেন, "ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাশীল ও সৃজনশীল নকশার নমুনা। পরিমিত বাজেটে নির্মিত এই হাসপাতালটি স্থানীয় সম্প্রদায় এবং এর প্রাকৃতিক পরিবেশের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কাশেফ চৌধুরী/আরবানা উদ্ভাবনী, পরিচ্ছন্ন, পরিমার্জিত, স্বল্পব্যয়ী এবং নান্দনিক এক স্থাপত্য তৈরি করেছে, যা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অবস্থার ক্রমবর্ধমান প্রভাবও মোকাবেলা করবে। আমি আনন্দিত যে হাসপাতালটি রিবা আন্তর্জাতিক পুরস্কার ২০২১-এ বিজয়ী হয়েছে।"
২০১৪ সালে শুরু হয়েছিল হাসপাতালটির নির্মাণ কাজ। এর চার বছর পর ২০১৮ সালে হাসপাতালটি চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ২ একর জমির ওপর ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ এই হাসপাতালটি সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি ওই অঞ্চলের বিশুদ্ধ জলের ঘাটতি পূরণেও ভূমিকা রাখছে।
কাশেফ চৌধুরী বলেন, "সবারই ধারণা থাকে হাসপাতাল একটি যন্ত্রের মত। একদিক দিয়ে রোগী ঢুকবে, তাদের চিকিৎসা হতে থাকবে, আর অন্যদিকে বর্জ্য বেরিয়ে যাবে ইত্যাদি। কিন্তু আমরা সেখানে আটকে থাকিনি, আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, আলো বাতাস কীভাবে থাকবে, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ কীভাবে থাকবে এসব দিকে খেয়াল রাখার পাশাপাশি রোগীদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিক বিবেচনায় সুন্দর একটি জায়গা দেওয়ার চিন্তা করেছি।"
২০টি ভবনের সমন্বয়ে ৪৭ হাজার ৭৭২ বর্গফুট জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই স্থাপনা। স্থানীয় প্রযুক্তি ও নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে নির্মিত হাসপাতালে আউটডোর ও ইনডোর চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে অডিটরিয়াম, কনভেনশন সেন্টার, ক্যানটিন ও প্রার্থনাকক্ষ।
আন্তর্জাতিক রিবা পুরস্কার ঘোষণার পর কাশেফ চৌধুরী নিজের অনুভূতি সম্পর্কে বলেন, "পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ সব পুরস্কারের মধ্যে এই পুরস্কার অন্যতম। এরকম একটি অর্জনে খুব ভালো লাগছে। একক প্রকল্পের জন্য যদি এই পুরস্কার হয়ে থাকে তবে এটি বড় একটি পুরস্কার। আমি অভিভূত। তবে যেসব কারণে এ পুরস্কারটি দেওয়া হচ্ছে তা নিয়ে আমি আরও বেশি আনন্দিত। আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয় মাথায় রেখেই কাজটি করেছিলাম। আমাদের চিন্তা-ভাবনার স্বীকৃতিই তারা দিয়েছেন।"
আরবানার ক্লায়েন্ট ফ্রেন্ডশিপ এনজিও ও এর প্রতিষ্ঠাতা রুনা খানের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন কাশেফ চৌধুরী। সেইসঙ্গে এই প্রকল্পে জড়িত অন্যান্য স্থপতি, প্রকৌশলী ও পরামর্শদাতাদের তাদের সমর্থন, সহায়তার ও পাশে থাকার জন্যও ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি।
ফ্রেন্ডশিপের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক রুনা খান জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত সম্প্রদায়ের জন্য ২০ বছরের কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
তিনি বলেন, "কাশেফের সঙ্গে কাজ করা আমাদের জন্য আনন্দের ছিল। তিনি দক্ষতার সাথে স্থানীয় নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার করেছেন এবং গুণগতমানের সঙ্গে কোনো আপস ছাড়াই কাজের দক্ষতাও নিশ্চিত করেছেন। আমরা এভাবেই ফ্রেন্ডশিপের চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছি।"
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে প্রভাবিত এলাকাগুলোর একটি সাতক্ষীরার শ্যামনগর। ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল এই অঞ্চলের মানুষগুলোর জন্য আগামী দিনগুলোতে নতুন আশা নিয়ে আসবে বলে মন্তব্য করেন রুনা খান।





Post a Comment