সেলফি আসক্তরা ‘সেলফাইটিস’ রোগে আক্রান্ত!
ODD বাংলা ডেস্ক: সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে রাতে ঘুমানোর আগ অব্দি ঠিক কয়টি সেলফি তোলেন আপনার স্মার্টফোনে? বিছানা ছেড়ে উঠেই নিজের দিকে ক্যামেরা তাক করে একটা ক্লিক না করলে অনেকেরই হয়তো দিনটি ভালো যায় না। ‘মর্নিং সেলফি’ শব্দটির অর্থ যাই হোক তরুণ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় এক ট্রেন্ডের নাম সেলফি। স্মার্টফোন বা ট্যাবের সাহায্যে নিজের ছবি নিজেই তোলা। মুখ, চোখের নানা ভঙ্গিতে ছবি তুলে নিজের অভিব্যক্তি সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে বন্ধুদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া। এ যেন এক মাদকতা। শুধু কমবয়সীরাই নয়, সেলফির হাওয়া লেগেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, পোপ ফ্রান্সিস থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর গায়েও। সেলফিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে গান এবং সিনেমা। সব বয়সের মানুষই যেন ভুগছেন সেলফি-জ্বরে, কেউ জেনে কেউ বা না জেনে।
প্রায় সবাই আজকাল অন্তত একজনকে চিনি যে এই সেলফির নেশায় আক্রান্ত। তারা পারলে তাদের দিনের প্রতিটি মূহূর্তে নিজেদের প্রতিটি এক্সপ্রেশন ক্যামেরাবন্দি করে রাখে। এরা এদের সব ছবিতেই একটা রীতিমত আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অভ্যেস করা অভিব্যক্তি দেয়। ফোনটা পকেট থেকে বার করা মাত্র এরা ওই প্র্যাক্টিস করা এক্সপ্রেশন নিয়ে রেডি। অনেকে আবার অন্যের দেখাদেখি শুধু ট্রেন্ডে গাঁ ভাসানোর জন্য সেলফি তোলেন। ফেসবুক, টুইটার তো আছেই। তবে এখন সেলফি শেয়ার করার সবচেয়ে জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে ইনস্টাগ্রাম। প্রতিদিন হাজার হাজার ছবি সেলফি হ্যাশট্যাগ দিয়ে এখানে পোস্ট করা হয়। স্ন্যাপচ্যাট, ডাবস্ম্যাশ, টিন্ডার জাতীয় অ্যাপের জনপ্রিয়তাও এখন তুঙ্গে।
কিছুদিন আগে একটি পপুলার প্যারডি ওয়েবসাইট একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন পেশ করে। ওয়েবসাইটটি দাবি করে, মার্কিন সাইকায়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন (এপিএ) সেলফিকে একটি মেন্টাল ডিজঅর্ডার বা মানসিক ভারসাম্যহীনতা বলে ঘোষণা করেছে। এই ‘রোগের’ নাম দেয়া হয়েছে সেলফাইটিস এটি নিজের ছবি তোলার এবং শেয়ার করার একটি অবসেসিভ-কম্পালসিভ আসক্তি, যার দ্বারা মানুষ নিজের আত্মমর্যাদাবোধকে বাড়াতে চায় এবং সত্যিকারের রক্তমাংসের মানুষের সঙ্গে প্রকৃত যোগাযোগ বা ঘনিষ্ঠতার অভাবকে পূরণ করতে চায়। ওই রিপোর্ট অনুযায়ী, সেলফাইটিস মূলত তিনটি শ্রেনীর বর্ডারলাইন, অ্যাকিউট এবং ক্রনিক।
চিন্তায় পড়ে গেলেন? খবরটি সম্পূর্ণ ভুয়া বলে পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়। এমনকি এপিএ থেকে সরকারি ভাবে জানিয়ে দেয়া হয়, সংস্থাটি এইরকম কোনো ঘোষণা করেনি। কিন্তু ততক্ষণে একটু দেরি হয়ে গিয়েছে। সোশাল মিডিয়ার কল্যাণে খবরটি প্রকাশ হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ভাইরাল হয়ে যায়। প্রচুর মানুষ এটিকে সত্যি ভেবে ফেসবুকে শেয়ার করেন, টুইট-রিটুইট করেন। এই হুলুস্থুল থেকে একটা ধারণা তৈরি হয় অনেকেই যেমন সেলফির প্রেমে পড়েছেন, তেমনই নিজের ছবি তোলার এই উন্মাদনাকে অনেকেই হয়তো ভাল চোখে দেখেননা। তারা সত্যিই হয়তো মনে করেন সেলফি নিয়ে বাড়াবাড়িটা বন্ধ হওয়া উচিত এবং কিছু সেলফিমেনিয়াকের ডাক্তার দেখানো প্রয়োজন।
যদিও সেলফাইটিস এখনো মেন্টাল ডিজঅর্ডার হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি, অতিরিক্ত সেলফি তোলার যে কিছু অপকারিতা আছে, সেটাও চিকিত্সকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। সাইকায়াট্রিস্টের মতে, এই সমস্যাটিকে এক ধরনের ইমপাল্স-কন্ট্রোল প্রবলেম বা অ্যাডিকশন বলা ভাল। যদি কেউ তার যাবতীয় কাজকর্ম, সামাজিক বা পেশাগত দায়দায়িত্ব এবং পারস্পরিক সম্পর্কগুলোকে অবহেলা করে ঘন্টার পর ঘন্টা শুধু সেলফি তুলেই কাটিয়ে দেয় তাহলে সেই ব্যক্তিকে সেলফি অ্যাডিক্ট বলা যেতে পারে। এক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা যায় মানুষ চাইলেও উক্ত নেশার কবল থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারছেনা। প্রথম দিকে এটা করে সাময়িকভাবে মানসিক শান্তি পাওয়া গেলেও বারবার একই কাজ করতে করতে একটা নির্ভরতা বা আসক্তি তৈরি হয়ে যায়, স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাহত হয়। অন্যান্য নেশার ক্ষেত্রেও একই জিনিস প্রযোজ্য।
আমরা সবাই চাই ভার্চুয়াল দুনিয়ায় অজস্র সেলফির মাঝে নিজের ছবিটি যেন সেরা হয়! কারণ আমরা নজরে, চর্চায় থাকতে চাই। আর লাইক আর কমেন্টের পিছনে ছুটতে গিয়ে আমরা মাঝে মাঝে নিজেদের বিপদে ফেলতেও পিছপা হই না। তাই জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মূহূর্তে নিজের ছবি তুলে রাখতে খুব ইচ্ছা করে, তাতে দোষ নেই। কিন্তু কোনো কিছুই অতিরিক্ত হলে নানা সমস্যা দেখা দেয়। ছবি তুলুন, কিন্তু অবস্থা বুঝে, পরিবেশ বুঝে। সেলফি তুললেই সব সময় সোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করবেন না, অচেনা কারোর সঙ্গে তো নয়ই। ওই ইচ্ছেটাকে মাঝে মাঝে একটু নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন, সেলফিটা আপলোড না করলে কি আপনার আত্মপরিচয়ে কোন হানি ঘটবে? পারস্পরিক সম্পর্কের উপর জোর দিন, আশেপাশের সমাজের সঙ্গে প্রকৃত যোগ বাড়ান। জীবনের স্মরণীয় মূহূর্তগুলো নিজের মত করে বাঁচুন, ভার্চুয়াল দুনিয়ার কারোর অনুমোদন বা বক্তব্যের তোয়াক্কা না করে। মনকে অন্য দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য বই পড়ুন, সিনেমা দেখুন, গান শুনুন।





Post a Comment