বাহারি ঢঙের পানের থালায় লেখা হতো সাহসীদের নাম

 


ODD বাংলা ডেস্ক:  অতিথি আপ্যায়ন, পূজা পার্বণ, শুভকাজ সবক্ষেত্রে পান ও সুপারি ব্যবহারের চল এখনও রয়ে গেছে। তবে, এক সময় বাঙালির ঘরে ঘরে থাকা সুন্দর বা বাহারি ঢঙের পানের থালাগুলো আজ আর নেই। কোথায় হারিয়ে গেল বাহারি ঢংয়ের সেই পানের থালাগুলো?

বর্তমানে পান খাওয়ার রেওয়াজ ও চাহিদা কিছুটা কমেছে। তবে গত ২০ বছর আগেও এ দেশে নেশা বা রসনাতৃপ্তির ক্ষেত্রে পান ছিল অপরিহার্য উপাদান। এমনকি পান আর সুপারি নাকি বংশবৃদ্ধির জন্যও ব্যবহার করা হতো। ঠোঁট রাঙাতে তখন ভরসা ছিল পানের রস। গেরস্থের অন্দরমহলে দুপুরে চুল এলিয়ে গায়ে রোদ লাগাতে লাগাতে নারীদের গল্পকথার সঙ্গী হতো পানের বাটা।


পান রাখা ও খাওয়ার পদ্ধতির মধ্যে বৈচিত্র্য দেখা যেত সারা দেশজুড়ে। পান যেখানে রাখা হয় তাকে বলা হয় ‘ডাবর’ এবং পান যাতে করে পরিবেশন করা হয় তাকে বলে ‘বাটা’। ডাবর শব্দটির অর্থ দভ্র বা সাগর, যেখানে পান ধুয়ে লাল সালু কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়, যাতে শুকিয়ে না যায়। সাধারণত পেতল অথবা রুপো দিয়ে তৈরি হয় পানের বাটা। তবে এদের আকার আকৃতি বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন হতো। ভারতে যে পানের বাটাগুলো দেখা যেত সাধারণত সেগুলো গোল স্ফীত। আবার পানের বাটার আকৃতি পাহাড়ের চূড়ার মতোও হতো। ভারতের উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, লখনউ, বেনারসে পানের পাত্রকে বাটা বলা হয় না; বলা হয় পানের কৌটো।


অসময়ে পান খাওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয় কাঁচা সুপারি। এছাড়া পানের সঙ্গে দরকার হয় নানা রকম সুগন্ধি দ্রব্য ও মশলা। এতে নাকি পান রংদার- মজাদার হয়। মানুষ চাইতেন পান হবে গন্ধে ভরপুর। তাকে অলঙ্করণ করা হবে নানা ধরনের মনোহারি দিয়ে। এই মশলা থেকে নির্গত রস জিভের মধ্যে ঘোরাফেরা করবে। সেই রস মুখে নিয়ে কথা বললে কথার আমেজ হবে আলতো আর সেই কথার মধ্য থাকবে সুগন্ধও।


এক কথায় বলতে গেলে পান হচ্ছে পুরনো দিনের ‘মাউথ ফ্রেশনার’। পান খেলে, পানের রস ঠোঁটের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়লে, তাকে আভিজাত্যের লক্ষণ বলা হতো।


তবে পানের বাটায় মশলা রাখা হয় না। মসলা রাখার জন্য বাটার পাশাপাশি ব্যবহার করা হতো আরো কিছু পাত্র। পানের বাটায় কাটা হতো নানা নকশা। পিতল হোক বা রূপো, সমাজের বিভিন্ন ঘটনার পরিপেক্ষিতে বাটায় আঁকা হতো নানা ছবি।


ঘরের মেয়ে বউরা পানের খিলি করতে করতে হাপুস নয়নে দুপুর কাটাতেন। মনের আড়ালে হয়ত জেগে থাকত নিজের ঘরের পুরুষটির দীর্ঘদিনের দীর্ঘ অনুপস্থিতি। ঠাকুমা-দিদিমারা বিপ্লবীদের নাম লিখে রাখতেন পানের বাটায়। তারা বিশ্বাস করতেন পানের বাটায় দেশের সাহসীদের নাম থাকলে ঘরের সন্তান হবে সাহসী।


প্রজন্মের পরিবর্তনে এসব দৃশ্য এখন অদৃশ্য হয়েছে। শুধু আজও বেশ কিছু বাড়িতে স্মৃতি হয়ে আছে পূর্বপুরুষদের ব্যবহৃত আকর্ষণীয় পানের ডাবর, বাটা আর রকমারি মশলার বাহারি কৌটোগুলো।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.