বিজয় দিবস: বাঙালি আজও ঐক্যবদ্ধ, সেদিন বাংলাদেশের জন্যই পশ্চিমবঙ্গে জরুরি অবস্থা জারি হয়েছিল
Odd বাংলা ডেস্ক: ৭ মে পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভায় বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের জন্য কেন্দ্রের প্রতি আহবান জানিয়ে একটি সর্বসন্মত প্রস্তাব গৃহীত হয়। একই দিন নয়াদিল্লীতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনার জন্য এক বৈঠকে বসেছিলেন। দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার এতদসংক্রান্ত সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘এখনই ভারতের স্বীকৃতি বাংলাদেশে স্বার্থের অনুকূল হবে না/ তবে মুক্তি আন্দোলনকে পূর্ণ সমর্থন দেয়া হবে-প্রধানমন্ত্রী।’ নয়াদিল্লী থেকে বিশেষ সংবাদদাতা প্রেরিত এই সংবাদে বলা হয়, ‘আজ সকালে বিরোধী নেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বৈঠকে বসেছিলেন। সভায় সকলেই বাংলাদেশ সরকারকে বিলম্বে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানান। ব্যতিক্রমঃ বিকানীরের মহারাজা ড. করণি সিং এবং মুসলিম লীগ নেতা মহম্মদ ইসমাইল। (দু’জনের বক্তব্যে অবশ্য কিছু পার্থক্য ছিল।) সকলের কথা শোনার পর প্রধানমন্ত্রী যা বলেন তার মর্ম এই রকম ঃ বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনের প্রতি, ভারত পূর্ণ সমর্থন জানাবে কিন্তু বাংলাদেশকে কখনই কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেয়া ওই দেশের স্বার্থের পরিপন্থী হবে। সারা বিশ্বে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি প্রচুর সহানুভূতি থাকলেও স্বীকৃতির ব্যাপারে ভাবনা-চিন্তা চলছে। তবে তাজউদ্দিন সরকারকে স্বীকৃতি দেয়া হবে না এমন কথা তিনি বলেননি বা সরকার এ ব্যাপারে ঠিক কি করবেন তার কোন আভাস দেননি। শুধু স্পষ্টভাবে তিনি বলেন যে, কোন অবস্থাতেই ভারত ভীত নয়। ইন্দিরাজী বলেন যে, পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে নানা উস্কানিমূলক কাজ করছে। ভারতকে নানাভাবে বাংলাদেশের ব্যাপারে জড়াতে চাইছে। যাই হোক, ভারত যা ঠিক মনে কবে তা করতে ভীত নয়। দুই ব্যতিক্রম। অবিলম্বে বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের দাবির বিরোধীতা করেন বিকানীরের মহারাজা ড. করণি সিং। তিনি লোকসভার কয়েকটি ছোট গোষ্ঠী ও কয়েকজন নির্দল সদস্যের নেতা। সেই গোষ্ঠী ও ব্যক্তিরা আগেই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানিয়েছেন।
ড. করণি সিং-এর বক্তব্য ঃ বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলন আসলে বাঙালীদের বিদ্রোহ। ভারতে এ ধরনের ব্যাপার ঘটলে সরকার কী করতেন? কাশ্মীরের কথাও ভাবা দরকার। ইন্দিরাজি তাঁকে বলেনঃ কাশ্মীরে যারা হাঙ্গামা বাধাতে চায় তারা জনসাধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামীদের পিছনে বিপুল গরিষ্ঠ সমর্থন রয়েছে। বাংলাদেশে গরিষ্ঠ অভিমত পাকিস্তান দাবিয়ে রাখতে চাইছে।
মুসলিম লীগ নেতা মহম্মদ ইসমাইল যা বলেন তার মর্ম ঃ এমন কিছু করা ঠিক হবে না যাতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে বা কোন সঙ্কট সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলে ওই ধরনের সঙ্কট দেখা দিতে পারে। তবে সরকার এ ব্যাপারে যে কোন ব্যবস্থাই নিন না কেন তার প্রতি তাঁদের দলের সমর্থন থাকবে। ইন্দিরাজী বলেন যে, বাংলাদেশের ব্যাপারকে কেন্দ্র করে কিছু লোক সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে চাইছে। সকলকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
স্বীকৃতির স্বপক্ষে জোর দাবিঃ অধিকাংশ বিরোধী নেতা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের জন্য জোর দাবি জানান। পরিস্থিতি সম্পর্কে ইন্দিরাজীর বিশ্লেষণ তাঁরা মেনে নেননি। তাঁরা বলেন যে, বাংলাদেশ এখন একটি বাস্তব সত্য। স্বীকৃতি দিয়ে সরকার শুধু সেই সত্যটিকেই মেনে নেবেন আর তাতে সেখানকার আন্দোলন জোরদার হবে। ভারত এ বিষয়ে দেরি করলে ভারতেরই ক্ষতি হতে পারে। এই দাবী জানান-সিপিএম, সিপিআই, ডিএমকে, জনসংঘ, আদি কংগ্রেস, পিএসসি, এসএসপি, ফঃ-বঃ আর এসপি। শ্রী ইন্দজিৎ গুপ্ত (সিপিআই) তাঁর দলের পশ্চিমবঙ্গ কমিটির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে একটি স্মারকলিপি দেন। শ্রী এ কে গোপালন (সিপিএম) বলেন যে, পাকিস্তানকে ভয় না করে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সব রকমের সাহায্য দেয়া হোক। শ্রী কে মনোহর (ডিএমকে), শ্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী (জঃ সঃ), শ্রীচিত্ত বসু, (ফঃ বঃ) শ্রী ত্রিদিব চৌধুরী (আর এসপি), শ্রী এন জি গোরো (পিএসপি) ও শ্রী এল এন মিশ্র (আদি কং) একই দাবি তোলেন।’
বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের জন্য ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরাও ইন্দিরা গান্ধীর ওপর ক্রমশ চাপ বৃদ্ধি করেছিলেন। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছিল বাংলাদেশ থেকে শরণার্থী আগমন। জুলাইয়ের শেষে দিকে শরণার্থীর সংখ্যা ষাট লক্ষ অতিক্রম করে, যার শতকরা সত্তর ভাগই ছিল পশ্চিমবঙ্গে। শরণার্থীদের প্রচন্ড চাপে তীব্র আর্থিক সঙ্কটের পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা ও যোগাযোগ পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে কেন্দ্রের ওপর উপর্যুপরি চাপ দেয়া হচ্ছিল শরনার্থীদের বোঝা বিভিন্ন রাজ্যের ভেতর ভাগ করে দেয়ার জন্য। সমস্যা বাধল শরণার্থীরা। তারা পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চাইল না। পশ্চিমবঙ্গের অজয় মুখার্জীর মন্ত্রিসভাকে প্রধানত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং শরণার্থীদের চাপে রাজ্যের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হওয়ায় পদত্যাগ করতে হয়। ২৫ জুন থেকে পশ্চিমবঙ্গের রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করা হয়। কেন্দ্রের দফতরবিহীন মন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়কে পশ্চিমবঙ্গের গভর্ণরের উপদেষ্টা বানিয়ে পাঠানো হয় মূলত বাংলাদেশের বিষয়ে তদারকীর জন্য।
জুলাইয়ের শেষের দিকে বিশ্বের রাজনীতিতে এক নাটকীয় ঘটনা ঘটল, যা ভারতের জন্য ছিল খুবই উদ্বেগজনক। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায়, কিসিঞ্জারের দূতিয়ালিতে আমেরিকার সঙ্গে চীনের বরফ শীতল সম্পর্কের অবসান ঘটল। এই ঐতিহাসিক ঘটনায় মধ্যস্থতার সুযোগ পেয়ে পাকিস্তান দুই বৃহৎ শক্তির প্রিয়পাত্রে পরিণত হল। ভারতের ওপর আরও চাপ সৃষ্টির জন্য নতুন শক্তিতে বলীয়ান পাকিস্তানী সামরিক জান্তা ২ আগষ্ট ১৯৭১ ঘোষণা করল ‘রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগ কারাগারে আটক শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার করবে তারা।’ ভারতের সর্বস্তরের জনসাধারণ ইয়াহিয়া সরকারের এই ন্যাক্কারজনক ঘোষণার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল। দিল্লী, কলকাতা, বম্বে প্রভৃতি বড় বড় শহরে শেখ মুজিবের বিচারের উদ্যোগের প্রতিবাদ জানিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ও সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিবাদ সভা ও বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করেছিল। ইন্দিরা গান্ধী সুস্পষ্ট ভাষায় পাকিস্তানকে জানিয়ে দিলেন- শেখ মুজিবের বিচারের আয়োজন করা হলে এর পরিণতি ভাল হবে না। তিনি এই বিচার প্রহসন বন্ধ করার জন্য বিভিন্ন সরকার ও রাষ্ট্র প্রধানকে চিঠি লিখেন।





Post a Comment