পিঠে লোহার শলাকা ফোটানো দেখে ইংরেজ সাহেবের স্ত্রী মূর্ছা গেলেন, বন্ধ হল চড়ক
Odd বাংলা ডেস্ক: চৈত্র মাস শুরু হলেই একটা সময় কলকাতার অলিতে গলিতে শোনা যেত সন্ন্যাসীদের আওয়াজ: 'বাবা তারকানাথের চরণে সেবা লাগে'। হাতে মাটির সরা নিয়ে শিবের নামে ভিক্ষা করত মানুষগুলো। গ্রীষ্মের প্রখর তাপ দূর হয়ে ধরাতল শীতল হোক বারিধারায়- এই কামনা থেকে যে দেবতার ভজনা করা হয় তিনি হলেন মহাদেব বা রুদ্রদেব। তারই এই রূপ বাংলার লৌকিক কৃষি দেবতা।
এখনও চড়ক হয় চৈত্রসংক্রান্তির বিকেলে সন্ন্যাসীর চড়ক গাছে ঘোরা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে এখনও মানুষ ভিড় জমান। চত্বরের চারপাশ ঘিরে বাজারের একতলা ঘরগুলোর ছাদে তখন মিডিয়ার ভিড়। মুভি ক্যামেরা থেকে স্টিল ক্যামেরা। ছবি উঠতে থাকে নিরন্তর। সার্কাসের ট্রাপিজের খেলা যাঁরা দেখান তাঁরা রীতিমত বিষয়টিতে তালিম নেন। নৈপুণ্য আনতে বছরভর অনুশীলন করে ভুল-ত্রুটি শুধরে নেন। কিন্তু শিবের পুজো করে একমাসের সন্ন্যাস জীবন কাটানোর পর আচমকাই এমন এক ভয়ানক আকাশপাক নেহাত মুখের কথা নয়। তবে এই সবই এখন চড়কের আধুনীকিকরণ। আর এবার তো সেটাও হবে না। করোনার কারণে জমায়েত বন্ধ।
গাজনের উৎপত্তি
মনে করা হয় সন্ন্যাসীদের গর্জন কথাটি থেকে গাজন শব্দটি এসেছে। এই গাজন কিন্তু মোট তিন রকম হয়। আমাদের পশ্চিমবঙ্গে শিবের গাজন হয় ঠিকই কিন্তু পূর্ববঙ্গে হয় নীলের গাজন ও আরেকরকম গাজনও হয় সেটা ধর্মরাজের গাজন।
কলকাতার চড়ক কথা
চৈত্র মাসের পয়লা থেকেই একটা সময় শুরু হয়ে যেত কলকাতার শৈব উৎসব। ধুলোমাখা, গাঁজাখোর, জটাধারী সব সন্ন্যাসী হাজির হত এই শহরের বুকে। এখন সেই উৎসব মুখোর কলকাতা আর নেই। বাগবাজার, এন্টালি, কালীঘাট, চিৎপুরে বসত চড়কের বিরাট মেলা। সেকালে কলকাতার সবচেয়ে বড়ো মানে ষোলো চড়কির চড়ক হত বাগবাজারে। চড়ক গাছের গায়ে ওপর ওপর চারটে বাঁশের মাচান বেঁধে সর্বোচ্চ মাচানের মাঝখানে একজনকে মহাদেব সাজিয়ে বসানো হত। আর প্রত্যেক মাচানের কোণে একজন করে মোট ১৬ জন লোকের পিঠে লোহার বর্শি ফুটিয়ে তাদের ঘোরানো হত। সেটা দেখতে কত দূরদূরান্ত পাড়া-গাঁ থেকে মানুষ আসতো।
ইংরেজ আমলে চড়ক নিষিদ্ধ করা হল
আসলে ইংরেজরা এই দৈহিক কষ্টের উৎসবকে খুব একটা ইতিবাচক ভঙ্গিতে মেনে নিতে পারেনি। চড়ক একটি লোকায়ত সংস্কৃতি এবং চড়কের যে গান তাতে অনেক সময় খিস্তি খেওরও করা হয়। চড়ক নিয়ে কলকাতায় যে উন্মাদনা ছিল তাতে প্রথম ধাক্কা আসে সঙের অশ্লীল শোভাযাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা। এরপর ১৮৬৩ সালে সরকারআইন করে শরীরে বর্শি ফোটানো বন্ধ করে দেয়। ফলে ভাটা পড়ে যায় কলকাতার চড়ক উৎসবে।
শোনা যায় কোনও একটি ইংরেজ সাহেব খিদিরপুর থেকে ছাতুবাবুর বাজারের চড়ক দেখতে গিয়েছিলেন। সঙ্গে তাঁর স্ত্রীও ছিল। ব্যাস যখন একদুজনের পিঠে শলাকা ফোটানো হল সেই দেখে ইংরেজ সাহেবের স্ত্রী অজ্ঞান হয়ে গেলেন। খবর গেল সেসময়ের ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে । ব্যাস বন্ধ করে দেওয়া হল চড়ক মেলা।
বর্তমানের চড়ক
ইদানিংকালে কলকাতার ছাতুবাবুর বাজারে, হাওড়ার বাইনানে ও হুগলীর তারকেশ্বরে সবচেয়ে বড় চড়ক মেলা হয়। তারকেশ্বরে গাজন উৎসব অনুষ্ঠিত হয় চৈত্র মাসের শেষ চারদিন ধরে। হাওড়ার বাইনানে এখনও চড়ক উৎসবে কিছু কিছু ভক্ত লোহার শলাকা দিয়ে মাচান থেকে ঝুলে থাকে। চড়ক উৎস মূলত আত্মপীড়নের উৎসব। যারা চড়কের ব্রত করে তাদের চড়কিয়া বলা হয়। এবং মূখ্য অংশগ্রহণকারী যে পিঠে বর্শি ফোটায় তাকে দেওবৈংশী বলা হয়। তবে এর সঙ্গে কলকাতার বাবুমহলের সম্পর্ক কোনও দিনও ছিল না। এটা মূলত হাঁড়ি, কাসারি, তেলি, ডোম প্রভৃতি নিম্ন বর্ণের হিন্দুরাই পালন করে।






Post a Comment