সাহাবজাদে ইরফান আলি খানের ছোট পর্দা থেকে হলিউড যাত্রা, রইল তাঁর অভিনয় জীবনের কোলাজ



Odd বাংলা ডেস্ক: সাহাবজাদে ইরফান আলি খান, যিনি সকলের কাছে ইরফান খান নামেই পরিচিত। বলিউড চলচ্চিত্র জগত তো বটেই পাশাপাশি ব্রিটিশ সিনেমা এবং হলিউডেও কাজ করেছেন এই দাপুটে অভিনেতা। ইরফানের জন্ম হয় রাজস্থানের জয়পুরে এক মুসলিম নবাব পরিবারে। মাস্টার ডিগ্রি পড়তে পড়তেই ১৯৮৪ সালে ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা-এ পড়াশোনার জন্য স্কলারশিপ পেয়েছিলেন। এরপর সেখান থেকেই শুরু হয় অভিনয় শিক্ষা। 

সেখানে পড়াশুনো শেষ করে ইরফান খান চলে আসেন মুম্বই শহরে। এরপর ছোট পর্দায় একাধিক কাজ করেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুরদর্শনের 'চাণক্য', 'সারা জাহান হামারা', 'বনেগি আপনি বাত', 'চন্দ্রকান্ত' এবং স্টার প্লাসে স্টার বেস্ট সেলার এবং স্পর্শ। স্টার প্লাসে সম্প্রচারিত 'ডর' ধারাবাহিকে তিনি প্রধান খল নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। কে কে মেননের বিরুদ্ধে তিনি একজন সিরিয়াল কিলারের চরিত্রে অভিনয় করে যথেষ্ট প্রশংসিত হয়েছিলেন। স্টার-প্লাসে সম্প্রচারিত স্টার বেস্টসেলারস-এর বেশ কয়েকটি পর্বে অভিনয় করেছিলেন। একটি পর্বে, তিনি একজন দোকানদারের ভুমিকায় অভিনয় করেছিলেন যার ভ্রান্ত ধারণা ছিল যে তার বাড়িওয়ালার স্ত্রী তাঁর চরিত্র হননের চেষ্টা করছেন এবং আদতে দেখা যায় যে তাঁর নিজের স্ত্রীই (টিসকা চোপড়া) তাঁকে প্রতারণা করছেন। এরপরেও একের পর এক ধারাবাহিকে অভিনয় করে নজির গড়েছিলেন ইরফান। 

থিয়েটার-ধারাবাহিক নিয়ে চলছিল বেশ, কিন্তু এমন সময় মীরা নায়ার তাঁকে সালাম বম্বে ছবিতে একটি ক্যামিও রোলের অফার দেন। সালটা ১৯৮৮। যদিও চূড়ান্ত সম্পাদনার পর তাঁর অংশটুকু কেটে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। এরপর তিনি 'এক ডক্টর কি মওত' এবং 'সাচ অ্যা লং জার্নি' ছবিতে অভিনয় করলেও সেই অর্থে তিনি নজর কাড়তে পারেননি। এইভাবে পর পর ব্যর্থতা পর একদিন আচমকাই সবকিছু বদলে গেল যখন লন্ডন ভিত্তিক পরিচালক আসিফ কাপাডিয়া তাঁকে 'দ্য ওয়ারিয়র' ছবিতে তাঁকে লিড রোলে কাস্ট করেন। এরপর ২০০১ সালে 'দ্য ওয়ারিয়র' আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ঝড় তুলেছিল। এরপর ইরফান খান সারা বিশ্বের কাছে একটি পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।

২০০৩ সালে, তিনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত লেখক-পরিচালক, আশ্বিন কুমারের শর্ট ফিল্ম, 'রোড টু লাদাখ'-এ অভিনয় করেছিলেন। ফিল্মটি আন্তর্জাতিক উৎসবগুলিতে এতটাই হইচই ফেলে দিয়েছিল ফিল্মটি পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ফিচার ফিল্ম হিসাবে তৈরি করা হলে সেখানেও অভিনয় করেন ইরফান খান। একই বছর তিনি 'মকবুল' ছবিতে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করে চলচ্চিত্র সমালোচকদের মন জিতে নেন।

এরপর ২০০৫ সালে তিনি বলিউডে প্রথম ডেব্যিউ করেন 'রোগ' ছবির হাত ধরে। এরপরে তিনি বেশ কয়েকটি ছবিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বা খলনায়ক হিসাবে সহায়ক রোলেও অভিনয় করেছিলেন। ২০০৪ সালে, তিনি 'হাসিল' ছবিতে অভিনয়ের জন্য ফিল্মফেয়ার সেরা খলনায়কের পুরস্কার পেয়েছিলেন।

২০০৭ সালে, তিনি বক্স অফিসে হিট ছবি 'মেট্রো'-তে অভিনয় করেন, যার জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার সেরা সহকারী অভিনেতার পুরষ্কার পান। এরপর 'দ্য নেমসেক', যা আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেছিল।

বলিউডে চূড়ান্ত সাফল্য লাভের পরেও তিনি কিন্তু টেলিভিশনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিন্ন করেননি। তিনি স্টার ওয়ান প্রচারিত 'মানো ইয়া না মনো' এবং 'কেয়া কাহেন' নামে দুটি শো-এর সঞ্চালনা করতেন। এরপর ২০০৮ সালে তিনি 'স্লামডগ মিলিয়নিয়ার' ছবিতে একজন পুলিশ ইন্সপেক্টরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, যার জন্য তিনি অসাধারণ অভিনয়ের জন্য 'স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ড পুরস্কার' পেয়েছিলেন। এরপর পান সিং তোমর, দ্য লাঞ্চবক্স, হায়দার, গুন্ডে, পিকু এবং তলওয়ার, মাদারি এবং হিন্দি মিডিয়াম ছবির জন্য প্রশংসিত হন ইরফান। জুরাসিক ওয়ার্ল্ডে তাঁর অভিনয় দাগ কেটে গিয়েছিল দর্শকদের মনে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

মীরা নায়ার পরিচালিত ইংরেজি চলচ্চিত্র 'দ্য নামসেকে'-এর মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। সেখানে তিনি একজন প্রবাসী বাঙালি অধ্যাপকের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। আর এই ছবির হাত ধরে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেন তিনি। এই সিনেমার পরে তিনি বিদেশের মাটিতে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা এবং সম্মান অর্জন করেছিলেন। 

ব্যক্তিগত জীবন

তাঁর ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামার স্নাতক-লেখক সুতপা শিকদারের সঙ্গে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন ইরফান খান। তাঁদের একটি পুত্র সন্তানও আছে। ২০১৮ সালে সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে যায় যখন জানা যায় তাঁর শরীরে বাসা বেঁধেছে মারণ ক্যান্সার। নিউরোএন্ডোক্রাইন টিউমারের চিকিৎসা করতে বিদেশেও যান তিনি। খানিকটা সুস্থ হয়ে ফিরে তাঁর শেষ ছবি 'আংরেজি মিডিয়াম' ছবির কাজ শেষও করেন তিনি। অবশ্য কখনও কেউ জানতো না এটাই শেষ..... অবশেষে মঙ্গলবার তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে জানা যায় তাঁর কোলনে সংক্রমণ হয়েছে। ২৯ এপ্রিল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। 
Blogger দ্বারা পরিচালিত.