মনের মানুষকে সঙ্গী করতে এক লাফে টপকাতে হবে ৬ ফুট পাথর

Odd বাংলা ডেস্ক: সাবালক বলতে কী বুঝি আমরা? একজন মানুষের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হয়ে গেলেই সে সাবালক হয়ে যায়। অবশ্য কোনো কোনো দেশ আছে যেখানে ২১ বছর বয়স হলে তবে সাবালকত্ব স্বীকার করা হয়। আর এই আইন অনুযায়ী কেউ সাবালক হলেই সে মোটামুটি বিয়ে করতে পারে। যদিও ভারতে পুরুষদের বয়স ২১ বছর হলে তবেই তারা আইনত বিয়ে করতে পারে।  

তবে যদি আপনাকে বলা হয়, এসব বয়স কোনো ব্যাপার নয়। পরীক্ষার মাধ্যমে আপনার সাবালকত্বের প্রমাণ হবে। তাহলে আপনি কী করবেন? ধরুন আপনাকে বলা হল একটা নির্দিষ্ট পরীক্ষা হবে। আর এই পরীক্ষায় পাশ করতে পারলে তবেই তাকে সাবালক বলে ধরা হবে। সাবালক হলে তবেই সে বিয়ে করতে পারবে।

আপনার কেমন লাগবে? চমকে গেলেন তো? ঠিক এই ঘটনাটাই প্রতিবছর ঘটে আসছে ইন্দোনেশিয়ার এক দ্বীপে। সেখানকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে এটা সুপ্রাচীন কাল থেকে চলে আসা এক রীতি। সবচেয়ে মজার বিষয় হল এই আদিবাসী গোষ্ঠী তাদের এই চিরাচরিত ঐতিহ্য পরিবর্তন করতে চায় না!

ইন্দোনেশিয়ার অন্তর্গত এই দ্বীপে বসবাস করে নিয়াস নামে এক আদিবাসী জনগোষ্ঠী। এই জনগোষ্ঠীর নাম অনুসারে দ্বীপটির নামও নিয়াস ৷ অনেক গবেষক দাবি করেন প্রায় ৭০০ বছর আগে থেকে এই দ্বীপে আদিবাসী গোষ্ঠীটি বসবাস করছে। আবার অনেকের মতে যিশু খ্রিস্টের জন্মের আগে থেকেই নিয়াস আদিবাসীদের বসবাস গড়ে উঠেছে এই অঞ্চলে।

তবে বেশিরভাগ গবেষকের মতেই ৭০০ বছর আগে এই দ্বীপটি একবার ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। যদিও কিছুদিনের মধ্যেই নিয়াসরা দ্বীপটিকে পুনর্গঠন করে এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করে। নিয়াসদের অনেক রকম ঐতিহ্যমণ্ডিত রীতিনীতির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ হল ' ফাহোমবো ' উৎসব। এটাই সেই উৎসব বা রীতি যেখানে পুরুষদের সাবালকত্বের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। 

উল্টো ভাবে বলা যায়, নিয়াস আদিবাসী গোষ্ঠীর অন্তর্গত পুরুষদের সাবালক হয়ে ওঠার পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত উৎসব হল ফাহোমবো উৎসব। ফাহোমবো উৎসবে এই আদিবাসী গোষ্ঠীর অবিবাহিত এবং কম বয়সি পুরুষরা একটি উঁচু পাথর এক লাফে টপকে গিয়ে নিজেদের সাবালকত্বের প্রমান দেয়। অর্থাৎ যারা এই পাথর একলাফে টপকে যেতে সফল হয় তারাই কেবলমাত্র সাবালক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

সাবালক নিয়াস পুরুষদের সঙ্গে ওই আদিবাসী গোষ্ঠীর মেয়ের বাবারা নিজের মেয়ের বিয়ে দেয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। নিয়াস সমাজে প্রেম স্বীকৃত হলেও প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে বিয়ে হওয়ার আগে প্রেমিককে ফাহোমবো উৎসবের প্রতিযোগিতায় নিজের সাবালকত্বের প্রমাণ দিতে হয়। আর যদি প্রতিযোগিতায় উতরোতে না পারে তবে প্রেম থাকা সত্ত্বেও তাদের বিয়ে করার অনুমতি দেয়া হয় না। 


তবে একজন নিয়াস পুরুষ যতক্ষণ পর্যন্ত না সাবালকত্বের পরীক্ষায় পাস করতে পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রতিবছর ফাহোমবো উৎসবে সে প্রতিযোগী হিসেবে অংশগ্রহণ করতে পারে। নিয়াস বাবা-মায়েরা অনেক ছোটবেলায় থেকে তাদের পুত্র সন্তানদের এই পাথর টপকানোর জন্য প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করে। নিয়াসদের মধ্যে উৎসবের পাথর। টপকানো প্রতিযোগিতার প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য বেশকিছু প্রশিক্ষক আছেন।

অনেক পরিবার তার পুত্র সন্তানদের সেই প্রশিক্ষকের কাছে প্রশিক্ষণ নিতে পাঠায়। যখন প্রশিক্ষক বা পরিবারের প্রধান মনে করেন যে তাদের ছেলেটি প্রতিযোগিতায় নামার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত, তখনই তাদের এই প্রতিযোগীতায় নামতে দেয়া হয়।  সাধারণত ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সী নিয়াস পুরুষরা খুব সহজেই এই প্রতিযোগিতায় জয় লাভ করে সাবালকত্বের প্রমাণ দিতে সক্ষম হয় ।

এই প্রতিযোগিতার জন্য প্রায় দুই মিটার উঁচু পাথরের একটি স্তম্ভ গড়ে তোলে নিয়াসরা। পরিস্থিতি ভেদে এই স্তম্ভের উচ্চতা কম বেশি হতে পারে। তবে তা কখনোই ১.৮ মিটারের কম বা ২.২ মিটারের বেশি হয় না। এই পাথরের স্তম্ভটির আগে যেখানে চাপ দিয়ে একজন পুরুষ লাফিয়ে পাথরটি টপকায়, সেখানে একটি ছোটখাট পাথর রাখা থাকে। নিয়াস পুরুষরা ছোট পাথরের ওপর ভর দিয়ে মূল পাথরের স্তম্ভটি টপকে চলে যায়।

কোনো প্রতিযোগী যাতে আঘাত প্রাপ্ত না হয়, সেখানে মাটিতে ল্যান্ড করে অর্থাৎ লাফ দিয়ে মাটিতে পড়ার জায়গাটি বালি দিয়ে ভর্তি করে রাখা থাকে। তবে কোনো প্রতিযোগী যদি পাথরের স্তম্ভ টপকাতে ব্যর্থ হয় সে ক্ষেত্রে ওই উঁচু পাথরেই ধাক্কা খেয়ে সে স্বাভাবিকভাবেই আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে পড়তে পারে। যদিও এই রকম ঘটনা খুবই কম ঘটে। এই লাফ দেয়ার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল যেকোনো ভাবে লাফ দিলে চলে না। 

ঢাল তরোয়াল হাতে নিয়ে একজন যোদ্ধা প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার সময় ঠিক যেভাবে লাভ দেয়, এক্ষেত্রে লাফ দেয়ার সময় দেহের ভঙ্গি তেমনই হতে হয়। ফাহোমবো উৎসবকে কেন্দ্র করে সব নিয়াসরা আনন্দে মেতে ওঠে। এই আদিবাসী গোষ্ঠীর কম বয়সী নারীরাও সুন্দর সাজে সেজে লাফ দেয়ার প্রতিযোগিতা দেখতে আসে। তাহলে আপনি কি ভাবছেন? এরকম কোনো প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে নিজের শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষা দেবেন নাকি?

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.