বাঙালিরা কোনটা বলবে হোলি নাকি দোলযাত্রা?
Odd বাংলা ডেস্ক: হিন্দুধর্ম ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও উৎসবের আনন্দে মানবতার বাণীকেই ধারণ করে আছে যুগ যুগ ধরে। বারো মাসে তেরো পার্বণের ন্যায় হিন্দুধর্মে লেগে আছে ঋতুভিত্তিক উৎসব। এই সকল উৎসব ধর্মের গণ্ডী অতিক্রম করে সর্বমানবীয়, উদার দার্শনিক তত্ত্বে ঋদ্ধ। প্রাচীন ঋষিরা তাই হিন্দু ধর্মকে ক্ষুদ্র গণ্ডীতে আবদ্ধ করেনি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ানোর ইতিহাস হিন্দু ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে ওতপ্রোত জড়িত। হোলিও তেমনি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির উত্থানের ইতিহাস।
দোলযাত্রার ইতিহাস
দোলযাত্রাকে মনে করা হয় এটি রাধা এবং কৃষ্ণের দিন , এই দিন কৃষ্ণ তার রাধার প্রতি ভালোবাসা নিবেদন করেন। এই দিনটি শ্রী কৃষ্ণের জন্য উৎসর্গীকৃত। এটি বাঙালি ক্যালেন্ডার এর শেষ উৎসব ও। দোলযাত্রার সময় সাধারণত পূর্ণিমার দিন দেখেই নির্ধারিত হয় বলে এটি দোলপূর্ণিমা বলেও জানা যায়। এই দিন বাঙালির ঘরে ঘরে চলে লক্ষ্মী ও নারায়ণ পুজো অৰ্থাৎ রাধা কৃষ্ণ এর পুজো ।এছাড়া বিভিন্ন জায়গায় , শ্রী ক্রিসের পালকি সাজিয়ে চলে পথযাত্রা , ফুল আর আবিরের দোল খেলা। সাথে থাকে শ্রী কৃষ্ণের গান ও পালা । এটিকে বাঙালিদের মধ্যে “বসন্ত উৎসব” ও বলা হয়ে থাকে।বসন্ত উৎসব টি নোবেল বিজয়ী কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার শান্তিনিকেতনে শুরু করেছিলেন , যেখানে আজ একই উৎসাহে এই উৎসব পালন করা হয়। বোলপুর , শান্তিনিকেতন , আজ বিখ্যাত তার বসন্ত উৎসবের জন্য। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন ঠিক এই সময় এ শান্তিনিকেতন এ দোলউৎসব বা বসন্ত উৎসব মানাতে।
দোলের ইতিহাস
দোল পূর্ণিমা বাঙালিদের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ , কারণ এটিই চৈতন্য মহাপ্রভু (1485-1533) এর জন্মদিন। তিনি ছিলেন মহান বৈষ্ণব সন্ন্যাসী । তিনি রাধা ও কৃষ্ণের আবেগকে -প্রেম কে উচ্চ আধ্যাত্মিক করে তুলেছিলেন।
দৈত্যরাজ হিরণ্যকিশপুর কাহিনি আমরা সকলে জানি। ভক্ত প্রহ্লাদ অসুর বংশে জন্ম নিয়েও পরম ধার্মিক ছিলেন। তাঁকে যখন বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও হত্যা করা যাচ্ছিল না তখন হিরণ্যকিশপুর বোন হোলিকা প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুনে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ হোলিকা এই বর পেয়েছিল যে আগুনে তার কোন ক্ষতি হবে না। কিন্তু অন্যায় কাজে শক্তি প্রয়োগ করায় হোলিকা প্রহ্লাদকে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করলে প্রহ্লাদের কোনো ক্ষতি হয় না কিন্তু হোলিকা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বিষ্ণু ভক্ত প্রহ্লাদের এই অক্ষতের আনন্দ উৎসবে পরিণত হয়। এই দহনকে হোলিকা দহন বলা হয়।
অন্যদিক বসন্তের পূর্ণিমার এই দিনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কেশি নামক অসুরকে বধ করেন। কোথাও কোথাও অরিষ্টাসুর নামক অসুর বধের কথাও আছে। অন্যায়কারী, অত্যাচারী এই অসুরকে বধ করার পর তার রক্ত ছিটিয়ে সকলে আনন্দ করে। এই অন্যায় শক্তিকে ধ্বংসের আনন্দ মহানন্দে পরিণত হয়।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে হোলির রীতি ও বিশ্বাস বিভিন্ন। বাংলা অঞ্চলে বৈষ্ণব প্রাধান্য রীতি প্রচলিত। রঙ উৎসবের আগের দিন ‘হোলিকা দহন’ হয় অত্যন্ত ধুমধাম করে। শুকনো গাছের ডাল, কাঠ ইত্যাদি দাহ্যবস্তু অনেক আগে থেকে সংগ্রহ করে সু-উচ্চ একতা থাম বানিয়ে তাতে অগ্নি সংযোগ করে ‘হোলিকা দহন’ হয়। পরের দিন রঙ খেলা। বাংলাতেও দোলের আগের দিন এইরকম হয় যদিও তার ব্যাপকতা কম, একে আমরা বলি ‘চাঁচর’। এই চাঁচরেরও অন্যরকম ব্যাখ্যা আছে। দোল আমাদের ঋতুচক্রের শেষ উৎসব। পাতাঝরার সময়, বৈশাখের প্রতীক্ষা। এই সময় পড়ে থাকা গাছের শুকনো পাতা, তার ডালপালা একত্রিত করে জ্বালিয়ে দেওয়ার মধ্যে এক সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে। পুরনো জঞ্জাল, রুক্ষতা, শুষ্কতা সরিয়ে নতুনের আহ্বান হচ্ছে এই হোলি। বাংলায় দোলের আগের দিন ‘চাঁচর’ উদ্যাপনকে এভাবেই ব্যাখ্যা করা হয়।
হোলি যেভাবে হল
হোলি ভারতের সবচেয়ে শ্রদ্ধাশীল ও উদযাপিত উৎসব হিসেবে বিবেচিত এবং এটি দেশের প্রায় প্রতিটি অংশে পালিত হয়। এটি কখনও কখনও “প্রেমের উৎসব ” হিসাবেও পরিচিত হয়, যেমনটি এই দিনে লোকেরা একে অপরের দিকে সমস্ত ক্ষোভ এবং সমস্ত ধরনের খারাপ অনুভূতি ভুলে একত্রিত হয়। মহান ভারতীয় উৎসব একটি দিন ও রাতের জন্য স্থায়ী হয়, যা ফাল্গুন মাসে পূর্ণিমা বা পূর্ণ চাঁদ দিবসে শুরু হয়। উৎসবের প্রথম সন্ধ্যায় হোলিকা দহান বা চটি হলি নামে এটি উদযাপন করা হয় এবং পরবর্তী দিনটিকে হলি বলা হয়। দেশের বিভিন্ন অংশে এটি বিভিন্ন নামে পরিচিত।
হোলি উৎসবের আগের দিন সন্ধ্যেতে শুরু হয় হোলিকা দহন। যেখানে মানুষ একত্রিত হয়ে অগ্নিকুণ্ড-র চারিপাশে পূজা করে ও প্রার্থনা করেন নিজের ভেতরের অশুভ শক্তি থেকে মুক্তির জন্য, ঠিক যে ভাবে ,হোলিকা , হিরণ্যকিশিপুর বোন,অগ্নিকুন্ডে নিজের জীবন ত্যাগ করেন। তার নাম অনুসারে , এই অনুষ্ঠানের বা আয়োজনের নাম “হোলিকা দহন ” .হিন্দু ধর্ম অনুসারে , হোলি উৎসব হোলিকা নামক এক অশুভ শক্তিকে বিনাশের এক উৎসব , যেখানে ভগবান বিষ্ণু , প্রল্হাদ কে বাঁচাতে হোলিকাকে বধ করেন। এই উৎসবের মধ্যে দিয়ে শুভ শক্তির জয় ও অশুভ শক্তির হার , মনে করা হয়। তাই ভক্তরা অগ্নিকুন্ডের এক একটি কাঠ প্রদান করেন , প্রসাদ বিতরণ হয় ও হোলিকা দহন এর পর নাচ-গানের অনুষ্ঠানও হয়।
কথিত আছে , হোলিকা কে ব্রম্ভা এক বর প্রদান করেন , যা সে কখনো কারোর ক্ষতি না করে ব্যবহার করতে পারে ,সেটি ছিল , সে আগুনের মধ্যে গেলেও তার কোনো ক্ষতি হবে না। হিরণ্যকশাইপ বলে এক রাজা তাঁর রাজ্যে কেবল তাঁরই উপাসনা চেয়েছিলেন, কিন্তু তার পুত্র প্রল্হাদ, ভগবান বিষ্ণু অর্থাৎ নারায়ণনের ভক্ত ছিলেন। সেই কারণে তিনি নিজের পুত্রকে অনেক বার মেরে ফেলার চেষ্টা করেও সফল হননি। তখন তিনি নিজের বোন হোলিকা কে আদেশ দেন প্রল্হাদ কে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করতে। হোলিকা ভেবেছিলো , তার বর আছে যেহেতু তার কোনো ক্ষতি হবে না , কিন্তু সে এ জানতো না , তার এই বর শুধু মাত্র তখনি কাজ করবে যখন সে এক আগুনে প্রবেশ করবে। তার কাছে ব্রম্ভা প্রদত্ত একটি শাল ছিল, যেটা পরিধান করলে তাকে কোনো কিছুই ক্ষতি করতে পারবে না। কিন্তু ,আগুনে প্রবেশের সাথে সাথেই প্রল্হাদ, ভগবান বিষ্ণুর প্রার্থনা শুরু করেন , এবং ভগবান বিষ্ণু প্রল্হাদকে বাঁচিয়ে নেন এবং হোলিকা আগুনে ভস্ম হয়ে যান।
হোলি হিন্দু ধর্মে এক মাহাত্মপূর্ণ উৎসব , যে উৎসব কে শ্রী কৃষ্ণর মহিমা ও বলা হয়ে থাকে। যা ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে উদ্ভূত, প্রধানত ভারত ও নেপালের মধ্যে উদযাপন করা হয়, তবে এটি এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে এবং পশ্চিম বিশ্বের বিভিন্ন অংশেও আজ ছড়িয়ে পড়েছে ।এটিকে প্রেমের উৎসব বা রঙের উৎসব ও বলা হয়ে থাকে। এই দিন সবাই সব দুঃখ বলে , ক্লেশ ভুলে , রঙের খেলায় মেতে ওঠেন। মানুষেরা নিজের বন্ধু -আত্মীয় দেড় বাড়িতে যান , আনন্দে মেতে ওঠেন। তারপর হোলি খাবার, কিছু প্রথাগত পানীয় পান করেন ।
অঞ্চল ভেদে হোলি বা দোল উদ্যাপনের ভিন্ন ব্যাখ্যা কিংবা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত লোককথার ভিন্নতা থাকতে পারে কিন্তু উদ্যাপনের রীতি এক। ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করেন পূর্বভারতে আর্যরা এই উৎসব পালন করতেন। যুগে যুগে এর উদ্যাপন রীতি পরিবর্তিত হয়ে এসেছে। পুরাকালে বিবাহিত নারী তার পরিবারের মঙ্গল কামনায় রাকা পূর্ণিমায় রঙের উৎসব করতেন।
দোল হিন্দু সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন উৎসব। নারদ পুরাণ, ভবিষ্য পুরাণ ও ‘জৈমিনি মীমাংসা’য় রঙ উৎসবের বিবরণ পাওয়া যায়। সপ্তম শতাব্দীর এক শিলালিপিতে রাজা হর্ষবর্ধন কর্তৃক ‘হোলিকোৎসব’ পালনের উল্লেখ পাওয়া যায়। হর্ষবর্ধনের নাটক ‘রত্মাবলী’তেও হোলিকোৎসবের উল্লেখ আছে। এমনকি আল বেরুনীর বিবরণে জানা যায় মধ্যযুগে কোন কোন অঞ্চলে মুসলমানরাও হোলিকোৎসবে সংযুক্ত হত।
মধ্যযুগের বিখ্যাত চিত্রশিল্পগুলোর অন্যতম প্রধান বিষয় রাধা-কৃষ্ণের রঙ উৎসব। এই রাধা-কৃষ্ণকে কেন্দ্র করে হোলির যে অতি বৈষ্ণবীয় আচার তা অবশ্যই প্রশ্নযুক্ত। কেননা এটি শ্রীকৃষ্ণের জীবন ইতিহাসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। শ্রীকৃষ্ণ ১২ বছর বয়সে বৃন্দাবন ত্যাগ করার পর সেখানে তাঁর যাওয়াই হয়নি। অন্যদিকে বহু গবেষক রাধার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করেছেন। শ্রীকৃষ্ণের ঝুলন থেকে দোল কথার উদ্ভব।
সে যাই হোক রাধা-কৃষ্ণ তত্ত্বকে দাঁড় করিয়ে বিপরীত লিঙ্গের মাঝে অবাধ হোলি খেলা অবশ্যই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সমর্থনযোগ্য নয়। আবার বিষাক্ত রঙের ব্যবহারও উচিত নয়। এমনকি বহু জায়গায় হোলিকা দহনের নামে গাছপালা যথেচ্ছ কেটে ফেলা হয় তাও উচিত নয়। তাই হোলি নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের অসামাজিকতা পরিহার করা জরুরী।
হোলি সম্পর্কে বড়ো একটি তথ্য সকলে এড়িয়ে যায়। ধর্ম ও সমাজ ওতোপ্রোত জড়িত। আর একটি উৎসব বা দিন আরও পবিত্র হয়ে ওঠে যদি উক্ত দিনে পৃথিবী মহান পুরুষের জন্ম দেয়। বাঙালি তথা হিন্দু সমাজের অন্যতম মহাপুরুষ শ্রীচৈতন্যের জন্মতিথি হচ্ছে এই পূর্ণিমা তিথি তথা হোলি তিথি। এই মহান পুরুষের জন্ম উৎসবের মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
পৃথিবী পাপে ভারাক্রান্ত হলে ঈশ্বর সেই ভার লাঘব করেন অবতাররূপে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলের প্রাচীন জাতির কাছ থেকে এই উৎসবের জন্ম। হোলি উৎযাপনের ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, খ্রিস্ট জন্মেরও কয়েকশো বছর আগে থেকেই হোলি উদযাপিত হয়ে আসছে। এই উৎসবের নমুনা পাওয়া যায় খ্রিস্ট জন্মেরও প্রায় ৩০০ বছর আগের পাথরে খোদই করা একটি ভাস্কর্যে। এই উৎসবের উল্লেখ রয়েছে হিন্দু পবিত্র গ্রন্থ বেদ এবং পুরাণেও। ৭০০ শতকে দিকে রাজা হর্ষবর্ধনের সময়ে সংস্কৃত ভাষায় লেখা একটি প্রেমের নাটিকাতেও হোলি উৎসবের বর্ণনা রয়েছে। পরে বিভিন্ন মন্দিরের গায়ে খোদাই করা চিত্রকর্মে হোলি খেলার নমুনা বিভিন্নভাবে ফুটে ওঠে।
ইংরেজরা প্রথম দিকে এই উৎসবকে রোমান উৎসব ‘ল্যুপেরক্যালিয়া’হিসেবেই মনে করেছিল। অনেকে আবার একে গ্রীকদের উৎসব ‘ব্যাকানালিয়া’-এর সঙ্গেও তুলনা করত।
বাৎসায়নের ‘কামসূত্র’ যা রচিত হয়েছিল তৃতীয়-চতুর্থ শতকে, তাতে এই উৎসবের উল্লেখ আছে। ‘কামসূত্রে’দোলায় বসে আমোদ-প্রমোদের কথা আমরা জানতে পারি।
সপ্তম শতকে রচিত শ্রীকৃষ্ণের ‘রত্নাবলী’ এবং অষ্টম শতকের ‘মালতী-মাধব’ নাটকেও এর বর্ণনা পাওয়া যায়। জীমূতবাহনের ‘কালবিবেক’ ও ষোড়শ শতকের ‘রঘুনন্দন’ গ্রন্থেও এই উৎসবের অস্তিত্ব রয়েছে।
মূলত পুরীতে দোলোৎসব ফাল্গুন মাসে প্রবর্তনের যে রেওয়াজ হয়, সেখান থেকেই বাংলায় চলে আসে এই সমারোহ। দোলযাত্রা বা হোলি উৎসব সংক্রান্ত পৌরাণিক উপাখ্যান ও লোককথাগুলো মূলত দুই প্রকার: প্রথমটি দোলযাত্রার পূর্বদিন পালিত বহ্ন্যুৎসব হোলিকাদহন বা নেড়াপোড়া সংক্রান্ত, এবং দ্বিতীয়টি রাধা ও কৃষ্ণের দোললীলা বা ফাগুখেলা কেন্দ্রিক কাহিনি।
বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, ফাল্গুনী পূর্ণিমা বা দোলপূর্ণিমার দিন বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ আবির ও গুলাল নিয়ে রাধিকা ও অন্যান্য গোপীগণের সঙ্গে রং খেলায় মেতেছিলেন। সেই ঘটনা থেকেই দোল খেলার উৎপত্তি হয়। দোলযাত্রার দিন সকালে তাই রাধা ও কৃষ্ণের মূর্তি আবির ও গুলালে স্নাত করে দোলনায় চড়িয়ে কীর্তনগান সহকারে শোভাযাত্রা বের করা হয়। এরপর ভক্তেরা আবির ও গুলাল নিয়ে পরস্পরের সঙ্গে রং খেলেন। দোল উৎসবের অনুষঙ্গে ফাল্গুনী পূর্ণিমাকে দোলপূর্ণিমা বলা হয়। আবার এই পূর্ণিমা তিথিতেই চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম বলে একে গৌরপূর্ণিমা নামেও অভিহিত করা হয়।
ফাগুনের আগুন রঙে যখন প্রকৃতি রঙিন হয়ে ওঠে, ঠিক তখন বাঙালির মনেও লাগে রঙের ছোঁয়া। সে রং আসলে উৎসবে, আনন্দে, আবেগে মেতে ওঠার এক উপলক্ষ মাত্র। সে কাল থেকে এ কাল চলছে কলকাতার দোল-বিলাস। শুধু বদলেছে সময়টা। অতীতের দোল বিলাসের কত না কাহিনি আজ কিংবদন্তী। এক কালে কলকাতার বাবুদের বিলাসিতার আর এক নাম ছিল হোলি খেলা। প্রাচীন কালের মদনোৎসবের সঙ্গে মিল ছিল সেই দোল উৎসবের। ইতিহাসে কান পাতলে শোনা যায় দোলের বিচিত্র গল্পের কথা।
জোব চার্নক ১৬৮৬-তে কলকাতায় এসেছিলেন। কিন্তু, বেশি দিন একটানা এখানে থাকতে পারেননি। পরে, ১৬৯০-এর ঘোর বর্ষায় চার্নক যখন তৃতীয় বার এখানে এলেন, তখন কলকাতা এক গণ্ডগ্রাম। সেখানে না ছিল বাবু, না ছিল অভিজাত সমাজ। প্রাসাদোপম সেই সব বাড়িও ছিল না তখন। তাই নবাগত ইংরেজদের তখন ঠাঁই বলতে কখনও তাঁবু তো কখনও বা নৌকা। বেশ কিছু দিন থাকার পরে জীবনযাত্রায় একঘেয়েমি কাটাতে চার্নক এবং তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা চাইলেন নেটিভদের সঙ্গে মেলামেশা করতে। কিন্তু নেটিভরা সেই সময় তাঁদের পাত্তাও দিতেন না।
প্রায় ৩২৫ বছর আগে এমনই এক বসন্তে, কয়েক জন ফিরিঙ্গি ছোকরা গ্রামের ভেতরে ঘুরতে বেরিয়েছিল। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তাঁদের কানে এল গানের সুর। সেই সুর অনুসরণ করে তাঁরা এগোতে এগোতে পৌঁছলেন এক দিঘির পাড়ে। সেখানে তাঁরা যা দেখলেন, তা বিস্ময়কর!
দিঘির দক্ষিণে এবং উত্তরে দু’টি খাড়াই মঞ্চ। তার একটিতে গোবিন্দজি এবং অন্যটিতে শ্রীরাধিকার অধিষ্ঠান। দুই দেব-দেবীকে মাঝে রেখে চলছিল দোল খেলা। যাঁরা দোল খেলছিলেন তাঁদের পোশাকেও ছিল অভিনবত্ব। আবিরে চার দিক লাল। পিচকারিতে তরল রং নিয়ে চলছিল খেলা। কাতারে কাতারে লোক এসেছেন সেই উৎসবে। বসেছিল মেলাও। দিঘির উত্তর পাড়ে অর্থাৎ রাধাবাজারে, স্তূপ করে রাখা ছিল আবির। পথঘাটের সঙ্গে দিঘির জলও লাল হয়ে গিয়েছিল।
গোপিনীদের নৃত্য, উত্তেজক চটকদারি সঙ্গীত আর চারপাশের পরিবেশ সেই ইংরেজ ছোকরাদের প্ররোচিত করে তোলে। এই গোপিনীরা যে আসলে সকলেই পুরুষ তা ভাবতেও পারেননি ওই ফিরিঙ্গি ছোকরারা। প্রাচীন গ্রিসের ‘স্যাটারনালিয়া’র সঙ্গে এই রং-উৎসবের মিল খুঁজে পেয়ে তাঁরা ভেবেছিল বুঝি ‘কামোৎসব’। এর পরে তাঁরাও অংশ নিতে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। ফলে এক কাণ্ড ঘটে বসল! এটা ফিরিঙ্গিদের বেয়াদপি মনে করে নেটিভরা তাঁদের উৎসবে ঢুকতে বাধা দিলেন। শুধু তাই নয়! তাঁদের পিঠে পড়েছিল চড় থাপ্পড়। বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের একটি প্রবন্ধে ঘটনাটির উল্লেখ মেলে।
পরে ইংরেজরা এ দেশে আসার পরে ঔপনিবেশিকতার প্রভাবে যে নব্য বাবুসমাজ গড়ে উঠেছিল, হোলি উৎসব তাতে প্রাধান্য পেয়েছিল। আর যে বাবুরা ‘দিনে ঘুমিয়ে, ঘুড়ি উড়িয়ে, বুলবুলির লড়াই দেখে রাতে বারাঙ্গনা দিগের আলয়ে গীতবাদ্য ও আমোদ করিয়া কাল কাটাইত’ তাঁদের হোলি উদযাপনও বিচিত্র ধরনের ছিল। আর জীবনযাত্রায় এই সব ভোগ-বিলাসের লীলাসঙ্গিনী ছিল গণিকাকুল। ভবনীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নব বাবুবিলাস’-এ এই সব বাবুদের জীবনযাপনের উল্লেখ মেলে।
বাবু-বিলাসের নিধুবন ছিল তাঁদের সখের বাগানবাড়ি। রুপোর রেকাবিতে রাখা আতর মেশানো আবির উড়িয়ে, রুপোর পিচকারির সুগন্ধী রঙিন জল ছিটিয়ে, গেলাসে রঙিন পানীয় ঢেলে, হোলির ঠুমরি কিংবা দাদরার তালে তালে দোস্ত ইয়ারদের নিয়ে মাতাল হয়ে ওঠার আনন্দটা কেমন ছিল তা শুধু বাবুরাই জানতেন!
বাবু কালচারের হোলির বিবরণ দিতে গিয়ে কবি ঈশ্বর গুপ্ত লিখেছিলেন “ক্রমেতে হোলির খেলা, নবীনা নাগরী মেলা, ছুটে মুটে যায় এক ঠাঁই। ...যার ইচ্ছা হয় যারে, আবির কুমকুম মারে, পিচকারি কেহ দেয় কায়। উড়ায় আবীর যত, কুড়ায় লোকেতে কত, জুড়ায় দেখিলে মন তায়। ঢালিয়া গোলাপ জল, অঙ্গ করে সুশীতল, মাঝে মাঝে হয় কোলাহল।”
কলকাতার দোল প্রসঙ্গে ইতিহাসের পাতায় প্রমাণ মেলে যে, ‘সে সময়ে কোনও ব্যক্তির বেদাগ বস্ত্র থাকিত না, দলে দলে মিছিল বাহির হইতেছে, পিচ্কারি ও আবিরে পথঘাট ঘরবাড়ি লালে লাল হইয়া যাইতেছে।’ সে কাল থেকে এ কাল দোলের একটা জিনিস বদলায়নি, সেটা হল আবেগ। ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে সকলে হোলির আনন্দে মেতে উঠতেন।
বালথাজার সলভিন্স তাঁর ‘Les Hindoues’ গ্রন্থে দোলযাত্রার একটি ছবির বর্ণনায় সে কালের রং উৎসবের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, হিন্দুদের এই দোল উৎসবে খ্রিস্টান ও মুসলমানেরাও আমোদ-প্রমোদে মেতে উঠতেন। লখনউর নির্বাসিত নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ যখন মেটিয়াবুরুজে এলেন, তিনিও তাঁর মিত্র-পারিষদদের নিয়ে হোলি খেলতেন সাড়ম্বরে। এমনকী, হোলি উপলক্ষে রচনা করতেন নতুন গানও।
দোল উপলক্ষে এক কালে কলকাতার বিভিন্ন রাজবাড়িতে বসত বাঈনাচের আসর। এমনই এক আসরে ছিলেন সে কালের বিখ্যাত বাঈজি গহরজান। মেঝেতে পুরু করে আবির বিছিয়ে তার উপর কাপড় ঢেকে সেখানে হয়েছিল নাচ। নাচের শেষে আবিরের উপর থেকে কাপড় সরিয়ে দেখা গেল, সেই আবিরের উপর পদ্মের আকৃতির নকশা হয়ে গিয়েছে। পাথুরিয়াঘাটার রাজবাড়িতে বসত ধ্রুপদী সঙ্গীতের আসর। সেখানে গাইতেন অঘোর চক্রবর্তী, পিয়ারা সাহেব, কিংবা আহমদ খান।
গবেষকদের মতে সাবেক কলকাতার দোল উৎসব প্রাচীন কালের মদনোৎসবের আদলে গড়া। বর্তমানে যাঁরা দোলের সময় রাস্তাঘাটে চটুল পরিবেশের কথা বলে রে-রে করে ওঠেন, তাঁরা শুনলে অবাক হবেন সে কালেও দোলে চটুলতা ছিল। প্রমাণ মেলে ইতিহাসের পাতায়। ‘...মিছিলওয়ালারা সুশ্রাব্য ও অশ্রাব্যগীতিতে পাড়া মাতাইয়া এবং নরনারী যাহাকে সম্মুখে পাইত, তাহাকে আবির ও পিচকারিতে ব্যতিব্যস্ত করিয়া চলিয়া যাইত। এমন অশ্রাব্য গীত এবং কুৎসিত সং প্রকাশ্যে পথে বাহির করিতেন যে, এখনকার লোকে তাহা কল্পনা করিতে পারে না। কর্তারা কিন্তু তাহা লইয়া আমোদ করিতেন। গৃহিনীও বালক-বালিকাদের সহিত শ্রবণ ও দর্শন করিতেন।’
তবে বিলাসিতা কিংবা আমোদ-প্রমোদ যতই হোক না কেন, এই সব বিলাসী বাবুরা ছিলেন সাবেক হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী। তাই দোল উপলক্ষে এই সব বাড়িতে বিশেষ পুজোআচ্চা হত। তৈরি হত বিশেষ মিষ্টি এবং সরবতও। কিছু কিছু পুরনো পরিবারে আজও এই সব রীতি দেখা যায়।
বাবু-বিলাসের দিন ফুরলেও ফুরোয়নি সেই ঐতিহ্যের রং। কালের গরিমায় অনেক কিছু হারালেও বনেদি পরিবারগুলিতে আজও অটুট এবং অক্ষুণ্ণ দোল বিলাসের সেই মেজাজটা। সময়ের স্রোতে বাঙালির দোলযাত্রায় পড়েছে প্রাদেশিকতার ছাপ। তবু তার মাঝেই পুরনো কলকাতার দোল বিলাস স্মৃতির সুরভি নিয়ে অতীত আর বর্তমানের মাঝে একটা রঙিন যোগসূত্র।
দেল (দেউল), দোল, দুর্গোৎসব... এই তিন নিয়েই ছিল প্রাচীন কলকাতার ধর্মার্চনা, আনন্দ-উৎসব। বাংলাদেশে সেদিন দেউল বা মন্দিরের অভাব ছিল না। সেই সব মন্দিরে প্রধানত রাধা-কৃষ্ণের যুগল মূর্তির আরাধনা চলত নিরবচ্ছিন্নভাবে। বৈষ্ণবদের তখন ছিল রমরমা। সময়টা ষোড়শ-সপ্তদশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ। কৃষ্ণনগরের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র এই বৈষ্ণবীয় পরিমণ্ডলে লালিত-পালিত হয়েও বাংলায় শক্তিদেবীর আরাধনা—বৈষ্ণব বিরোধী শাক্ত সাধনাকে প্রসারিত করার জন্য রাষ্ট্রশক্তি কাজে লাগিয়েছিলেন।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌল্লার পরাজয়ের পর (১৭৫৭) বণিকের মানদণ্ড রাজদণ্ড রূপে দেখা দেওয়ায় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা চরমে পৌঁছয়। সেই দিনগুলিতে অভিজাত-অভাজনেরা বিপর্যয় থেকে মুক্তি পেতে কৃষ্ণের বাঁশির পরিবর্তে শক্তিদেবীর অসিকেই প্রাধান্য দিয়েছিল। কিন্তু কালে-কালান্তরে দেখা গেল, জমিদার-ইজারাদার-ইমানদার তথা ভূস্বামীরা কৃষ্ণ আরাধনার পাশাপাশি শক্তি আরাধনাকেও গুরুত্ব দিলেন। বাংলাদেশে দুর্গা ও কালীপুজোর সূচনা এই প্রেক্ষিতেই। কৃষ্ণের বংশীধ্বনির মাধুর্য কিন্তু হারিয়ে গেল না। অভিজাত ব্যবসায়ী এবং সাধারণ কুলীন মানুষেরা... যাঁদের মধ্যে ছিলেন বেনিয়ান, মুৎসুদ্দি, রাইটার, কেরানি, মুন্সি প্রমুখ। তাঁরা রাধাকৃষ্ণের মধুর লীলার আস্বাদন ও আরাধনাকে নতুন রূপ দিয়েছিলেন। জোব চার্নকের উদ্যোগে নগর কলকাতা গড়ে ওঠার পর দেখা গেল, অভিজাত ধনবান মানুষদের বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত দেউল অর্থাৎ মন্দিরে সাড়ম্বরে রাধা-কৃষ্ণের আরাধনা নানাভাবে চলছে।
সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও কলকাতা—এই তিনটি গ্রাম নিয়েই তৈরি হয়েছিল নগর কলকাতা। যা বর্তমানে কলকাতা মহানগরীতে রূপান্তরিত। প্রাচীনকাল থেকেই এই তিন জনপদের অস্তিত্ব ছিল লক্ষণীয়। চার্নক গঙ্গা পূর্বতীরবর্তী এই তিন গ্রামকে কেন্দ্র করে কলকাতা মহানগরীর রূপরেখাটি চিত্রায়িত করলেন। সুতানুটি অর্থাৎ উত্তর কলকাতা... যেখানে সুতো তথা বস্ত্র নিয়ে কাজ কারবার ও তার ব্যবসাই ছিল প্রধান। গোবিন্দপুর ছিল বর্তমানে ফোর্ট উইলিয়াম ও সন্নিহিত গড়ের মাঠ অঞ্চলটি। আর কলকাতা ছিল দক্ষিণ অংশের কালীঘাট-ভবানীপুর থেকে বড়িশা-বেহালা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল। এই অংশটির মালিক ছিলেন সাবর্ণ রায়চৌধুরীরা। কালীঘাটের মন্দির তাঁদের হাতেই গড়ে উঠেছিল।
কলকাতা ফোর্ট যখন গড়ে উঠল, তখন গোবিন্দপুরে বসবাসকারী তাঁতি-বস্ত্র ব্যবসায়ীরা উঠে গেলেন বর্তমান বড়বাজারে... পাথুরিয়াঘাটা অঞ্চলে। প্রসঙ্গত, পিরালি ঠাকুর পরিবার এই গোবিন্দপুরেই প্রথমে বসবাস করত। পরে পাথুরিয়াঘাটা-জোড়াসাঁকোতে চলে যায়। সুতানুটি রয়ে গেল সুতানুটিতেই।
পুরনো কলকাতার দোল উৎসব বিশেষভাবে পালিত হতো সুতানুটি, গোবিন্দপুর এবং মধ্যবর্তী বড়বাজার সন্নিহিত অঞ্চলে। আর অভিজাত ব্যবসায়ী, কোম্পানির শাসকদের কৃপায় রাজা-জমিদার-ইজারাদার প্রমুখের প্রধানত সুতানুটি অঞ্চলে নির্মিত অট্টালিকা সংলগ্ন মন্দিরে নিত্য রাধা-কৃষ্ণের আরাধনার ব্যবস্থা ছিল। সংলগ্নবাগান বাড়িতে হতো দোল উৎসব। দোলের আগের দিনে সংশ্লিষ্ট বাগানবাড়িতে ‘চাঁচর’ অর্থাৎ হেমন্ত-শীতে ঝরে পড়া শুকনো স্তূপীকৃত পাতা, ভেঙে পড়া গাছের ডালপালা, আবর্জনায় অগ্নি সংযোগ করা হতো। এটিই চাঁচর উৎসব। এটি একটি রূপক অনুষ্ঠান। এই প্রসঙ্গে পৌরাণিক তিনটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কৃষ্ণগত প্রাণ প্রহ্লাদকে আগুনে পুড়িয়ে মারার জন্য তারই পিতা দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু নিজের সহোদরা হোলিকাকে নিযুক্ত করে। কিন্তু কৃষ্ণের সক্রিয়তায় প্রহ্লাদ রক্ষা পায়। হোলিকারই মৃত্যু ঘটে ষড়যন্ত্রের আগুনে পুড়ে, যেখানে প্রহ্লাদের পুড়ে মরার কথা ছিল। চাঁচরের পরের দিন কৃষ্ণ আরাধনার আনন্দোৎসব। এই অনুষ্ঠানের নাম হোলি (হোলিকা থেকে)। যা প্রবাসী অবাঙালিদের উৎসব অনুষ্ঠিত হয় পূর্ণিমা তিথিতে নয়, দ্বিতীয়ার প্রতিপদে।
আর একটি মত হল, ঢুন্ডা নামে এক রাক্ষসী শিবের বরে বলশালী হয়ে সুরলোকে প্রায় একাধিপত্য বিস্তার করে... কম বয়সের ছেলেরা ঋতু পরিবর্তনের সময় তার উপর অত্যাচার করতে পারে জেনে রাক্ষসী কম বয়সি বালকদের মেরে ফেলতে থাকে। এই ভয়ানক রাক্ষসীর হাত থেকে নিস্তার পেতে শুকনো কাঠপাতায় আগুন লাগিয়ে তাকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দোলের আগেরদিন যে চাঁচর... যেখানে কাঠপাতায় অগ্নি সংযোগ করে পোড়ানো ও ছোট ছেলেদের আনন্দে বিহ্বল হওয়ার ঘটনা। সেটি ঢুন্ডা বধেরই স্মৃতি।
তৃতীয়টি হল মেড়াসুরের হত্যা। এখানেও অত্যাচারী অসুরের মেড়ার বা ভেড়ার রূপ ধারণে এবং সাধারণ মানুষের ক্ষতি করে। তাকে দোলের আগের দিন অগ্নি সংযোগ করে হত্যা করা হয়। ‘মেড়াপোড়া’ থেকেই আজকের ‘ন্যাড়াপোড়া’ শব্দটির উদ্ভব বলে অনুমান করা হয়।
এ তো গেল দোলের আগের দিনের উৎসব—যা মূল দোলযাত্রার সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত। মূল উৎসবটিকে আরও একটু উদ্দীপিত করার আয়োজন এখানে। এবার আসা যাক মূল উৎসবের ক্ষেত্রে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দোলে পাঁচ-পাঁচটি দিন ছুটি দিত। পুরনো কলকাতার এই পাঁচটি দিন রঙের অনুষঙ্গে কাটতো। জার্মান থেকে আসত নানা রং। দাম অনেকটা সস্তা হওয়ায় সহজেই কিনতে পারতেন সব মানুষ। গোলাপি-সবুজ-গাঢ় নীল ইত্যাদি রং এলেও সাধারণ মানুষ কিন্তু লাল রংটিই পছন্দ করত বেশি। রঙের উৎসব... দোল খেলার পর পথঘাট লাল হয়ে থাকত বেশ কয়েকদিন পর্যন্ত। দিনের বেলা রং-পিচকিরি নিয়ে মাতামাতি চললেও বিকেলে, রাতে কখনও বা পরের দিন শুধুই আবির দেওয়া হতো। টিন-বাঁশ-পিতল ইত্যাদি দিয়ে তৈরি হতো পিচকারি। ধনী-অভিজাত বাড়ির দোলখেলায় পিতলের পিচকিরি, পিতলের বালতিতে রং, কিংবা সুগন্ধী আবির, পিতল বা কাঁসার রেকাবিতে অভ্র ও ফুলের পাপড়ি ছড়ানো আবির ইত্যাদি ব্যবহার করা হতো। তুলনায় সাধারণ মধ্যবৃত্তের সম্বল বলতে ছিল বাঁশ-টিনের পিচকিরি... যার দামও কম। সাইজ অনুযায়ী দু’পয়সা থেকে দু’আনার মধ্যে। অন্যদিকে পিতলের পিচকিরির দাম ঘোরাফেরা করত ছ’আনা থেকে দশ আনার মধ্যে। অবস্থাপন্ন মানুষজন বাড়িতে বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করত দোলখেলার জন্য। সকালে রঙের উৎসবে উল্লাস, দুপুরে থাকত এলাহি ভোজের আয়োজন। বিকেলে আবার আবির খেলা। ছোটরা বড়দের পায়ে আবির ছুঁইয়ে প্রণাম করত। বিকেল-সন্ধ্যায় ঘরোয়া গানের আসর যেমন থাকত, তেমন কেউ কেউ ওস্তাদ গাইয়ে-বাজিয়েদেরও আমন্ত্রণ জানাতেন বাড়িতে। নিধুবাবুর টপ্পা, যদু ভট্টের গান এর মধ্যে উল্লেখ্য। বাঈজি নাচও হতো। বৈষ্ণবরা আয়োজন করতেন কীর্তন গানের। এছাড়া কবিগান, তরজা, আখড়াই-হাফ আখড়াই গানেরও ব্যবস্থা হতো। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে নাট্যাভিনয়ের কালে দোললীলা, বসন্তলীলা প্রহ্লাদচরিত, কংসবধ বিষয়ক নাটকও অভিনীত হয়েছে। সব মিলিয়ে দোলের উৎসবের প্রেক্ষাপট ছিল রঙিন এবং বর্ণাঢ্য।
সেকালে নগর কলকাতায় কোনও পরিবার বর্ধিষ্ণু কি না জানতে মানুষ জিজ্ঞেস করত, সেই পরিবারে দোল ও দুর্গোৎসবের আয়োজন হয়? দুর্গাপুজোর মতোই দোল উৎসব ছিল জাঁকজমকপূর্ণ এবং সম্মানসূচক। যাকে বলে স্ট্যাটাস সিম্বল। মন্দিরে রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহের নতুন সাজ, ফুলের অঙ্গসজ্জা, বিশেষ ভোগরাগের ব্যবস্থা। বিগ্রহের পায়ে-গায়ে ছোঁয়ানো হতো আবির। সাদা, গোলাপি বাতাসা, সাদা ও রঙিন মঠ (চিনি দিয়ে তৈরি ত্রিভূজাকৃতির মিষ্টি)—নানা পাখি, ফুল ইত্যাদির ছাঁচ তৈরি করে এই ‘মঠ’কে বিভিন্ন আকৃতি দেওয়া হতো। এছাড়াও মুড়কি-কদমা-ছোলা ও চিনি সহযোগে তৈরি একরকমের মিষ্টি... যা ‘ফুটকড়াই’ নামে জনপ্রিয়। তাও দেওয়া হতো পুজোয়। আর সেই প্রসাদ বাচ্চা-বুড়ো সবার কাছেই ‘দোল স্পেশাল’ হিসেবে খুবই জনপ্রিয় ছিল।
প্রাচীন কলকাতার ব্রিটিশ পুলিস বিভাগ থেকে দোলের বেশ কয়েকদিন আগেই প্রচার করা হতো শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অনিচ্ছুক ব্যক্তিদের গায়ে রং না দেওয়ার জন্য। এখনকার মাইক-মাইক্রফোন বা প্রিন্ট ইলেক্ট্রনিকস মিডিয়ার মাধ্যমে যে প্রচার জনস্বার্থে করা হয়, ঠিক সেই জাতীয় প্রচারই করত সেই সময় ঢুলি সম্প্রদায়। বিভিন্ন জরুরি খবর সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি এই ঢুলিরাই করত। কলকাতার জনবহুল অঞ্চলগুলি—বারোয়ারিতলা, বাজার-হাট, কখনও বা যাত্রাপালা, কীর্তনের আসরের আগে পরে ঢুলিরা ঢোল বাজিয়ে পুলিস, আদালত ইত্যাদির সরকারি আদেশ-নির্দেশ প্রচার করত। এবিষয়ে যদি কোনও রকম অভিযোগ থানায় যায়, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে আটক করা হবে বলেও জোর প্রচার চালানো হতো। অনেক ধনী বা জমিদার ব্যক্তি, ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজের বাড়ি কিংবা বাগানবাড়িতে যে দোল খেলার এলাহি আয়োজন করতেন, তার প্রচারও করা হতো এই ঢুলিদের দিয়েই। তারা ‘ঢ্যাঁড়া’ পিটিয়ে সেইসব বাবু সম্প্রদায়ের মানুষজনের মহিমা প্রচার করত। অনেক বিত্তশালী-জমিদার আবার কলকাতার বিভিন্ন বস্তি অঞ্চলে ঘর দিয়ে ঢুলিদের থাকতে দিতেন বিভিন্ন প্রচারের স্বার্থে। এই ঢুলিরা ছিল ডোম সম্প্রদায়ভুক্ত।
কলকাতার যে সব ধনীর বাড়িতে বেশ জাঁক করে দোল উৎসবের আয়োজন হতো তাঁরা হলেন, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, দিগম্বর মিত্র, বলরাম বসু, পশুপতি বসু, বাবু পীতরাম দাস, বাবু বৈষ্ণবচরণ শেঠ, রাধাকান্ত দেব বাহাদুর, বাবু আশুতোষ দেব, বাবু নবীনচন্দ্র বসু, বাগবাজারের ভুবন নিয়োগী, অমৃতবাজার পত্রিকার সম্পাদক শিশিরকুমার ঘোষ প্রমুখ। ইংরেজরা অতিথি হয়ে আসতেন এই আয়োজনে। খানাপিনার সঙ্গে নাচ-গান ছিল উৎসবের অপরিহার্য অঙ্গ। ইংরেজ প্রশাসকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে নিজের খ্যাতি প্রতিপত্তিতে আরও খানিকটা জৌলুস আনার চেষ্টাও থাকত অনেক সময়েই। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করলেও জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে দোল উৎসব আবির-কুঙ্কমে বেশ জাঁকজমক করেই হতো। ঠাকুরবাড়ির নারী পুরুষদের অংশগ্রহণে গান ও অভিনয়ের আয়োজন হতো সন্ধ্যায়। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে যেভাবে হতো রঙের উৎসবের উদযাপন। যা প্রবল জনপ্রিয় বসন্ত উৎসব নামে। এর সূত্রপাত ঠাকুরবাড়ির দোল উৎসবের প্রভাবেই।
অর্থবান মানুষেরা এই রঙের উৎসবে প্রিয়জনদের বাড়িতে তত্ত্ব পাঠাতেন। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু বয়স্যদের বাড়িতে বিলিতি রঙের বাক্স নানা আকৃতির পিতলের পিচকিরি, পিতলের বালতি, আবির, গন্ধদ্রব্য, রঙিন মিষ্টি, কখনও বা বিলিতি প্রসাধন সামগ্রীও উপহার হিসেবে যেত বড় পিতল-কাঁসার পরাতে, বা কাঠের সুদৃশ্য বারকোশে। বিদেশ থেকে আমদানি করা লেসের ঢাকনা দেওয়া এইসব উপহার সামগ্রী তাঁদের আভিজাত্যেরই স্মারক।
বর্তমানে বিবাদি বাগ... অতীতের ডালহৌসি অঞ্চলে মহাকরণের (অতীতের ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ) সামনে যে বড় দিঘি আছে, তার নাম লালদিঘি। তা কিন্তু এই দোলেরই অনুষঙ্গে। বাড়িতে এবং রাজপথে রং খেলা শেষ করে বিভিন্ন মানুষ এই দিঘিতেই স্নান করতেন। রঙে ভালো জামা-কাপড় নষ্ট হওয়ার ভয়ে পুরনো ছেঁড়া জামাকাপড় পরেই অনেকে সেদিন পথেঘাটে রং খেলায় অংশ নিতেন। সেই জামাকাপড় ও গায়ের রঙে দিঘির জল লাল হয়ে উঠত। অনেকদিন পর্যন্ত জল রঙিন থাকত উৎসবের রেশ বহন করে। লালদিঘির পাশে বাজারের নামও হয়েছে তাই লালবাজার।
পুরনো কলকাতায় দোল উপলক্ষে সঙের দল বেরত। কৃষ্ণ আরাধনা কেন্দ্রিক দোল উৎসবের সঙ্গে অবশ্য কলকাতার সেকালের নিম্নবর্গের মানুষজনের বিশেষ সংযোগ ছিল না। তাঁদের সাধনা-আরাধনা ছিলেন লৌকিক দেবদেবীরা; শীতলা, ষষ্ঠী, ধর্মঠাকুর, বাশুলী, শিব প্রমুখ। কিন্তু দোলের দিন কলকাতার এই জেলে ও কৈবর্তপাড়া থেকে সং বের হতো। গাজন উৎসবে সঙের রমরমা থাকলেও দোলেও তা নেহাত কম হতো না। অভিজাতজনেরা অনেকাংশে এঁদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। শীতলা, ষষ্ঠী, ধর্মঠাকুর, বাশুলী, শিব, মনসার পুজো করলেও দোলের দিন এঁরা নিজেদের মতো করে কৃষ্ণ কথা নিয়ে মুখে মুখে গান বাধতেন রসরসিকতায়। বলাবাহুল্য, সেই সব গান, সব সময় জনরুচির উপযুক্ত হতো না। সমসাময়িক সমাজব্যবস্থার বিভিন্ন বিষয় নিয়েও দোলের দিন মুখে মুখে গান বাঁধতেন এই সঙেরা। বউবাজার থেকে ক্রিক রো ও সন্নিহিত অঞ্চলে এই সঙের দল ঘুরে বেরাত। এঁদের সঙ্গেও থাকত রং ও আবির। রাস্তায় ছেলে-বুড়ো যাকে পাওয়া যেত, তাকেই চলত রং মাখানো। নিজেদের মধ্যেও রং খেলতেন তাঁরা। কৃষ্ণ কথা ছাড়াও দোলের দিন সমসাময়িক বিষয় নিয়ে ছড়া বেঁধে চলত গান গাওয়া... সেসব উন্নত রুচির না হলেও সাধারণ মানুষ খুব আমোদ পেত। শুধু সংই নয়, সেকালে বউবাজার থেকে বাগবাজার পর্যন্ত বহু পল্লিতে দোলযাত্রার দিন নগর সংকীর্তনের দল বের হতো। বহু দল রূপচাঁদ পক্ষীর গান গাইত। একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে—‘হোরি খেলিছে শ্রীহরি, সহ রাধাপ্যারী,/ কুঙ্কুম ধূম, শ্যাম অঙ্গভরি।।/পুস্পমালা, হিন্দোল সাজায়ে ব্রজনারী,/ রাই শ্যাম, অনুপম, দোলে তদুপরি।’ এছাড়া রাম বসু ও হরু ঠাকুরের কথকথাও জনপ্রিয় হয়েছিল দোল-হোলিকে কেন্দ্র করে।
পুরনো কলকাতার দিনকাল গত হয়েছে। পরিবর্তনের শত-সহস্র স্রোত মানুষের জীবন ও সমাজের উপর দিয়ে প্রবাহিত। পরিপ্রেক্ষিত কিন্তু পাল্টায়নি। আজও ফাল্গুনী পূর্ণিমায় রঙের উৎসব দোল শুধু পালিত হয় না, সাড়ম্বরেই পালিত হয়। এই দিনটিতেই ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দে চৈতন্যদেব আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাঁর ৫০০ বছর পূর্তি থেকে জন্মোৎসব উদযাপনের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। দুয়ে মিলে বৃন্দাবনের বর্ষানা (রাধার জন্মস্থান), নন্দ্গাঁও (কিশোর কৃষ্ণের অবস্থান) নদীয়ার নবদ্বীপের সঙ্গে মিলেমিশে বর্তমানের কলকাতা মহানগরী নব বৃন্দাবন সদৃশ হয়ে ওঠে বাঙালি-অবাঙালিদের দোল-হোলির উৎসবে।
আসলে দীপাবলি বা দেওয়ালির পর হোলি দ্বিতীয় বৃহত্তম সর্বভারতীয় উৎসব। দল-হোলিকে কেন্দ্র করে আজ কলকাতা মহানগরী সামন্ততন্ত্র অতিক্রম করে একাধারে অনেক বেশি গণতান্ত্রিক, সম্প্রীতিবাহী, সংহতি সূচকও। প্রশাসনের তৎপরতা, সাধারণ মানুষের সচেতনতায় এখন ক্ষতিকর রঙের ব্যবহার তেমন হয় না। পাড়ায় পাড়ায় সংঘর্ষ হয় না, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ণ থাকে পুরোপুরি। নাচে-গানে-কীর্তনে-অঞ্চল পরিক্রমায় নান্দনিকতার বার্তা প্রসারিত হলেও ঘরে-বাইরে মদ্যপানের তীব্রতা বর্ধমান। রঙের পরিবর্তে কাঁচা ডিম, নর্দমার জল, পুকুরের পচা পাঁক ব্যবহার এবং মদ্যপানের মত্ততা বন্ধ হোক। আগের মতো আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়াক নানা বসন্ত ফুলের নির্যাস; সংকীর্তন, রবীন্দ্রগানের সুর আর বিহারের ভাইদের ভোজপুরি ভাষায় গাওয়া ‘রামাহো রামাহো’র আবহ। দু’দিনের ছুটি আমরা মনেপ্রাণে উপভোগ করি, আর স্মরণ করি পুরনো কলকাতার দোলচিত্রকে।
দোলের দিন নবদ্বীপের মহাপ্রভু মন্দিরের উৎসব বড় মায়াময়। প্রতিদিন তিনি দেবতা। কেবল একদিন তিনি প্রিয়। সারা বছর তিনি আপামর ভক্তের ধামেশ্বর গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু, ‘রাধাকৃষ্ণের মিলিত তনু’ শ্রীচৈতন্য। কিন্তু ফাল্গুনি পূর্ণিমার দিনে তিনি সে সব কিছুই নন। জগন্নাথ পত্নী শচীর কোল আলো করা সদ্যজাত শিশু নিমাই। পরনে লাল চেলি, হাতে চুষিকাঠি। চারপাশে ছড়ানো ঝিনুক-বাটি, ঝুমঝুমি। ভক্তিতে নয়, সেদিন অপত্য স্নেহে সিক্ত তিনি।
পণ্ডিতেরা বলেন, ১৪৮৬ সালের দোল পূর্ণিমার সন্ধ্যায় জন্ম নিলেন গোরাচাঁদ। সেই স্মৃতিকে স্মরণে রাখতে বৈষ্ণবসমাজ দোল পূর্ণিমাকে বদলে দিলেন গৌরপূর্ণিমায়। চৈতন্যজন্মের প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছর পরেও চৈতন্যধামে দোলের দিন তাই শুধুই মহাপ্রভুর আবির্ভাব উৎসব। মহাপ্রভুর মন্দিরে, জন্মস্থানে এদিন আবির কুমকুম নয়, প্রস্তুত থাকে সুগন্ধি অভিষেক বারি, পঞ্চামৃত। দোলপূর্ণিমার সন্ধ্যায় আকাশে চাঁদ উঠলেই বেজে ওঠে শতেক শাঁখ, ঘণ্টা, মৃদঙ্গ, মন্দিরা। শুরু হয়ে যায় মহাভিষেক। চৈতন্য বিগ্রহের প্রতীক হিসেবে জগন্নাথ মিশ্রের গৃহে পূজিত ‘রাজরাজেশ্বর’ শিলাকে ১০৮ ঘড়া জলে স্নান করানোর পর ষোড়শোপচারে হয় অভিষেক বা অন্য ‘জাতকর্ম’। গৌরাঙ্গদেবকে পরানো হয় শিশুর চেলি। সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় কীর্তন থেকে আরতির সুর। নাটমন্দিরের নহবত খানার সানাই আলাপ জমায় বসন্ত রাগে। রাত যত গড়ায় নাটমন্দিরের হোরিকীর্তনের লয় ততই ঘন হয়ে আসে।
পরদিন অন্নপ্রাশন। ফুলমালায় সাজানো দক্ষিণদুয়ারি সিংহদরজার উপরে নহবতখানা। সানাইয়ে ‘বৃন্দাবনী সারং’। রাগের আলাপের রেশ ধরে উৎসবের সুর ছড়িয়ে পড়েছে মহাপ্রভু পাড়ার ঘরে ঘরে। নাটমন্দিরে উত্তরমুখী গরুড় স্তম্ভের নীচে পদাবলী কীর্তনের সুর। আর গর্ভমন্দিরের বন্ধ দরজার সামনে জড়ো হওয়া হাজার হাজার ভক্ত কন্ঠ মিলিয়ে গাইছেন, “জয় শচীনন্দন জয় গৌরহরি। বিষ্ণুপ্রিয়া প্রাণনাথ নদিয়াবিহারী।”
লালচেলিতে শিশু সাজে ধামেশ্বর মহাপ্রভুর দুর্লভ দর্শনে ভক্তেরা আসেন শিশুর খেলনা নিয়ে। খাদ্য তালিকায়, তরকারি থেকে মিষ্টি সবই ৫৬ রকম করে। রূপোর থালা বাটি গ্লাসে থরে থরে সাজানো সে সব। প্রায় দু’কুইন্ট্যাল অন্ন চূড়ো করে সাজানো। চারপাশে ভিড় করে আছেন হাজারো মানুষ। খাদ্যের সুঘ্রাণ, ধূপের সুগন্ধের সঙ্গে মিশে গেছে আরতির কীর্তনের সুর।
নব বসন্তে মহাপ্রভুর আরতির পদ “ভালি গোরাচাঁদের আরতি বাণী’ সুর বদলে গাওয়া হচ্ছে বসন্ত রাগে। তিনি এলেই তো বসন্ত আসে।
কস্তূরী-চন্দন-অগুরু-ধূপের গন্ধে ম’ম’ করছে নাটমন্দির। সাদা পর্দা দিয়ে ঘেরা নাটমন্দিরের প্রশস্ত চত্বরে একে একে সাজানো হচ্ছে ছাপ্পান্ন ভোগ। নামে ছাপ্পান্ন ভোগ হলেও অন্ন, পরমান্ন, পুষ্পান্ন, মিষ্টান্ন, তরি- তরকারি,ভাজা, পুরি, নিমকি, চাটনি সব মিলিয়ে পদের সংখ্যা কয়েকশো। আর হবে নাই বা কেন? স্বয়ং চৈতন্য মহাপ্রভুর অন্নপ্রাশন বলে কথা। তাই এই রাজসূয় আয়োজন নবদ্বীপের মহাপ্রভু বাড়িতে। এই মন্দিরেই বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী সেবিত মহাপ্রভুর শ্রীবিগ্রহের সেবা পুজো হয়ে আসছে কয়েকশো বছর ধরে। একমাত্র এই মন্দিরেই মহাপ্রভুর অন্নপ্রাশন উৎসব পালন করে থাকেন সেবাইত গোস্বামীরা। তাঁরাই বহন করে চলেছেন বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর উত্তরাধিকার। পুরুষানুক্রমে গোস্বামীরা এই উৎসব পালন করে আসছেন।
তবে বহু প্রাচীন এই অন্নপ্রাশন উৎসবের শুরু ঠিক কবে থেকে, তা নিয়ে কোন পাথুরে প্রমাণ নেই। যেমন জানা যায় না, কী ভাবে নবদ্বীপে চৈতন্যদেবের আবির্ভাব তিথি আন্তর্জাতিক উৎসবে বদলে গেল। ইতিহাস বলে, প্রধানত পশ্চিম ভারতের উৎসব ‘হোলি’ বঙ্গদেশে এসেছিল সেন রাজাদের আমলে। আদতে পশ্চিমী দোল বা হোলি ছিল বিষ্ণুকেন্দ্রিক উৎসব। কিন্তু গীতগোবিন্দের কবি জয়দেবের হাত ধরে তাতে শ্রীকৃষ্ণের প্রবেশ। তারপর থেকে ধীরে ধীরে হোলি রূপান্তরিত হয়েছে শ্রীকৃষ্ণের দোলে। পরবর্তীতে চৈতন্যদেব দোলকে নতুন ভাবে সাজালেন। নৃত্য, গীত, কীর্তন, পদযাত্রায় উৎসবের ছোঁয়া লাগল দোলে। আবির, কুমকুমে দোল হয়ে উঠল রঙের উৎসব। ১৮ শতকের শেষ এবং উনিশ শতকের গোড়ার দিকে দোল হয়ে উঠল সেকালের বড়লোকদের উৎসব। উদ্দাম আমোদে তাঁরা দোলে মেতে উঠতেন। ইংরেজদের পলাশি জয়ের পর নদিয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্র অত্যন্ত ক্ষমতাবান হয়ে উঠলেন। তিনি একের পর এক উৎসব প্রচলন করলেন বঙ্গদেশে। কিন্তু চৈতন্যবিরোধী কৃষ্ণচন্দ্র সে ভাবে দোলকে গুরুত্ব দিলেন না। বরং পৃথক ভাবে প্রচলন করলেন বারোদোলের। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চৈতন্য অনুরাগী বৈষ্ণব ভক্তদের তৎপরতা এবং উদ্যোগে দোল পূর্ণিমা তিথিতে শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব উৎসব পালনের ঝোঁক বাড়ল। দোলপূর্ণিমা হয়ে উঠল গৌরপূর্ণিমা।
গত শতকের সাতের দশক এই চৈতন্যকেন্দ্রিক দোল উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। নবদ্বীপের গঙ্গার পূর্ব পাড়ে মায়াপুরে গড়ে উঠল সাগর পাড়ের বিদেশি বৈষ্ণব ভক্তদের মঠ। বিদেশিদের বিপুল অর্থ এবং নিখুঁত পরিকল্পনায় পঞ্চাশ বছরেরও কম সময়ে মায়াপুর নবদ্বীপের দোল তথা চৈতন্যদেবের আবির্ভাব উৎসবকে আন্তর্জাতিক মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে।
তবে মহাপ্রভু বাড়ীর উৎসবে আড়ম্বরের ছোঁয়া লাগে একশো বছর আগে শচীনন্দন গোস্বামীর সময়ে। মহাপ্রভুর সেবাইত গোস্বামীদের মতে অন্নপ্রাশনের দিন তিনি আর যুগাবতার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নন। তিনি ওই দিন জগন্নাথ মিশ্র ও শচীদেবীর কোল আলো করা আদরের ধন নিমাই বা বিশ্বম্ভর। আর তাই নিমাইয়ের অন্নপ্রাশনে ঝিনুক-বাটি থেকে ঝুমঝুমি, চুষিকাঠি থেকে খেলনা বাদ থাকে না কিছুই। চৈতন্যদেবের জীবৎকালেই বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী বংশীবদন ঠাকুরের সহায়তায় নবদ্বীপে নিজগৃহে নির্মাণ করিয়ে ছিলেন এই বিগ্রহ। অনিন্দ্য সুন্দর এই বিগ্রহকে সেদিন পড়ানো হয় লাল চেলি, পায়ে মল।
এই অন্নপ্রাশন উৎসবের আর এক নাম “জগন্নাথ উৎসব”।
গোস্বামীরা জানান তাঁরা ছাড়া ভু-ভারতে আর কেউ মহাপ্রভুকে অন্নপ্রাশন দেওয়ার অধিকারী নন। থরে থরে সাজানো ভোগের আগে মহাপ্রভুর নামকরণ, চূড়াকরন সবই হয়। তবে প্রতীকী ভাবে। দাদামশাই নাম রেখেছিলেন বিশ্বম্ভর। এদিনও প্রতীকী নামকরন করা হয়। তারপর ভোগ নিবেদন। অন্নপ্রাশনের দিনে মহাপ্রভুকে অন্নব্যঞ্জন পরিবেশন করা হয় মহামূল্য পাত্রে। রূপো, তামা, কাঁসা এবং পেতল এই চার ধরনের পাত্রে সাজানো হয় পদগুলি। রূপোর চারটি করে থালা, বাটি, রেকাবি এবং গ্লাসে নিবেদন করা হয় অন্নব্যঞ্জন। হাত ধোয়ার ডাবর, গাড়ু, ধূপদানি, কোষাকুষি সবই এদিন রূপোর। আর ঝুমঝুমি, চুষিকাঠি, মল—এ সব সোনার।
মহাপ্রভুর অন্নপ্রাশনের মেনুতে থাকে হাজারো পদ। তরকারি, ডাল, শুক্তো, ভাজা, পোস্ত, শাক এবং চাটনি থাকবে সাত রকমের। সঙ্গে মহাপ্রভুর প্রিয় থোড়, মোচা, কচুর শাক, বেগুনপাতুরী, ছানার রসা (ডালনা), ধোকার ডালনা, লাউ, চালকুমড়ো থাকবেই। পোস্ত দিয়ে যত রকমের পদ সম্ভব, এমন কি ছানার পোস্ত। কুল, তেঁতুল,আম, আমড়ার টক। তবে মহাপ্রভুর ভোগে নিষিদ্ধ টম্যাটো, পুঁইশাক এবং মুসুরডাল।
সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমার শুভেচ্ছা।










Post a Comment