ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনায় চূর্ণ-বিচূর্ণ গোটা শরীর, হুইলচেয়ারের ভরে জীবনের মূল স্রোতে ফিরে এসেছেন এই লৌহমানবী
ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায়, Odd বাংলা: মানুষের জীবন কখনও কখনও হাইওয়ের মতো সমান্তরাল হয়, কখনও কখনও আবার তা-ই হয়ে ওঠে খরস্রোতা নদীর মতো, যেখানে জীবন অতিবাহিত হয় বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে। কারওর কারওর জীবনে সেই ঘাত-প্রতিঘাটই এতটাই বিশালাকার ধারণ করে যে, আপাতভাবে আপনার মনে হতে পারে এই কঠিন পরিস্তিতিতে কারওরই ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। কিন্তু নিজের জীবনের পাহাড়-প্রমাণ অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছেন মুনিবা মাজারি, যিনি পাকিস্তানের 'আয়রন লেডি' হিসাবে পরিচিত।
পাকিস্তানের রহিম ইয়ার খানে ১৯৮৭ সালের ৩ মার্চ জন্ম হয় মুনিবার। তার বাবা ছিলেন একজন শিল্পী এবং মা ছিলেন একজন গৃহবধু। তিনি ভাই-বোনের মধ্য তিনিই ছিলেন সবার বড়। আর্মি পাবলিক স্কুলে পড়াশোনা করার পর রহিম ইয়ার খানের একটি কলেজ থেকে ফাইন আর্টসে ব্যাচেলর ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। বরাবরই তাঁর ইচ্ছা ছিল জীবনে একজন খুব বড় চিত্রশিল্পী হবেন। কিন্তু বাবা-মায়ের ইচ্ছেতে মাত্র ১৮ বছর বয়সেই পাক পাইলট খুররাম শাহাজাদের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায় তাঁর। মা-বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে দাঁড়া তে পারেননি মুনিবা, তাই সেদিন তাঁদের খুশীর জন্যই বিয়েচে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু বিয়ের বছর দুই-তিন বাদেই জীবনের সংজ্ঞাটাই পাল্টে যায় মুনিবার কাছে। মাত্র ২১ বছর বয়সে মারাত্মক গাড়ি দুর্ঘটনার কবলে পড়েন মুনিবা। স্বামীর সঙ্গে বালুচিস্তান থেকে বাপের বাড়ি যাওয়ার পথে ঘটে গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়। তাঁর স্বামী গাড়ি থেকে লাফিয়ে বেরিয়ে গেলেও গাড়ি সমেত খাদে পড়ে যান মুনিবা। আর এই দুর্ঘটনায় তাঁর শিড়দাঁড়া ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গিয়েছিল। সেইসঙ্গে তাঁর হাত, কাধ, পাঁজর ও কলারবোনে একাধিক ফ্র্যাকচার দেখা দিয়েছিল। তাঁর অবস্থা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, তাঁকে কোনও হাসপাতালই ভর্তি নিতে চাইছিল না, আর এইভাবে এক হাসপাতাল থেকে আর এক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময়ে শরীরের নীচের অংশ থেকে স্পাইনাল কর্ডের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয় যায়, যার ফলে তাঁর কোমড়ের নীচের অংশ প্যারালাইজড হয়ে যায়।
চিকিৎসকরা তাঁকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি আর কোনওদিনও হাঁটা-চলা করতে পারবেন না, সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবেন না, কোনওদিনও রঙ-তুলি ধরতে পারবেন না, এমনকী মেরুদণ্ড এবং কোমড়ের হাড় মারাত্মকভাবে যখম হওয়ার জন্য তিনি ভবিষ্যতে কোনওদিনও সন্তানের জন্মও দিতে পারবেন না। এই ঘটনার তিনি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন যে, যখন এই পৃথিবীতে তাঁর অস্তিত্বের কোনও মূল্যই নেই তখন তাঁর আর বেঁচে কী লাভ! একজন সন্তান ছাড়া একটি মেয়ের জীবন তো অসম্পূর্ণ!
সেইসময়ে তাঁর জীবনে তাঁর মেরুদণ্ড হয়ে তাঁর পাশে দাঁড়ান তাঁর মা। তিনিই তাঁকে বলেন যে, এই খারাপ সময় একদিন ঠিক কেটে যাবে, আর তাঁর যখন পুনর্জন্ম হয়েছে, নিশ্চয় ঈশ্বরের কোনও অন্য পরিকল্পনা করেছেন। এরপর মনের বল ফিরে পান তিনি। হাসপাতালের বেডে শুয়েই রঙ-তুলি ধরতে শুরু করেন মুনিবা।
এই ঘটনার প্রায় ৯ বছর পরে তাঁর জীবনের এই গল্প সারা পৃথিবার মানুষকে শুনিয়েছিলেন তিনি, আর তাঁর তাঁর জীবনের গল্পে উজ্জীবিত হয়েছিল সকলে। ২০১৫ সালে ফোর্বস-এর সেরা ১০০ জন অনুপ্রেরণামুলক মহিলার মধ্যে নাম ছিল তাঁর। এরপর পাকিস্তান টেলিভিশন কর্পোরেশন-এর অ্যাঙ্কর হিসাবে কাজ করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে আরও বেশি করে পরিচিতি পেতে থাকেন। মুনিবা হলেন পাকিস্তানের প্রথম হুইল চেয়ার-ব্যবহারকারী শিল্পী এবং প্রথম গুডউইল অ্যামবাসাডর, যার গল্প আজও বহু মানুষের জীবনে অনুপ্রেরণা।





Post a Comment