সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে নিরীহ মেয়েদের ডাইনি সন্দেহে ফাঁসি দেওয়া হত
Odd বাংলা ডেস্ক: সমাজের ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যে সীমারেখা টানতেই মূলত আইন এবং বিচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মূলত মানুষের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা কমাতেই তৈরি হয়েছে বিচার ব্যবস্থা। আবার কোনো অপরাধী যেন নিশ্চিন্তে ঘুরে না বেড়াতে পারে এজন্যই কঠোর থেকে কঠোরতর হয়েছে আইন। অপরাধের পরিমাণ বিবেচনা করে শাস্তির তারতম্য রাখা হয়েছে। গুরুতর যেসব অপরাধ মানুষ করেন, তাদের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড।
তবে শুধু যে অপরাধীরাই শাস্তি পায়, তা কিন্তু নয়। অনেক নিরাপরাধ মানুষও আইনের বেড়াজালে আটকে গেছেন। মৃত্যুদণ্ড জুটেছে সেসব মানুষের নিরাপরাধ হয়েও। সক্রেটিস থেকে শুরু করে অনেক সাধারণ মানুষ নির্দোষ হয়েও শাস্তি পেয়েছেন। তেমনই একভাবে মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসের সালেম শহরে ২০ জন মানুষের। যার সবাই ছিলেন নারী। ১৬৯২ সালে এখানেই ঘটে গিয়েছিল ইতিহাসের এক লজ্জাজনক ও বীভৎস ঘটনা। বিচারের নামে হয়েছিল কলঙ্কজনক প্রহসন। কিছু নিরপরাধ ও অসহায় নারীকে ‘ডাইনি’ অপবাদ দিয়ে সালেম গ্রামে এক নিষ্ঠুর বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছিল।
ইংল্যান্ড থেকে আসা অভিবাসীদের একটি দল এই সালেম গ্রামে বসতি স্থাপন করে। ১৫ থেকে ১৮ শতকে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে জাদুবিদ্যা ব্যবহার ছিল অনেক বেশি। তারা বিশ্বাস করতো ভূত-প্রেত, ওঝা-ঝাড়ফুঁক ও মন্ত্র-তন্ত্রে। ১৬৯২ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে সে গ্রামে ১২ বছর বয়সী অ্যাবিগেইল উইলিয়ামস ও তারই চাচাতো বোন ৯ বছর বয়সী বেটি প্যারিস নামের দুই মেয়ে হঠাৎই পাগলামি শুরু করে।
মৃগীতে আক্রান্ত রোগীরা যেমন ছটফট করে ও মূর্ছা যায়, অবিকল সেরকম লক্ষণ ফুটে উঠলো তাদের আচরণে। তারা পাগলের মতো গোঙাতে থাকে, আছাড় খেতে লাগে মাটিতে, হাত-পায়ে ভর দিয়ে হামাগুড়ি দিতে থাকে সারা উঠোন জুড়ে। কোনো কারণ ছাড়াই অ্যাবিগেইল ও বেটি নিজের মনে কথা বলে এবং দু’হাত দু’পাশে ছড়িয়ে আকাশে ওড়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে। কখনো চিৎকার, কখনোবা কান্নাকাটি জুড়ে দেয়, কখনো ঘর গরম রাখার চুল্লির ভেতর ঢুকে পড়ার চেষ্টা করে, আবার কখনোবা চিমনী দিয়ে উপরের দিকে ওঠার চেষ্টা করে।
এই ঘটনার কয়েকদিন পর একই লক্ষণ নিয়ে অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে গ্রামের আরও ছয়টি ফুটফুটে মেয়ে। মনে হবে যেন কোনো অলৌকিক শক্তি ভর করেছে তাদের ওপর। গ্রামের লোকেরা কী করবে বুঝতে না পেরে দিশেহারা হয়ে গেল আতঙ্কে। ওষুধ এবং প্রার্থনা– কোনটিতেই কোনো কাজ হচ্ছিল না। দিশেহারা হয়ে বেটি প্যারিসের বাবা রিভ প্যারিস গ্রাম্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হলেন।
ডাক্তার সবকিছু দেখেশুনে রায় দেয় যে, তাদের এই অসুখের পেছনে কোনো শয়তানের হাত রয়েছে! গ্রামটিতে প্রটেস্ট্যান্ট ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। প্রটেস্ট্যান্টরা ছিল পিউরিটানপন্থী। এই মতবাদে বিশ্বাসীরা ছিল মূলত প্রাচীনপন্থী ও হতাশাবাদী। তারা বিশ্বাস করতো, মানব জাতির জন্ম পাপ থেকেই। আর সে কারণে, সবার মধ্যে আছে ঈশ্বর এবং শয়তানের বাস। এই মানব শরীরের আশেপাশেই এক অদৃশ্য জগতে তাদের বাস। ফলে গ্রামের ডাক্তার যখন রায় দেয় যে তাদের এই আটটি মেয়ের অসুখের পেছনে শয়তানের হাত রয়েছে, তখন সালেমের গোঁড়া প্রটেস্ট্যান্ট বাসিন্দারা খুব সহজেই ডাক্তারের ঐ বক্তব্যে সায় দেয়।
২৬ ফেব্রুয়ারি ডেকে আনা হলো গ্রামের ওঝাকে। ওঝার প্রশ্নের উত্তরে মেয়েরা জানালো যে, গ্রামের কয়েকজন বৃদ্ধা নাকি ডাইনি, তারাই নানা তুকতাক করে তাদের (মেয়েদের) এই অবস্থা করেছে। মেয়েদের দলটির মধ্যে অ্যাবিগেইল ও বেটি তো সরাসরি তিন জন বৃদ্ধার নাম করে তাদের ডাইনি হিসেবে চিহ্নিত করলো। গ্রামবাসীরাও মেয়েদের এই দাবি সহজেই মেনে নিল, কারণ তারাও মনে করছিল গ্রামের ওপর কারো অশুভ শক্তির ছায়া পড়েছে। ফলে সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লো গ্রামবাসীদের মধ্যে।
গ্রামবাসীর অভিযোগে আদালতের বিচারের ব্যবস্থা শুরু করেন গ্রামের ম্যাজিস্ট্রেট জোনাথন করউইন ও জন হ্যাথর্নের তত্ত্বাবধানে। তবে যে নারীদের উপর এই অভিযোগ আনা হয়েছিল তারা ছিলেন সমাজের দুর্বল শ্রেণীর মানুষ। এদের একজন ছিল রিভ প্যারিসের ক্রীতদাস, টিটুবা। অন্যজন ছিল সারাহ্ গুড, যিনি ছিলেন গৃহহীন ভিখারিনী এবং একজন মা। অন্যজন সারাহ অসবোর্ন, যার সঙ্গে গ্রামের কয়েকজনের সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং যার বিবাহিত জীবন নিয়ে গ্রাম জুড়ে ছিল নানা স্ক্যান্ডাল।
টিটুবার এই স্বীকারোক্তির পরিণতি হলো ভয়ঙ্কর। এই ঘটনা সারা সালেম জুড়ে শুরু হয় গ্রামবাসীদের ব্যাপক উন্মাদনা। তিনজনকেই জেলে প্রেরণ করা হলো। সালেম গ্রামের চার্চের একজন সদস্য মার্থা কোরিকে যখন ডাইনি অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়, তখন সারা গ্রামের মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বাস করেও হঠাৎই আশেপাশের মানুষ পরস্পরকে সন্দেহ করতে শুরু করলো। খুঁজে খুঁজে ধরে আনা শুরু হলো সেইসব কথিত শয়তানের অনুচরদের। তাদের যখন নিয়ে আসা হলো মেয়েগুলোর কাছে, তাদের অস্থিরতা যেনো আরও বেড়ে গেলো; যেন ভীষণ ত্রাসে ও আতঙ্কে তাদের চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসতে লাগলো, মুখ দিয়ে ফেনা উঠতে লাগলো।
একের পর এক নারীকে ডাইনি বা শয়তানের অনুচর ইত্যাদি অভিযোগে গ্রেফতার করে জেলে ঢোকানো হলো। সব মিলিয়ে ধরা হলো ২০০ জনের মতো নারীকে। এমনকি চার বছরের এক শিশুর বিরুদ্ধেও ডাইনিবিদ্যা চর্চার অভিযোগ আনা হয়। অভিযুক্তদের দিয়ে ভরে যায় জেলখানা। শেষে ব্যাপারটা এমন জায়গায় পৌঁছালো যে, শয়তানের ভয়ে সন্ধ্যের পর রাস্তায় বের হওয়া কার্যত বন্ধ হয়ে গেলো। এমনকি বিড়াল-কুকুর দেখেও মানুষ ভাবতে লাগল ‘ছদ্মবেশী শয়তান’। ‘ডাইনি খোঁজা’ এতোদূর গড়ালো যে, শেষ পর্যন্ত ১৬৯২ সালের ২৭ মে ম্যাসাচুসেটসের প্রশাসক বাধ্য হলেন বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিতে। তদন্তের কাজ চালানোর জন্য একটি বিশেষ উচ্চ পর্যায়ের আদালত বসানো হলো।
প্রথম অভিযোগ আনা হলো ব্রিজেট বিশপ নামের একজন বয়স্ক মহিলার বিরুদ্ধে, যিনি ছিলেন খুবই গল্পবাজ। নানা গাল-গল্পে তিনি গ্রামের ছোটদের মাতিয়ে রাখতেন। তার বিরুদ্ধে ডাইনিবিদ্যা চর্চার অভিযোগের জবাবে তিনি আদালতে জানিয়েছিলেন, তিনি নবজাতক শিশুর মতোই নিষ্পাপ। তবে তার এই বক্তব্য আমলেই নেয়নি কেউ। তাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়। ১০ জুন প্রথম নারী হিসেবে ব্রিজেটের ফাঁসি কার্যকর হয়। এদিকে অভিযুক্ত অবস্থাতেই পাঁচজন কারাগারে মারা যায় যাদের মধ্যে দুজন ছিল দুগ্ধপোষ্য শিশু।
আরও ১৯ জন বন্দীর দীর্ঘদিন বিচার চলার পর আদালত তাদেরকে ডাইনিবিদ্যা অপপ্রয়োগের দায়ে অভিযুক্ত করলো। সমগ্র নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলে সব মিলিয়ে ৩৪ জনকে ডাইনী অভিযোগে চালান করা হলো জেলখানার অন্ধকারে। বন্দীদের অধিকাংশই ছিলেন নারী, অবশ্য সেই দলে সামান্য কয়েকজন পুরুষ সদস্যও ছিলেন। জুলাই মাসে পাচঁজনের, আগস্ট মাসে পাঁচজনের এবং সেপ্টেম্বর মাসে আটজনের ফাঁসি কার্যকর হয়।
আসলে গ্রামের ওই মেয়েগুলো হিস্টেরিয়া আক্রান্ত হয়েছিল বলে ধারণা ইতিহাসবিদদের। কারণ এই রোগে আক্রান্ত হলে মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে নানা রকম উদ্ভট আচরণ করতে থাকে। অনেক সময় এটা গণ হিস্টেরিয়া আকারেও দেখা দিতে পারে। তেমন ঘটনাই ঘটেছিল শুরুতে। সে সময়কার একজন মন্ত্রী কটন ম্যাথার এবং তার বাবা হার্ভার্ড কলেজের প্রেসিডেন্ট ইনক্রিস ম্যাথার এই বিচারের বিরোধিতা করেছিলেন। এক সময় দেখা গেল, এই আদালত অত্যন্ত নির্দয় আচার শুরু করেছে তখন এর প্রতি জনতার সমর্থন ধীরে ধীরে কমতে লাগল।
জনসমর্থন কমতে শুরু করায় ১৬৯৩ সালে গভর্নর ফিপস এই বিশেষ আদালত বন্ধ করে দেন এবং বন্দি বাকি অভিযুক্তদের মুক্তি দেন। সালেম শহরের বিচারগুলো উপনিবেশাধীন আমেরিকার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ কারণ পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে এর প্রভাব ছিল। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, সমাজের উপর চার্চের যে উগ্র ধর্মীয় প্রভাব ও নিষ্ঠুর শাসনব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল সেটা ভেঙে যাওয়া শুরু হয়েছিল এই বিচারের পরবর্তী জনতার উপলব্ধি থেকে। ২০০১ সালে ম্যাসচুসেটসের আইন সভায় সালেম শহরের বিচারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের নির্দোষ ঘোষণা করে আইন পাস করা হয়।






Post a Comment