Odd বাংলা ডেস্ক: সেনাবাহিনীতে পশুপাখিদের ম্যাসকট করার প্রথা শুরু হয়েছিল অষ্টাদশ শতাব্দীতে। ব্রিটিশ আর্মিরা শুরু করেছিল এই প্রথা। বিভিন্ন দেশের বিশেষ ফোর্সগুলোর কাছে কুকুর স্কোয়াড থাকে। এর পাশাপাশি থাকে ঘোড়া, প্রশিক্ষণ দিয়ে ইঁদুরও এই কাজে লাগানো হচ্ছে। এরমধ্যে অন্যতম হচ্ছে এস্ট্রেলিয়ার টাট্টু ঘোড়া সেপ্টিমাস, কানাডার মেরুভালুক জুনো, নিউজিল্যান্ডের কচ্ছপ গাল্লিপোলি।
অতীতে যেমন যুদ্ধে হাতি একজন সৈন্যের ভূমিকা পালন করত তেমনি। কুকুরও একই কাজ করে থাকে। তবে পেঙ্গুইন যে শুধু কাজ করে তা নয়, পদন্নতি পেয়ে একেবারে সেনাবাহিনীতে ব্রিগেডিয়ার হিসেবে আছে। অবাক হলেও এটি একেবারেই বাস্তব ঘটনা।
নরওয়ের সেনাবাহিনীর বিশেষ ইউনিট রয়্যাল নরওয়েজিয়ান গার্ড স্যার নিলস ওলাভ থ্রি নামে একটি পেঙ্গুইনকে এমন স্বীকৃতিই দিয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে একে পদক পরিয়ে সামরিক কায়দায় সম্মান জানানো হয়। এ সময় সারিবদ্ধ সেনাদের মাঝে হেঁটে পেঙ্গুইনটিও যেন প্যারেডে অংশ নেয়। অবশ্য পাখিটিকে স্বীকৃতির কারণ সামরিক কৃতিত্ব নয়, এটি ঐতিহ্যের অংশ। নরওয়ের রাজার নিরাপত্তা দেখভালের দায়িত্বে থাকা রয়্যাল নরওয়েজিয়ান।
গার্ডের মাসকট হলো পেঙ্গুইন। তাই ওই বাহিনীতে বরফপ্রেমী পাখিটির বেশ কদর। স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গ চিড়িয়াখানার বাসিন্দা পেঙ্গুইনটি ২০০৮ সাল থেকেই রয়্যাল নরওয়েজিয়ান গার্ডের সদস্য। তার পদোন্নতি উপলক্ষে এডিনবার্গে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গার্ডের ৫০ সদস্য অংশ নেন।
পেঙ্গুইন নিয়ে এডিনবার্গ চিড়িয়াখানার সঙ্গে নরওয়ের সম্পর্কও বেশ পুরনো। ১৯১৩ সালে নরওয়ের ক্রিশ্চিয়ান সালভেসেন পরিবার এডিনবার্গ চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষকে একটি কিং প্রজাতির পেঙ্গুইন উপহার দেয়। এরপর থেকেই এখানে পেঙ্গুইনের বসবাস। ১৯৭২ সালে নরওয়েজিয়ান গার্ডের মেজর নিলস এজিলেন বাহিনীর তত্ত্বাবধানে পেঙ্গুইন পালন শুরু করেন।
সর্বশেষ নিলস ওলাফ তৃতীয় পেল ব্রিগেডিয়ার খেতাব। এ ব্যাপারে নরওয়েজিয়ান গার্ডের ব্রিগেডিয়ার ডেভিড অলফ্রেই বলেন, এমন স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে স্কটল্যান্ড ও নরওয়ের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেবে। চলুন এর পেছনের ইতিহাস জেনে নেয়া যাক-
লার্স ক্রিশ্চিয়ানসেন ছিলেন নরওয়ের এক ধনকুবের জাহাজের মালিক ও তিমি শিকারি। আন্টার্কতীকা মহাদেশ ও তার প্রাণিজগত নিয়েও অসীম উৎসাহ। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে তিনি একটি অদ্ভুত পরিকল্পনা করেন। উত্তর গোলার্ধের নরওয়েতে পেঙ্গুইনের একটি বাণিজ্যিক খামার গড়বেন। কিন্তু পেঙ্গুইন কিন্তু দক্ষিণ গোলার্ধের প্রাণী।
আন্টার্কটিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, নামিবিয়া, গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, চিলির নির্জন সৈকতে বাস করে প্রায় ১৮ টি প্রজাতির পেঙ্গুইন। অ্যাডেলি পেঙ্গুইন, আফ্রিকান জ্যাকঅ্যাস পেঙ্গুইন, চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইন, গ্যালাপাগোস পেঙ্গুইন, জেন্টু পেঙ্গুইন সহ নামা নামের এবং জাতের পেঙ্গুইন রয়েছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে উন্নত সেরা দুটি প্রজাতি হচ্ছে এম্পেয়রর এবং কিং পেঙ্গুইন। জাহাজে করে ক্রিশ্চিয়ান কিছু পেঙ্গুইন নিয়ে আসেন নরওয়েতে। তার অবশ্য পেঙ্গুইন লালন পালন করার ইচ্ছা ছিল না। তার উদ্দেশ্য ছিল পেঙ্গুইনের মাংস বিক্রি করা। তবে ভিন্ন পরিবেশে এসে পেঙ্গুইনগুলো আর বাঁচে নি।
এদিকে লার্স ক্রিশ্চিয়ান যখন পেঙ্গুইনের মাংস বিক্রি করে বড়লোক হওয়ার দিবাস্বপ্ন দেখছেন। সেই সময় তার ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিশ্চিয়ান সালভিসেন উত্তর গোলার্ধকে পেঙ্গুইন্দের বাসভূমি করার চেষ্টা করছেন। সালভিসেন চেয়েছিলেন নরওয়েকে পেঙ্গুইনদের বসবাসের উপযোগী করে তোলা। তার মনে হয়েছিল নরওয়ে পেঙ্গুইনদের বসবাসের উপযুক্ত এক জায়গা হতে পারে। কেননা এখানে হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডার পাশাপাশি রয়েছে বরফে ঢাকা সৈকত, সমুদ্রে পর্যাপ্ত খাবার। সেই মতো কিছু পেঙ্গুইন তিনিও এনেছিলেন। কিন্তু বাঁচানো যায়নি এবারো। ১৯১১ সালে মৃত্যুর আগে দুই ছেলেকে এই ইচ্ছার কথা জানিয়ে গিয়েছিলেন সালভিসেন।
বাবার মৃত্যুর পর দুই ভাই কোম্পানির মালিক হন। মাঝে মাঝেই কাজের জন্য তাদের এডেনবার্গে যেতে হত। এবার তারা তাদের বাবার স্বপ্ন পূরণের পথ খুঁজে পেয়েছিলেন। স্কটল্যান্ডের এডেনবার্গের করস্টরফিনের পাহাড়ি এলাকায় তারা একটি চিড়িয়াখানা তৈরি করা হচ্ছিল। রাশিয়ার ভাল্লুক, বাঘ, পাণ্ডা, কোয়ালা, শিপাঞ্জিসহ বিভিন্ন ধরনের পশুপাখি ছিল সেখানে। বিশাল ব্যবসা সামলানোর পাশাপাশি বাবার স্বপ্ন পূরণেও কাজ করে যাচ্ছিল দুই ভাই থমাস ও ফ্রেডরিক। সেখানে তারা একটি পেঙ্গুইন উপহার দেয়ন। জলাশয়ে পাথর দিয়ে তৈরি করা হয় দ্বীপ। মান দেওয়া হয় রক আইল্যান্ড। দক্ষিণ গোলার্ধের প্রাণীটিকে বাঁচাতে সব্রকম চেষ্টা করেছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ।
সালভিসেনদের জাহাজে করে আসতে থাকে নানা প্রজাতির পেঙ্গুইন। এটিই পৃথিবীর প্রথম চিড়িয়াখানা যেখানে সফলভাবে পেঙ্গুইনদের প্রজনন ঘটাতে পেরেছিল। ১৯১৯ সালে দক্ষিণ গোলার্ধের বাইরে জন্ম নিয়েছিল প্রথম পেঙ্গুইন শাবক। কিন্তু প্রশ্ন হলো সেনাবাহিনীতে পেঙ্গুইনরা কীভাবে এলো? তারও এক লম্বা গল্প রয়েছে। ১৯৬১ সালে কিংস গার্ডের লেফটেন্যান্ট নিলস ইগ্লিয়েন দল নিয়ে কুচকাওয়াজে এসেছিলেন। কিংস গার্ড হচ্ছে নরওয়ের রাজাদের দেহরক্ষী বাহিনী। তারা একে বলে হ্যান্স ম্যাজেস্টেট কনজেনস গার্ড। আর বিশ্বে এটি পরিচিত কিংস গার্ড নামে।
কুচকাওয়াজে অংশ নেয়ার সেই সময় তিনি এডেনবার্গের এই চিড়িয়াখানায় বেড়াতে আসেন। পেঙ্গুইনদের কলোনি দেখে মুগ্ধ হন নিলস। চিড়িয়াখানার কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন এই পেঙ্গুইনদের সঙ্গে মিশে আছে নরওয়ে ও ক্রিশ্চিয়ান সালভিসেনের স্বপ্ন। নিলস কিংস গার্ডের পক্ষ থেকে একটি পেঙ্গুইন দত্তক নেয়ার ব্যবস্থা করেন। সেটি ছিল কিং প্রজাতির একটি পেঙ্গুইন। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ পেঙ্গুইন এটি। দক্ষিণ আটলান্টিক এবং দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের বিভিন্ন দ্বীপপুঞ্জে এদের বসবাস। এদের মূল খাদ্য ছোট মাছ, স্কুইড ও ক্রিল জাতীয় চিংড়ি। খাবারের খোঁজে এরা সমুদ্রের ৩০০ থেকে এক হাজার ফুট গভীর পর্যন্ত ডুব দিতে পারে।
কিংস গার্ডে এসে এর নাম রাখা হয় নিলস ওলাফ। নিলস ইগ্লিয়েন ও তৎকালীন স্কটল্যান্ডের রাজা পঞ্চম ওলাফের নাএর সঙ্গে মিলিয়ে এই নাম রাখা হয়। ১৯৭২ সাল থেকে সরাসরি সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত হয় পেঙ্গুইনটি। এত বছর চিড়িয়াখানাতেই ছিল সে। তবে এবারও তাকে কোথাও যেতে হবে না। চিড়িয়াখানাতেই থাকবে। এখানেই মাসে মাসে তার বেতন পৌঁছে যাবে। নিলস ওলাফের ডান দিকের ডানায় বেঁধে দেওয়া হয় ল্যান্স কর্পোরালের পদক। এরপর যতবার কিংস গার্ডের বাহিনী চিড়িয়াখানায় এসেছে ততবারই নিলস অলাফের পদন্নতি হয়েছে। ১৯৮২ সালে কর্পোরাল এবং ১৯৮৭ সালে সার্জেন্ট পদ পায় পেঙ্গুইনটি। সার্জেন্ট হওয়ার কিছুদিন পরই মারা যায় সে।
এরপর দুই বছরের একটি কিং প্রজাতির পেঙ্গুইন শাবককে আবার নিযুক্ত করা হয়। এর নাম হয় দ্বিতীয় নিলস ওলাফ। ১৯৯৩ সালে রেজিমেন্টাল সার্জেন্ট, ২০০১ সালে অনারেবল রেজিমেন্টাল সার্জেন্ট মেজর, ২০০৫ সালে কিংস গার্ডের কর্ণেল- ইন-চিফ হয়েছিল দ্বিতীয় নিলস ওলাফ।
২০০৫ সালে এডিনবার্গ চিড়িয়াখানায় তার একটি স্ট্যাচু তৈরি করা হয়েছিল। চার ফুট উচ্চতার স্ট্যাচুটি ছিল ব্রোঞ্জের তৈরি। একই রকম আরো একটি স্ট্যাচু বসানো হয় কিংস গার্ডের সদর দফতরে। বেদির গায়ে লেখা ছিল নিলস ওলাফের ইতিহাস।
২০০৮ সালে দ্বিতীয় নিলস ওলাফ পেয়েছিল তার সর্বোচ্চ সম্মান। এক বর্নাঢ্য আয়োজনে রাজা পঞ্চম হ্যারল্ড দ্বিতীয় নিলস ওলাফকে ভূষিত করেন নাইটহুড সম্মানে প্রথা মেনে পেঙ্গুইন্টি লাল কার্পেটে হেঁটে ঠোঁট দিয়ে কামড়ে তার তরবারিও গ্রহণ করেছিল। তার নাম হয় স্যার নিলস অলাফ। তার সামনে পড়া হয় প্রশস্তিপত্র। সেখানে লেখা ছিল নিলস ওলাফ সব দিক থেকেই সম্মান ও মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য। এর কিছু দিন পর মারা যায় দ্বিতীয় নলস ওলাফ।
২০১৬ সালে আরেকটি পেঙ্গুইনকে নিযুক্ত করা হয় কিংস গার্ডে। সে বছরের ২২ আগস্ট স্যার তৃতীয় নিলস ওলাফের অবিশ্বাস্য পদন্নতি হয়। পেঙ্গুইনটি হয়ে যায় নরওয়ে সেনার ব্রিগেডিয়ার। নরওয়ে সেনাদের ব্যান্ডের তালে তালে ব্রিগেডিয়ারের মতোই হাঁটতে হাঁটতে অভিবাদন গ্রহণ করেছিল সে।





Post a Comment