Odd বাংলা ডেস্ক: অল্টারনেটিং কারেন্ট শুনেই মাথায় আসবে এর আবিষ্কারক নিকোলা টেসলারের কথা। পৃথিবীর ইতিহাসে যে কয়েকজন মানুষের হাতে বদলে গেছে মানব সভ্যতা তার মধ্যে অন্যতম টেসলা। নিকোলা টেসলাকে বলা হয় আধুনিক সময়ের ‘দ্য ভিঞ্চি’। একাধারে বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক, ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা এবং পদার্থবিদ, ইঞ্জিনিয়ার নিকোলা টেসলা।
টেসলা জন্মগ্রহণ করেন ১৮৫৬ সালের জুলাই এর ১ তারিখে, ক্রোয়েশিয়ার একটি গ্রামে। তিনি মূলত একজন সার্বিয়ান-আমেরিকান। তিনি একাধারে একজন প্রকৌশলী, আবিষ্কারক এবং পদার্থবিদ। টেসলা মূলত দিক পরিবর্তী বা পর্যায়ক্রমিক বিদ্যুৎ প্রবাহে তার অবদানের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। কিন্তু টেসলার জন্ম হয় প্রচণ্ড ঝড় ও বজ্রপাতের রাতে। এরকম ঘটনাকে অশুভ সংকেত মনে করে সেই সময়ে ধাত্রী টেসলাকে ‘ডার্ক চাইল্ড’ বা‘অন্ধকারের সন্তান’ বলেন। কিন্তু এতে টেসলার মা অপমানিত বোধ করে এর বিরোধিতা করে বলেন, টেসলা হবে ‘চাইল্ড অব লাইট’বা‘আলোর সন্তান’টেসলার মায়ের সেই ভবিষ্যৎ বাণী যে কতটা কার্যকর ছিল তা নিশ্চয়ই আর বলার অপেক্ষা রাখে না !
১৮ শতকের শেষের দিকে। মঞ্চের উপরে দাঁড়িয়ে একজন লম্বা, সুপুরুষ ব্যক্তি। জাদুকরের ভঙ্গিতে একবার মাথার হ্যাটটা খুলে দর্শকদের অভিবাদন জানালেন। তারপর দুহাতে দুটো তামার গোলক তুলে নিয়ে এগিয়ে গেলেন ইলেকট্রিক ট্রান্সফর্মারের দিকে। দুটি তড়িৎদ্বারে বসিয়ে দিলেন দুটি বল। তখনও মানুষটির শরীর ছুঁয়ে আছে গোলকদুটি। তার শরীর দিয়ে ছুটে গেল ২৫০ কিলোভোল্টের বিদ্যুৎ। হ্যাঁ, ২৫০ কিলোভোল্ট। অর্থাৎ আমাদের বাড়ির বিদ্যুতের লাইনের ৭৮১ গুণ। সংবাদপত্রের বর্ণনায় লেখা হয়েছিল, মানুষটির শরীরের উপর দিয়ে তখন যেন একটা আগুনের শিখা বয়ে গেল। তবে মুহূর্তের জন্যই। তারপর আবার সব আগের মতো।
না, মঞ্চের উপরে সেই মানুষটি কোনো জাদুকর ছিলেন না। তিনি পদার্থবিদ্যার কিংবদন্তি নিকোলা টেসলা। কিন্তু কেন এমন জীবন বাজি রাখা খেলা দেখিয়েছিলেন তিনি? তার কারণ পদার্থবিদ্যার জগতে এক বিখ্যাত যুদ্ধ। দুই কিংবদন্তির যুদ্ধ। একদিকে নিকোলা টেসলা এবং অন্যদিকে টমাস এডিসন। একদিকে এ.সি. অর্থাৎ অল্টারনেটিভ কারেন্ট, আর অন্যদিকে ডি.সি. অর্থাৎ ডিরেক্ট কারেন্ট। অল্টারনেট কারেন্টের প্রচলনে যেন বেশ খানিকটা পিছনে সরে গিয়েছিলেন এডিসন। তখন তিনি এই যুক্তির উপর প্রচার চালাতে থাকেন যে, অল্টারনেটিভ কারেন্ট নিরাপদ নয়। এর থেকে নানা দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। সেই যুক্তিকে প্রতিহত করতেই জীবন বাজি রেখে মঞ্চে নেমেছিলেন টেসলা।
তবে এই দ্বন্দ্বের শুরু কিন্তু আরও আগে। তখন টেসলা সদ্য পড়ালেখা শেষ করে গবেষণার কাজে যোগ দিয়েছেন। বিদ্যুৎ সংক্রান্ত গবেষণায় তখন এডিসনের প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ নেই। টেসলা যোগ দিলেন এডিসনের কোম্পানিতেই। কিন্তু তার ইচ্ছা ছিল স্বয়ং এডিসনের সঙ্গে এক ল্যাবরেটরিতে গবেষণা করবেন তিনি। সেই সুযোগও এসে গেল। ১৮৮৪ সালে টেসলা চললেন আমেরিকা। এডিসন তখন তার জেনারেটর ইঞ্জিন নিয়ে খানিকটা চিন্তিত। একে কীভাবে আরও উন্নত করে তোলা যায়, সেটাই ভাবছেন। টেসলাকে পেয়ে তিনি বললেন, টেসলা যদি এই কাজে সফল হতে পারেন, তাহলে এডিসন তাকে ৫০ হাজার ডলার পুরস্কার দেবেন। টেসলাও প্রাণপণ কাজ শুরু করলেন। অবশ্য টাকার জন্য নয়। আবিষ্কারের নেশাতেই সময় কেটে যাচ্ছিল তার। আর অবশেষে মিলল সাফল্যও। কিন্তু না, প্রতিশ্রুতি রাখলেন না এডিসন। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, তিনি তো তখন মজা করেছিলেন। আসলে টেসলা একজন দক্ষ কর্মচারীর কাজ করেছেন। এর ফলে বড়জোর আগামীদিনে তার কাজের স্থায়িত্ব নিয়ে ভাবা যেতে পারে।
সেইদিনই টেসলা ঠিক করে নিয়েছিলেন, আর এখানে নয়। বহু কষ্টে অর্থ সংগ্রহ করে নিজেই তৈরি করে ফেলেছিলেন একটি ল্যাবরেটরি। আর সেখানেই আবিষ্কার করে ফেললেন এ.সি. কারেন্ট। যুদ্ধের পরিণতি শেষ পর্যন্ত কিছুই হল না যদিও। সব মিলিয়ে ঠিক হল, সস্তা বিদ্যুতের উৎস হিসেবে এ.সি. কারেন্ট ব্যবহার করা হবে। তবে বিপজ্জনক কাজে ডি.সি. কারেন্টই ব্যবহার করা হবে। যদিও শেষ পর্যন্ত সহজ সহজ বন্টন ব্যবস্থার সুবাদে এ.সি. কারেন্টই জিতে গিয়েছিল। তবে টেসলার আবিষ্কারের অনেক সম্ভাবনাই তখন উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
টেসলা প্রাকৃতিক সম্পদের দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়া নিয়ে বেশ সোচ্চার ছিলেন এবং পুনরায় ব্যবহারযোগ্য জ্বালানীর সমর্থক ছিলেন। তাছাড়া তিনি কীভাবে প্রাকৃতিক শক্তি ব্যবহার করে জীবাশ্ম জ্বালানীর উপর থেকে চাপ কমানো যায় সেই বিষয়েও বহু গবেষণা করেছেন। এমনকি তিনি তার জিনের ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম বীজ তৈরি করার মতোও সফল গবেষণাও তার রয়েছে।
টেসলা তার সব চমৎকার উদ্ভাবনী চিন্তা বাস্তবে রূপান্তর করে যেতে পারেননি। তিনি ওয়্যারলেস পাওয়ার ট্রান্সমিশন নিয়ে বহু গবেষণা করেন। সেই ১৯০১ সালেই তিনি এসবের কথা চিন্তা করেন যার সুফল আমরা এখন ভোগ করছি। তিনি রেডিও জ্যোতির্বিদ্যার ক্ষেত্রে ‘ডেথ-রে’নামক একটা কণার কথা চিন্তা করেন যার বাস্তব কোন রূপ তিনি দিয়ে যেতে পারেননি।
আমাদের জীবনে ইন্টারনেট আর ওয়াই-ফাই এখন এক ছন্দ। এক মুহুর্ত এই ছন্দপতন আমরা মানতে পারি না। জানেন কি, এই ওয়াই-ফাই প্রযুক্তি ধারণা দেন সর্বপ্রথম নিকোলা টেসলা? ১৯০৪ সালে টেসলা লং আইসল্যান্ডে গড়ে তোলেন বিশাল টাওয়ার শুধুমাত্র তারবিহীন সঙ্কেত আদান প্রদানের জন্য। তার মৃত্যুর অনেক বছর পর টেসলার গবেষণার উপর ভিত্তি করে ওয়াই-ফাই তৈরি করা হয়। নিকোলা টেসলার এই অবদানের জন্য সিলিকন ভ্যালিতে তার একটি মূর্তি তৈরি করা রয়েছে যেখান থেকে ফ্রি ওয়াই-ফাই সুবিধা দেওয়া হয়।
জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন গবেষণায়, কল্পনা আর ভাবনা জুড়ে। তথ্য মতে, সারা পৃথিবীতে ২৬টি দেশে ৩০০ এর বেশি পেটেন্ট রয়েছে নিকোলা টেসলার নামে। যেহেতু তিনি ফটোগ্রাফিক মেমোরির অধিকারী ছিলেন তাই তার অনেক কাজ খুঁজে পাওয়া যায়নি কাগজে। নিকোলা টেসলা এক্সরের আধুনিকায়নে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন। যার জন্য এক্সরে এতটা সহজলভ্য আজ।
তার অন্যান্য কাজের মাঝে রয়েছে ব্লেড ব্যাতীত টারবাইন। তার আরেকটি বড় কাজ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র–কানাডার যৌথ উদ্যোগে তৈরি নায়েগ্রা জলপ্রপাতের উপর বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণে ইঞ্জিনিয়ারিং সহায়তা প্রদান করা এবং তার হাত ধরেই নায়াগ্রা জলপ্রপাত থেকে এসি কারেন্ট ছড়িয়ে পড়ে আমেরিকায়।
৮৬ বছর বয়সে জানুয়ারি ৭, ১৯৪৩ সালে নিউইয়র্ক হোটেলের ৩৩২৭ নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা যান টেসলা। অবিবাহিত অবস্থায় মারা যান। তিনি তার জীবনের শেষ ১০ টি বছর কাটান হোটেল নিউ ইয়র্কের ৩৩২৭ নম্বর রুমে। তার মরদেহ এই রুম থেকেই উদ্ধার করা হয় পরে। তার জীবনের উপর ভিত্তি করে বহু উপন্যাস লেখা আর সিনেমা বানানো হয়েছে। ১৯৬৩ সালে তড়িৎ চৌম্বক ক্ষেত্রের একক হিসেবে ‘টেসলা’ কে এস আই ইউনিটে আন্তর্জাতিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়।






Post a Comment