Odd বাংলা ডেস্ক: মহামারির কারণে এবারও রথযাত্রার কোনো আয়োজন ছিল না। সনাতম ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান উৎসব রথযাত্রা। এতে রথের ওপর দেবতাদের মূর্তি স্থাপন করে রথ চালানো হয়। বিভিন্ন পুরাণে বিভিন্ন দেবদেবীর রথযাত্রার উল্লেখ আছে, যেমন: ভবিষ্যপুরাণে সূর্যদেবের রথযাত্রা, দেবীপুরাণে মহাদেবীর রথযাত্রা, পদ্মপুরাণ, স্কন্দপুরাণ ও ভবিষ্যোত্তরপুরাণে বিষ্ণুর রথাযাত্রা বর্ণিত হয়েছে।
বিভিন্ন দেবদেবীর রথযাত্রার সময়কালও বিভিন্ন; কোথাও বৈশাখ মাসে, কোথাও আষাঢ় মাসে, আবার কোথাও কার্তিক মাসে রথযাত্রার অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। এই অনুষ্ঠান হয় আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে, আর একাদশী তিথিতে হয় প্রত্যাবর্তন বা ফিরতি রথ। অর্থাৎ রথটি প্রথম দিন যেখান থেকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়, আটদিন পরে আবার সেখানেই এনে রাখা হয়। একেই বলে উল্টা রথ। ঐতিহাসিক তথ্য মতে ৮০০ বছর আগেও পুরীর রথযাত্রা প্রচলিত ছিল।
রঘুনন্দনের দ্বাদশ যাত্রাতত্ত্বের ভাষ্য অনুযায়ী, ভগবান বিষ্ণুর উদ্দেশে মাসে মাসে যে অনুষ্ঠান হয়, তাকেই যাত্রা বলে। বৈশাখ থেকে চৈত্র এই বারোটি যাত্রার নাম - চন্দনী, স্নাপনী, রথ, শয়নী, দক্ষিণপার্শ্বীয়া, বামপার্শ্বীয়া, উত্থানী, ছাদনী, পুষ্যাভিষেক, শাল্যোদনী, দোল আর মদনভঞ্জিকা। এর মধ্যে রথের এক আলাদা গুরুত্ব। ‘রথেতু বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে’। রথে জগন্নাথকে দেখলে নাকি আর জন্মাতে হয় না। উড়িষ্যায় মহা ধুমধামে তাই প্রতি বছর এই রথযাত্রা হয়, আর ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা রথের রশি টানতে সামিল হন সেই উৎসবে। উৎসবে পান্ডারা নিজেদের বুক বেঁধে নেন গামছা দিয়ে। গোপিনীদের মতো। জগন্নাথের কোমর বাঁধা হয় পট্টভোয়ী নামের এক কাপড়ে। তারপর শুরু হয় শ্রীমন্দির থেকে গুন্ডিচাবাড়ি অবধি রথযাত্রা। তিনজনের তিন রথ। শ্রী বলরামের তালধ্বজ, শ্রীসুভদ্রা আর শ্রী সুদর্শনের বিজয়া রথ, আর সব শেষে শ্রীজগন্নাথের নন্দি ঘোষ রথ। এই গুন্ডিচা বাড়ির নীলাচলেই প্রভূর মন্দির। শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতেও লেখা, “বাহির হইতে করে রথযাত্রা ছল/সুন্দরাচল যায় প্রভু ছাড়ি নীলাচল”।
আমরা বাংলার মানুষ রথযাত্রা বলতে এই জগন্নাথদেবের রথযাত্রাই বুঝি। কিন্তু আদতে হিন্দু ধর্মের পুরাণে বহু প্রাচীন কিছু রথযাত্রার উল্লেখ পাই। তাদের বেশ কিছু এখনও প্রচলিত। বাকিরা হারিয়ে গেছে চিরতরে। পুরোনো পুঁথিপত্রে মাত্র তাদের উল্লেখ পাওয়া যায়।
ভবিষ্যপুরাণে সূর্যের রথযাত্রার কথা আছে। মাঘ মাসের শুক্লা সপ্তমী তিথিতে এই রথযাত্রা হত। তার আগের রাতে রথের সামনে যজ্ঞ করতে হত। এখানে রথে চাপতেন সূর্য সহ ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও অন্য দেবতারা। পদ্মপুরাণে আবার পাওয়া যায় বিষ্ণুর রথযাত্রার উল্লেখ। কার্তিকের শুক্লা দ্বাদশীতে রাত্রে রথ স্থাপন করে পরদিন তাকে পুরভ্রমণ করাতে হয়। পুরাণমতে প্রহ্লাদ নাকি প্রথম এই রথ টানেন। একাম্রপুরাণ মতে শিবের রথযাত্রার নাম অশোকা মহাযাত্রা। চৈত্র মাসের শুক্লাষ্টমীতে এই রথ টানা হয়। রথের সারথি হন ব্রহ্মা। সেই “রথখানি বর্ণে শুভ্র, চারিখানি চক্র, উচ্চতা একুশ হাত এবং মণ্ডল ষোলো হাত পরিমিত হয়। তোরণ চতুষ্টয়ে চারিটি সুবর্ণ কলস থাকিবে।” দেবীপুরাণে স্বয়ং দেবীর রথযাত্রার কথা বলা হয়েছে। এতে কার্তিকের শুক্লা তৃতীয়াতে রথ স্থাপন করে রথের সামনে বলি দিতে হয়। রথের বেতালদের উদ্দেশ্যেও বলির নিয়ম আছে। অবশ্য পুরভ্রমণ অন্য রথের মতোই।
দক্ষিণ ভারতেও একাধিক রথযাত্রা উৎসব প্রচলিত ছিল। সেরিঙ্গোপত্তনের ১৪শ শতাব্দীতে এক রথযাত্রা হত। সেখানে রথে থাকত সিংহ মুর্তি। পুরভ্রমণ সময়কালে মন্দির থেকে বিষ্ণুকে এনে রথে স্থাপন করা হত। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের আগে থেকে মাদ্রাজে এক রথযাত্রা প্রচলিত ছিল। এখানেও দেবতা বিষ্ণু। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় দক্ষিণ ভারতেরই কুম্ভোকনমের রথযাত্রাতে এখানে কোনো দেবতা থাকেন না। মন্দিরের প্রধান পুরোহিতকে সাজিয়ে গুজিয়ে রথে বসিয়ে টানা হয়। বহুলোকে পুরোহিতকে টেনে এক বিরাট দিঘি সামনে নিয়ে তার স্নান ও পূজা করেন। দেওয়া হয় নানা ভেট। এ প্রথাও প্রায় ৭০০ বছরের পুরোনো।
এ তো গেল ভারতবর্ষের কথা। ইউরোপে সিসিলিতে মেরিকে দেবী রূপে পুজা করে এক রথযাত্রা হয়। এই উৎসবকে বলা হয় মেরীর রথযাত্রা। দেখতে অবিকল সূর্যের রথের মতো। রথের নিচ থেকে উপর ঢাকা থাকে সূর্য, চন্দ্র, নানা গ্রহের প্রতিকৃতি দিয়ে। মানুষ ছাড়াও বহু মহিষ এই রথ টানে। বহুকাল আগে ধারণা ছিল, এই রথের চাকার নিচে সন্তানকে বলি দিলে সেই সন্তান ও তার পিতামাতা স্বর্গে যায়। ফলে এককালে অনেক শিশু এই উপায়ে প্রাণ হারাতো। ফেলিনির সিনেমায় এই রথ টানার দৃশ্য আছে।
নেপালের কুমারী যাত্রা নামে এক রথযাত্রা হয়। কথিত আছে, রাজা জয়প্রকাশ মল্ল এক কুমারীর অবমাননা করেন। পরে তার শাপে রানি অসুস্থ হয়ে পড়লে ভয়ে তিনি কুমারীকে রথে করে নিয়ে এসে পূজা করেন। এখনও কুমারী পূজায় সাত বছরের এক কুমারী মেয়েকে একা একটা অন্ধকার ঘরে ছেড়ে দেওয়া হয়। সে ভয় না পেলে তাকে সবাই দেবী মেনে পূজা করে ও রথে পুরভ্রমণ করায়। এছাড়াও নেপালে পয়লা বৈশাখ ভৈরব যাত্রা আর শুক্লা চতুর্দশীতে নেত্রাদেবীকে নিয়ে দেবীযাত্রা নামে দুটি রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। জাপানে বুদ্ধপূর্ণিমায় বুদ্ধকে রথে বসিয়ে বাচ্চারা টেনে নিয়ে যায়। এ প্রথাও প্রায় ১০০০ বছরের পুরোনো।
এই প্রসঙ্গে আমাদের বাংলার মাহেশের রথ নিয়ে কিছু না বললেই নয়। "রাধারাণী নামে এক বালিকা মাহেশে রথ দেখিতে গিয়াছিল। বালিকার বয়স একাদশ পরিপূর্ণ হয় নাই। তাহাদিগের অবস্থা পূৰ্ব্বে ভাল ছিল—বড়মানুষের মেয়ে। কিন্তু তাহার পিতা নাই; তাহার মাতার সঙ্গে এক জন জ্ঞাতির একটি মোকদ্দমা হয়; সৰ্ব্বস্ব লইয়া মোকদ্দমা; মোকদ্দমাটি বিধবা হাইকোর্টে হারিল… রথের দিন তাহার মা একটু বিশেষ হইল, পথ্যের প্রয়োজন হইল, কিন্তু পথ্য কোথা? কি দিবে? রাধারাণী কাঁদিতে কাঁদিতে কতকগুলো বনফুল তুলিয়া তাহার মালা গাথিল। মনে করিল যে, এই মালা রথের হাটে বিক্রয় করিয়া দুই একটি পয়সা পাইব, তাহাতেই মার পথ্য হইবে। - কিন্তু রথের টান অৰ্দ্ধেক হইতে ন হইতেই বড় বৃষ্টি আরম্ভ হইল। বৃষ্টি দেখিয়া লোক সকল ভাঙ্গিয়া গেল। মালা কেহ কিনিল না। রাধারাণী মনে করিল যে, আমি একটু না হয় ভিজিলাম-বৃষ্টি থামিলেই আবার লোক জমিবে। কিন্তু বৃষ্টি আর থামিল না। লোক আর জমিল না। সন্ধ্যা হইল—রাত্রি হইল—বড় অন্ধকার হইল—অগত্যা রাধারাণী কাঁদিতে কাঁদিতে ফিরিল।” বঙ্কিমচন্দ্রের রাধারাণীর শুরুতেই মাহেশের রথের কথা। যতই পুরীকে জগন্নাথদেবের ধাম বলুক না কেন, আপামর বাঙালির পঞ্জিকায় সেই প্রথম থেকেই কিন্তু পুরীর রথ ঠাঁই পায় নি। পেয়েছে মাহেশের রথ।
চতুর্দশ শতকে ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী নামে এক বাঙালি সাধু পুরীতে তীর্থ করতে গিয়েছিলেন। তার ইচ্ছা হয়েছিল যে তিনি জগন্নাথদেবকে নিজের হাতে ভোগ রেঁধে খাওয়াবেন। কিন্তু পুরীর মন্দিরের পাণ্ডারা বাধ সাধায় তিনি তা করতে পারলেন না। তখন দুঃখিত হয়ে তিনি আমরণ অনশনে বসলেন। তিন দিন পরে জগন্নাথদেব তাকে দেখা দিয়ে বললেন, "ধ্রুবানন্দ, বঙ্গদেশে ফিরে যাও। সেখানে ভাগীরথী নদীর তীরে মাহেশ নামেতে এক গ্রাম আছে। সেখানে যাও। আমি সেখানে একটি বিরাট দারুব্রহ্ম (নিম গাছের কাণ্ড) পাঠিয়ে দেব। সেই কাঠে বলরাম, সুভদ্রা আর আমার মূর্তি গড়ে পূজা করো। আমি তোমার হাতে ভোগ খাওয়ার জন্য উদগ্রীব।" এই স্বপ্ন দেখে ধ্রুবানন্দ মাহেশে এসে সাধনা শুরু করলেন। তারপর এক বর্ষার দিনে মাহেশ ঘাটে একটি নিমকাঠ ভেসে এল। তিনি জল থেকে সেই কাঠ তুলে তিন দেবতার মূর্তি বানিয়ে মন্দির প্রতিষ্ঠা করলেন।
মাহেশের রথযাত্রা ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীনতম (পুরীর রথযাত্রার পরেই) এবং বাংলার প্রাচীনতম রথযাত্রা উৎসব। এই উৎসব ১৩৯৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এটি শ্রীরামপুর শহরের মাহেশে হয়। রথযাত্রার সময় মাহেশে এক মাস ধরে মেলা চলে। শ্রীরামপুরের মাহেশ জগন্নাথ মন্দির থেকে শ্রীরামপুরের গুন্ডিচা মন্দির (মাসির বাড়ি) অবধি জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিশাল রথটি টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। উল্টোরথের দিন আবার রথটিকে জগন্নাথ মন্দিরে ফিরিয়ে আনা হয়। “এই যাত্রা দর্শনার্থে অনেক অনেক তামসিক লোক আবাল বৃদ্ধ বণিতা আসিবেন। ইহাতে শ্রীরামপুর ও চাতরা ও বল্লভপুর ও আকনা ও মাহেশ ও রিসড়া এই কএক গ্রাম লোকেতে পরিপূর্ণ হয় এবং পূর্বদিন রাত্রিতে কলিকাতা ও চুঁচুঁড়া ও ফরাসডাঙ্গা প্রভৃতি শহর ও তন্নিকটবর্তী গ্রাম হইতে বজরা ও পিনিস ও ভাউলে এবং আর আর নৌকাতে অনেক ধনবান লোকেরা নানাপ্রকার গান ও বাদ্য ও নাচ ও অন্য অন্য প্রকার ঐহিক সুখসাধন সামগ্রীতে বেষ্টিত হইয়া আইসেন পরদিন দুই প্রহরের মধ্যে জগন্নাথদেবের স্নান হয় সেখানে প্রায় তিন চার লক্ষ লোক একএ দাঁড়াইয়া স্নান দর্শন করে।”
তবে বেজায় ঝড়ঝাপটাও গেছে এই রথের উপর দিয়ে। ১৮৩৫ থেকে ১৮৫৬ র মধ্যে তিনবার রথ তৈরি করতে হয়। একবার রথে একজন গলায় দড়ি দেয়, ফলে রথ অপবিত্র হয়, আর একবার কাঠের রথ আগুনে ভস্মীভূত হয়ে যায়। এখন যে রথ দেখি, সেটা লোহার। মার্টিন বার্ন কোম্পানির তৈরি। ব্রজেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের সংবাদপত্রে সেকালের কথা বইতে এই মাহেশের রথ নিয়ে নানা অদ্ভুত এবং প্রায় ছবির মতো বর্ণনা পাওয়া যায়। একজন মাহেশের মেলায় জুয়া খেলে বউ পর্যন্ত বিক্রি করতে গেছিলেন এইখবরও দেখা যায়।
"অনেক অনেক স্থানে রথযাত্রা হইয়া থাকে কিন্তু তাহার মধ্যে জগন্নাথক্ষেত্রে যেরূপ সমারোহ ও লোকযাত্রা হয় মোং মাহেশের রথযাত্রাতে তাহার বিস্তার ন্যূন নহে এখানে প্রথম দিনে এক দুই লক্ষ লোক দর্শনার্থে আইসে এবং প্রথম রথ অবধি শেষ রথ পর্যন্ত নয়দিন জগন্নাথদেব মোং বল্লভপুরে রাধাবল্লভ দেবের ঘরে থাকেন। তাহার নাম গুঞ্জাবাড়ী ঐ নয়দিন মাহেশ গ্রামাবধি রাধাবল্লভপুর পর্যন্ত নানা প্রকার দোকান পসার বসে এবং সেখানে বিস্তর বিস্তর ক্রয় বিক্রয় হয়। ইহার বিশেষ বিশেষ কত লিখা যাইবেক। এমত রথযাত্রার সমারোহ জগন্নাথক্ষেত্র ব্যতিরিক্ত অন্যত্র কুত্রাপি নাই। এবং ঐ যাত্রার সময়ে অনেক স্থান হইতে অনেক অনেক লোক আসিয়া জুয়া খেলা করে ইহাতে কাহারো কাহারো লাভ হয় ও কাহারো কাহারো সর্বনাশ হয়। এইবার স্নানযাত্রার সময়ে দুই জন জুয়া খেলাতে আপন যথাসর্বস্ব হারিয়া পরে অন্য উপায় না দেখিয়া আপন যুবতি স্ত্রী বিক্রয় করিতে উদ্যত হইল এবং তাহার মধ্যে একজন দশ টাকাতে আপন স্ত্রী বিক্রয় করিল। অন্য ব্যক্তির স্ত্রী বিক্রীতা হইতে সম্মতা হইল না তত্প্র যুক্ত ঐ ব্যক্তি খেলার দেনার কারণ কএদ হইল।" (সমাচার দর্পণ, ১৯ জুন, ১৮১৯)।





Post a Comment