যে পথে বাংলায় আগমন ঘটেছিল বখতিয়ার খলজির
ODD বাংলা ডেস্ক: ছোট-বড় ঢিবির মতো দেখতে সেই পথ। এর মধ্যে সবথেকে বড় ঢিবিটিকে আশেপাশের লোক চেনে ষাঁড় বুরুজ নামে। তবে সাধারণভাবে জায়গাটা নওদা বুরুজ বলেও পরিচিত। এখানেই মহানন্দা আর পুনর্ভবা নদী মিলিত হয়েছে। তার কাছেই নওদা গ্রাম। রহনপুর রেল স্টেশনের মোটামুটি এক কিলোমিটার উত্তরে। এই ঢিবির মধ্যেই লুকিয়ে আছে কয়েক হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাস।
খালিচোখে ঢিবিটাকে দেখলেই বোঝা যায়, এর নিচে কোনো ভাঙা অট্টালিকার মতো কিছু লুকিয়ে রয়েছে। জায়গাটির উত্তর ও পূর্ব দিকে দেখা যাবে প্রাচীন কিছু পরিখা। ঢিবি দক্ষিণ দিকটায় একটু নিচু জায়গা। গবেষকদের একটি অংশ মনে করেন যে এই নিচু জায়গাটা দিয়ে একসময় বয়ে যেত পুনর্ভবা নদী। যদিও এখন সেটি পশ্চিম দিকে সরে গেছে।
সেন রাজাদের আমলে নবদ্বীপ ছিল বাংলার রাজধানী। ‘নবদ্বীপ’ কথাটা থেকে যেমন ‘নদিয়া’ নামটা এসেছে, তেমনই এসেছে ‘নওদা’ শব্দটাও। নওদা একসময়ে নবদ্বীপেরই অংশ ছিল। আর ‘বুরুজ’ মানে অট্টালিকা বা গম্বুজ, যা এসেছে আরবি শব্দ ‘বুর্জ’ থেকে। জায়গাটায় রাজা লক্ষ্মণ সেনের প্রাসাদ ছিল বলে অনেক মানুষ বিশ্বাস করেন। লক্ষ্মণ সেনের আমলে রহনপুর বণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিল। কিছু লোক মনে করেন, বাণিজ্যিক কারণেই এখানে তৈরি হয়েছিল অট্টালিকা। যেটা এখন ঢিবির তলায়।
সুলতানি যুগের ইতিহাসবিদ মিনহাজ-ই-সিরাজের লেখা থেকে জানা যায়, তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ারউদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজি বিহার বিজয়ের পর ১৮ জন ঘোড়সওয়ারকে নিয়ে ‘নওদিহ্’ বা নদিয়াতে রাজা লক্ষ্মণ সেনের প্রাসাদে হাজির হন। এ সময় লক্ষ্মণ সেন প্রাসাদের পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যান বিক্রমপুরে।
ইতিহাস গবেষকদের একটা বড়ো অংশ জানিয়েছেন যে মিনহাজের উল্লেখ করা নদিয়ার অবস্থান গঙ্গা, মহানন্দা আর করতোয়ার মাঝখানে। সুতরাং, জায়গাটা যে আসলে এই চাঁপাইনবাবগঞ্জের নওদা, সেটা বহু ইতিহাসবিদই সমর্থন করেন। বখতিয়ার খলজি পাটলিপুত্রের রাজপথ ব্যবহার না করে লুকিয়ে লুকিয়ে রাজমহল পাহাড়ের দক্ষিণে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এসে মুর্শিদাবাদের লালগোলা অঞ্চলের লাগোয়া গঙ্গা পেরিয়ে নওদা আক্রমণ করেছিলেন, এবং কয়েকদিন এখানে থেকেছিলেন বলেই তাদের মত।
তবে ‘ষাঁড় বুরুজ’ নামটা কোথা থেকে এল? জনশ্রুতি অনুযায়ী এক বেগম ষাঁড় পুষেছিলেন, আর সেই ষাঁড়কে সঙ্গে নিয়ে এই জায়গায় মাটি ফেলতেন বলে জায়গাটা উঁচু হয়ে যায়। তবে এই কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
গবেষকরা বলেন, এই জায়গাকে এক সময়ে বলা হত ‘শাহ বুরুজ’। ‘শাহ’ মানে সম্রাট’। সেটা ক্রমে বিকৃত হয়ে ‘ষাঁড় বুরুজ’-এ গিয়ে দাঁড়িয়েছে। নওদা বুরুজ তো বটেই গোটা রহনপুর এলাকাটাতেই প্রাচীন শহরের চিহ্ন রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। নওদা বুরুজে খননকার্য চালিয়ে বুদ্ধ, শিব, বিষ্ণু, সূর্য, গণেশের মূর্তি পাওয়া গেছে। পাওয়া গেছে কারুকার্য করা ইট, পোড়ামাটির ভাস্কর্য, আরবি ভাষা খোদাই করা মুদ্রা। অনেক প্রাচীন কালে এখানে বৌদ্ধ বিহার ছিল, পরে হিন্দু প্রধান অঞ্চলে পরিণত হয়, এবং বখতিয়ার খলজির আক্রমণের পর জায়গাটিতে মুসলিম সংস্কৃতিও ঢুকে পড়ে।





Post a Comment