মইছাড়া : গরুর দৌড় নয়, চাষিদের বর্ষাময় ভালোবাসার ক্ষণ

 


ODD বাংলা ডেস্ক: একজন কৃষক শুধুমাত্র ফসলই চাষ করেন না, চাষ করে তার আনন্দও। তার জীবনের আনন্দ- ভালোবাসা আঁকড়ে থাকে কৃষির মধ্যেই। তাই ফসল ফলানোর মধ্যে আরো উদ্দীপনা জোগাতে গ্রাম-বাংলার কৃষক সমাজে খোঁজ মিলবে নানা উৎসবের। এমনই এক উৎসবের নাম ‘মইছাড়া’। আজকাল খুব একটা চোখে পড়ে না এই উৎসব। তবে একসময় এটি ছিল বাংলার চাষিদের প্রানবন্ত খুনসুটির গল্প।  


বর্ষার মৌসুমে প্রকৃতি যেন নতুনভাবে প্রাণ পায়। প্রকৃতির নির্মল হাসি পৌঁছে যায় চাষিদের মধ্যে। তাইতো বর্ষা এলেই বাংলার চাষিরা মাতেন নব আমেজে। বর্ষায়ই আয়োজন হয় মইছাড়া প্রতিযোগিতার। এই প্রতিযোগিতা আগেকার কৃষক সমাজে দেখা যেত। তবে এ রেওয়াজ বর্তমানে অনেকটাই কমে গেছে। তবে এখনও ভারতে এ প্রথা কিছুটা বেঁচে আছে। আগে পশ্চিমবঙ্গের অনেক গ্রামেগঞ্জেই এই খেলা দেখা যেত।


মইছাড়া গ্রামবাংলার এক প্রাচীন উৎসব। গরু, ষাঁড়ের দৌড় প্রতিযোগিতা। বর্ষায়, চাষের ক্ষেতে গরু, ষাঁড় এনে হাজির করেন মালিকরা। একে একে শুরু হয় তাদের দৌড়। কখনও একসঙ্গে দুটো, কখনও বা চারটে। কোন জোড়া কতো তাড়াতাড়ি ও নিখুঁতভাবে গন্তব্য অতিক্রম করতে পারেন সেই হিসেব রাখেন বিচারকরা। এক বা একাধিক দিন দৌড়ের পর, কোয়ার্টার ফাইনাল-সেমিফাইনাল-ফাইনাল পেরিয়ে, জয়ী ঘোষণা করা হয়। থাকে আকর্ষণীয় পুরস্কার।


জানা যায়, গরুর লেজের ডগায় হাতের মোচড় দেওয়া হয়। ওই মোচড়েই গরু ছোটে। পাগলের মতো ছুটতে থাকে গরু। তবে ছোটো কাঠের টুকরোর ওপর জলভরা কাদা জমিতে গুর ভেজা লেজ আঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকাতে হয় কৃষককে। এ কাজটা বেশ কঠিন। একবার লেজ হাত থেকে ছুটে গেলে বিপদ। গরুও ছোটা বন্ধ করে দেবে। এই খেলায় জিততে হলে গরুর লেজটি ছাড়া চলবে না।  


গ্রাম-বাংলার এরকম অজস্র স্থানীয় খেলা হারিয়ে যেতে বসেছে চর্চার অভাবে। এই মইছাড়া উৎসবের জন্ম আষাঢ় মাসে ধান রোয়ার আগে। ১৮৫০ থেকে ১৯০০ সালের শুরুর দিকে এই খেলা বেশ জনপ্রিয় ছিল। বছরজুড়ে গবাদি পশু প্রস্তুত করা হতো এই দিনগুলোর জন্য। বর্ষা আসার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় দৌড়ের প্রস্তুতি। প্রাচীনকালে বিজয়ীদের গরু পুরস্কৃত করার রীতি ছিল। পরবর্তীতে তা বাড়ির প্রয়োজনীয় জিনিসে গিয়ে ঠেকেছে। এই যেমন সাইকেল কিংবা আলমারি।


‘মইছাড়া’ আপাতভাবে কৃষিকাজের উন্নতির উদ্দেশ্যে প্রচলিত একটি প্রথা হলেও বিষয়টির মধ্যে আনন্দ উৎসবের চেহারা দেওয়া হয়েছে যুগ যুগ ধরে। সারা বছর ধরে গরুকে খাইয়ে শক্ত-সমর্থ করে তোলা হয় এই বিশেষ সময়ের জন্য। আর এরপর বর্ষা এলেই ধান চাষের আগে ক্ষেতে শুরু হয় গরুর দৌড়।


বর্ষার কটা দিন চাষিরা মেতে থাকেন নিজের আনন্দে। লাঙল আর গরু হয়ে ওঠে তাদের বন্ধু। দিগন্তব্যাপী সুবিস্তৃত সবুজ মাঠ, আর রাশি রাশি শস্য— এই তাদের ধর্ম, বিশ্বাস আর ভালোবাসা। সেই ভালোবাসাময় আবেগের খোরাক হয়ে পাশে ছিল মইছাড়াসহ নানা খেলা।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.