দ্বারকানাথ ছিলেন ৪৩টি যৌনপল্লীর মালিক
ODD বাংলা ডেস্ক: কলকাতার সেন্ট্রাল এভিনিউ থেকে শোভাবাজারের রাস্তা ধরে এগিয়ে চললে পথেই পড়ে গৌরী শঙ্কর লেন। এখানেই অবস্থিত এশিয়ার সর্ববৃহৎ যৌনপল্লী সোনাগাছি। ভারতের বৃহত্তম যৌনপল্লী এটি। আজও এক লাখ যৌনকর্মীর নিত্যদিনের রুটিরুজির গল্প রচিত হয় সোনাগাছিতে। এই সোনাগাছির অতীত ইতিহাসের সঙ্গে খোঁজ মেলে দ্বারকানাথের নাম। নিজের ব্যবসা চালাতে তখনকার কলকাতায় দ্বারকানাথ হয়ে ওঠে ৪৩টি যৌনপল্লীর মালিক।
উনিশ শতক বললেই আমাদের মনে পড়ে ঠাকুরবাড়ির কথা। রবীন্দ্রনাথ থেকে অবনীন্দ্রনাথ একঝাঁক ক্ষণজন্মা প্রতিভার বিচরণভুমি এই ঠাকুরবাড়ি। তবে ঊনবিংশ শতকের ঠাকুরবাড়ি নিজেদের শুধুমাত্র সাহিত্য-সংস্কৃতি বা বিজ্ঞানচর্চার মধ্যে আবদ্ধ রেখেছিল ভাবলে ভুল ভাবা হবে। সাহিত্য সংস্কৃতির পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যেও ঠাকুরবাড়ি ছিল অন্যতম। আর এই ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপারে তৎকালীন বাঙালি সমাজের পথিকৃৎ হয়ে ওঠেন দ্বারকানাথ। ঠাকুরবাড়ির আরেক পুরুষ দ্বারকানাথ ঠাকুর।
ব্রিটেনে অবস্থানকালে তার সমকালীনরা তাকে প্রিন্স নামে অভিহিত করেন এবং এভাবেই কলকাতায়ও তিনি প্রিন্স হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন ইউরোপীয় বণিকদের প্রতিনিধি ও কর্মকর্তা। ছিলেন একজন বাঙালি শিল্প-বাণিজ্যের উদ্যোক্তা। সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মযোগীদের প্রথম প্রজন্ম সৃষ্টি করেছিলেন তিনি।
সুমিতেন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘ঠাকুরবাড়ির জানা অজানা’ বইতে লিখেছেন - ‘দ্বারকানাথ যখন পৈতৃক বিষয় পান তখন তার আয় ছিল খুবই অল্প। কিন্তু নিজের দক্ষতা, কার্য-কুশলতার মধ্যে ও ইংরেজ বন্ধুদের সাহায্যে তিনি একে একে বহু ভূসম্পত্তির অধিকারী হন। ওড়িশা ও পূর্ববঙ্গে তিনি বহু জমিদারি কেনেন ও সেইসব জায়গায় কুঠিবাড়ি নির্মাণ করেন। দ্বারকানাথের বেলগাছিয়ার বিরাট বাগানবাড়ির তো খুবই নামডাক। সেখানে এক এক রাতে তিনি যেভাবে সাহেব-সুবোদের অ্যাপায়ন করেছেন তার বিবরণ তখনকার দৈনিক পত্রিকাগুলোর শিরোভাগে জায়গা পেত। আবার তা ঈশ্বর গুপ্তের ব্যঙ্গ কবিতার বিষয়বস্তুও হয়ে উঠেছিল।
এবার আসা যাক সোনাগাছির প্রসঙ্গে। ১৮৫৩ সালে প্রকাশিত একটি সার্ভে রিপোর্ট থেকে জানা যায়, কলকাতা শহরে চার হাজার ৪৪৯টি ঠেক আছে, যেখানে বসবাস করেন প্রায় ১২ হাজার ৪১৯ জন যৌনকর্মী। যার মধ্যে অন্যতম সাড়া জাগানো যৌনপল্লী ছিল ‘সোনাগাছি’। সোনাগাছির সম্পর্কে কথিত ছিল, প্যারিসের যৌনকর্মীরাও কলকাতার এই যৌনালয় সম্পর্কে জানতেন। বস্তুতপক্ষে তার আগেই দ্বারকানাথ ঠাকুর বেশ কিছু যৌনপল্লীর মালিক হয়ে উঠেছিলেন। এ ব্যাপারে সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী সম্পাদিত দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনীটি প্রণিধানযোগ্য।
বইটি থেকে জানা যায়, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর কলকাতার একটি এলাকাতেই প্রায় তেতাল্লিশটি যৌনপল্লীর মালিক ছিলেন। এই অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, কী এমন প্রয়োজন পড়ল দ্বারকানাথের, যার জন্য তাকে হয়ে উঠতে হল কিছু এতগুলো যৌনপল্লীর মালিক? এমনকি বলতে গেলে তার হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত হল সোনাগাছির মতো যৌনপল্লী।
এই প্রশ্নের উত্তরও লুকিয়ে আছে দ্বারকানাথের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তৃতির মধ্যে। ইংরেজদের সঙ্গে রীতিমতো টক্কর দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যের সূত্রেই কলকাতায় আগমন হয় প্রচুর রাজকর্মচারীর। তারা বেশিরভাগই ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিচুতলার কর্মী এবং বেশিরভাগই অবিবাহিত। ফলে এই ব্রিটিশ রাজকর্মচারীদের আপ্যায়নের জন্যই দ্বারকানাথ প্রায় তেতাল্লিশটি বেশ্যালয়ের মালিক হয়ে বসলেন। বেশিরভাগ কোঠাতেই ইংরেজ কর্মচারীরা তাদের আমোদ ফূর্তির জন্য রাখতেন এক বা একাধিক উপপত্নী। এই উপপত্নীরা বিবেচিত হতেন ইংরেজ কর্মচারীদের আনন্দের উপকরণ হিসেবে। তবে শুধুমাত্র ইংরেজ কর্মচারীরাই নন, তৎকালীন সময়ে অনেক বাঙালি বাবুর মুক্তাঞ্চলও হয়ে ওঠে এইসব যৌনপল্লী, যার মধ্যে অন্যতম ছিল সোনাগাছি।
৪৩টি যৌনপল্লীর মালিকানা গ্রহণ বা সোনাগাছির মতো যৌনপল্লীর শুরুয়াত হয় দ্বারকানাথের হাত ধরেই। একে দ্বারকানাথের তুখোড় বাণিজ্যিক বুদ্ধির প্রয়োগ বলে গণ্য করা চলে। বেলগাছিয়ার বাগানবাড়ি যেমন ইংরেজ কর্মচারী এবং বাঙালি বাবুদের কাছে আনন্দের অন্যতম উৎস ছিল, তেমনই তার অন্য একটি ধারা হয়ত প্রবাহমান ছিল এই যৌনপল্লীর হাত ধরেই। এভাবেই হাজারো আলোর মধ্যে ঠাকুর পরিবারের অনেক ঘটনাই হয়ত আমাদের অজ্ঞাতই রয়ে গেছে।





Post a Comment