দেশে দেশে বর্ষবরণ রীতি
ODD বাংলা ডেস্ক: হ্যাপি নিউ ইয়ার ২০২২! সবার মনে যেনো এক নতুন প্রত্যাশা, নতুন স্বপ্ন আর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এই হ্যাপি নিউ ইয়ার ২০২২ সালের শুরুতে। দীর্ঘ সময় ধরে মহামারির সময় ঘরবন্দি জীবন পার করার পর এই হ্যাপি নিউ ইয়ার টি যেনো সবাইকে নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে।
অনেকেই এই নিউ ইয়ারটি কে ঘিরে সব দুঃখ, হতাশা জলাঞ্জল দিয়ে নতুন করে শুরু করার কথা ভাবছে। নতুন বছরটি যেনো সবার জন্য পরিপূর্ণ এবং অর্থবহ হয়ে উঠে সেটিই প্রত্যাশা পাশাপাশি নতুন বছরটি যেনো প্রকৃত পক্ষেই সুখময় হয়ে উঠে সেটিই কাম্য।
হ্যাপি নিউ ইয়ার ২০২২ কে ঘিরে অনেকেরই নানা রকম প্ল্যান আছে, আছে কিছু স্বপ্ন। আবার অনেকের আছে দুঃখ, দুর্দশা গুলো মুছে ফেলার অপ্রাণ চেষ্টা করার পরিকল্পনা। প্রতি বছরই আমরা প্রায় সবাই হ্যাপি নিউ ইয়ার এর অপেক্ষায় থাকি। হ্যাপি নিউ ইয়ার কে বরণ করি নতুন আঙ্গিকে, নতুন রূপে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয় ভিন্নভাবে। একই ক্যালেন্ডারে সবার কাছে নতুন বছর এলেও তার স্বাগত জানানোর রীতি ভিন্ন। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে চলমান এসব রীতি সম্পর্কে আজ জানাবো-
আমেরিকার বর্ষবরণ
রমরমা পার্টিতে শ্যাম্পেনের মুখ উন্মোচন, কেক কাটা, হাজারো খাবার আয়োজন, হালের চোখ রগড়ানো পার্টি পোশাক পরিধান, পার্টি উন্মাদনা, রঙিন কাগজ-জরি উড়ানো, আতশবাজি ফোটানো, উচ্চশব্দে ভুভুজেলা বাঁশি বাজানো, একে অপরকে আলিঙ্গন, পার্টি মিউজিকে রাতভর নাচ আর ঠাট্টা তামাশায় মেতে থাকা আমেরিকার বর্ষবরণের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। দেশজুড়ে ফুটবল খেলা সম্প্রচার এই দিনের একটি আলাদা রীতি। অনেক আমেরিকান পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের নিয়ে খেলাটি দেখতে পছন্দ করেন। আমেরিকায় এই ঐতিহ্য চল শুরু হয়েছে ১৯১৬ সাল থেকে।
গ্রেগোরিয়ান বর্ষবরণ
ঐতিহাসিকভাবে জানা যায় রোমান ক্যালেন্ডারে নতুন বর্ষ শুরু হতো ১ মার্চ থেকে। তবে যে সব দেশে গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার করা হয় তারা সাধারণত নববর্ষ ১ জানুয়ারিতে পালন করে আসছে। এর প্রভাব বছরের কয়েকটা মাসের ওপর দেখা যায়। লাতিন ভাষায় সেপ্টেম্বরের অর্থ হচ্ছে সাত, অক্টোবর আট, নভেম্বর নয় এবং ডিসেম্বর দশ। সেই সময় রোমান সরকারের নতুন অধিবেশন শুরু হতো জানুয়ারি মাস থেকে। পরিবর্তন ঘটানোর পর খ্রিস্টপূর্ব ৮ সালে এম্পরর অপাসটাস সিজার আরেক দফা পরিবর্তন ঘটান। সর্বশেষ পোপ ১৩ তম গ্রেগোরি ১৫৮২ সালে ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন ঘটিয়ে এর বর্তমান কাঠামোতে নিয়ে আসেন। এই পরিবর্তিত ক্যালেন্ডারে নতুন বর্ষের শুরু হয় ১ জানুয়ারি। দিনটি মধ্যযুগে ধর্মীয় দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পৃথিবীর সব বড় বড় শহরে নববর্ষের আগ মুহূর্তে বিশাল সব অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এসব অনুষ্ঠানে আতশবাজি ফাটিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়। বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে নববর্ষ উদযাপন করা হয়।
ভিয়েতনাম পূর্বপুরুষদের স্মরণে
ভিয়েতনামে মানুষরা কিছুটা ভিন্নভাবেই বর্ষবরণের আয়োজন করে আসছে। এই দিন তারা পূর্বপুরুষদের স্মরণে প্রার্থনা করে থাকে। এ ছাড়াও দেশটির উত্তরে কিছু সংখ্যালঘু জাতি রয়েছে, যারা বছরের শেষ দিনে জলাধারে দল বেঁধে গিয়ে মোমবাতি জ্বেলে মাটিতে মাথা ছুঁইয়ে প্রণাম করে। পরে তারা সেই জলাধার থেকে এক কলসি জল নিয়ে আসে। এরপর ঐ জল দিয়ে বছরের প্রথম দিন রান্না করে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে উৎসর্গ করে। তারপর নিজেরা খায়। তবে বছরের প্রথম দিনের রান্নায় স্যুপ জাতীয় খাবার থাকা চলবে না। বছরের প্রথম দিন স্যুপ জাতীয় খাবার খেলে নাকি মাঠের ফসল বন্যায় ভেসে যাবে।
মাদাগাস্কারের অন্যরকম বর্ষবরণ
ইতিমধ্যে জেনেছি যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নববর্ষ পালনের রীতিনীতি কিন্তু এক নয়। নতুন বছরের প্রথম দিন পালনে অনেক দেশে আজব কিছু রীতি রয়েছে। কেউ নতুন বছরে মাংস খায় না আবার কেউ সাত দিন আগে থেকে মাংস খাওয়া বন্ধ করে প্রথম দিনেই মাংস খায়। আর আফ্রিকার দেশ মাদাগাস্কারে নতুন বছর শুরুর সাতদিন আগে থেকে মাংস খাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। বছরে প্রথম দিন বাড়িতে মুরগির মাংস রান্না হবে। প্রথমে তা খেতে দেয়া হয় বাবা-মাকে। তাদের দেওয়া হয় মুরগির লেজের দিকের অংশটা আর ভাই-বোনদের দেওয়া হয় মুরগির পা।
ইংল্যান্ডে প্রথম পদচারণা
রীতি অনুযায়ী এই দেশে নতুন বছরকে স্বাগত জানায় গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের পাতা উন্মোচনের ভিতর দিয়ে। সেখানে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে। সার্কাস, বাজি, বাঁশি, পার্টি মিউজিক, নাচ সবই চলে। মিশ ভয়েসে ‘পুরনো সেই দিনের কথা’ গেয়ে অতীত দিনের সম্মানও জানানো হয়। বর্ষবরণের অপর ঐতিহ্য হলো প্রথম পদচারণা। এ জন্য একজন লম্বা, সুঠামদেহি কালোবর্ণের পুরুষ বছরের প্রথম প্রহর অর্থাৎ মধ্যরাতে জনগণের বাড়ি পরিদর্শনে যান। রীতি অনুযায়ী তার হাতে এক টুকরো রুটি, এক বতল হুইস্কি, কিছু জ্বালানি এবং লবণ থাকে।
হাঙ্গেরিতে পাখির মাংসে ‘না’
বর্ষবরণ নিয়ে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মিথ কাজ করে। হাঙ্গেরিতেও আছে এরকম কিছু মিথ। বছরের শেষ দিন হাঙ্গেরিবাসী হাঁস, মুরগি বা কোনো ধরনের পাখির মাংস খান না। তাদের মতে, ওইদিন উড়তে পারে এমন পাখির মাংস খেলে নতুন বছরে জীবন থেকে সব সৌভাগ্য উড়ে যাবে! এর পাশাপাশি, তারা নতুন বছরে পরিচিত বা বন্ধুদের যে উপহার দেন, তাতে চিমনি পরিষ্কার করছেন এমন একজন শ্রমিকের ছবি থাকে। তাদের ব্যাখ্যা, উপহারে এই ছবিটি থাকলে পুরনো বছরের সব দুঃখ নতুন বছরে মুছে যাবে।
ভারতে আলোর উৎসব
বহু ভাষাভাষী ও সংস্কৃতির দেশ ভারতে সম্রাট আকবরের সময় যে নওরোজ উৎসব হতো তা সর্বভারতীয় উৎসবের মর্যাদা পায়নি। অনেকে ভারতীয় বর্ষবরণ উৎসবকে আলোর উৎসব বলে অভিহিত করেন। এ সময় লক্ষ্মীপূজাসহ চলে দেবদেবীর স্মৃতিচারণ করার উদ্দেশে ভজনসংগীত, কৃষ্ণকীর্তন ইত্যাদি। পাঞ্জাবে নববর্ষ উৎসব পরিচিত বৈশাখী নামে। নববর্ষে পুষ্পসজ্জা প্রায় সর্বভারতীয় রেওয়াজ, দক্ষিণ ভারতের অঞ্চলবিশেষের মজাদার খাবার ও পুষ্পাহার গুরুত্বপূর্ণ প্রথা। তবে বর্তমানে ইংরেজি নববর্ষ পালন সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান উৎসব হয়ে উঠেছে।
ফ্রান্সে বিশেষ ভোজ
ফ্রান্সে নববর্ষের দিনটিকে জউর দে এটরের্নস বলা হয়। এখানে নববর্ষ উদযাপন শুরু হয় ১ জানুয়ারি, যখন একজন অন্য জনকে বন্নে আনেস বলে অভিবাদন জানায়। এ সময় আইফেল টাওয়ারের পাশে আতশবাজি ফাটিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া হয়। ফরাসিরা থার্টিফার্স্ট নাইটকে লা সেইন্ট-সিলভেস্ট্রে বলে ডাকে। এ দিন এক বিশেষ ভোজের আয়োজন করা হয়, যার নাম লে রেভেলিয়ন ডি সেইন্ট সিলভেস্ট্রে। তখন ভালো ভালো খাবার যেমন প্যানকেক আর হাঁস রান্না হয়। এ ছাড়াও এ দিন প্যালে ডে রইস নামের এক ধরনের কেক বানানো হয়।
সৌভাগ্যের প্রতীক খোঁজে জাপান
জাপানে নববর্ষের দিন সরকারিভাবে ছুটি ঘোষণা করা হয়। এ সময় সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। জাপানের মানুষজন নতুনভাবে সবকিছুতে ‘ভালো’ দিয়ে শুভ যাত্রা করতে চায়। তাই অশুভ সবকিছুকে এ সময় দূরে সরিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর তারা। খারাপ আত্মাকে দূরে রাখার জন্য এ সময় বাড়ির বাইরে দড়ি দিয়ে খড়ের টুকরো ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এটাকে তারা সুখ এবং সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে দেখে। নতুন বর্ষ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জাপানিরা হাসা শুরু করে, বলা হয় এতে করে নতুন বর্ষ সৌভাগ্য নিয়ে আসে। আর হাসিকে জাপানিরা আনন্দের প্রতীক বলে মনে করে।
স্কটল্যান্ডে বর্ষবরণ
পোল্যান্ডের জনগণের ধারণা নববর্ষের দিন যে মানুষ প্রথম বাড়িতে পা রাখে সে-ই ওই বছর বাড়ির সদস্যদের ভাগ্য নির্ধারণ করে। তাই এই সময় তাকে ব্যাপক সমাদর করা হয়। তাকে তুষ্ট করতে পারলেই বছর খুব ভালো যাবে বলে মনে করা হয়। এ সময় সবাই নিজেদের ঘরবাড়ি পরিষ্কার করে নতুন বছরের আগমনের প্রস্তুতি নেয়। এ সময় বাড়ি পাক-পবিত্র রাখার জন্য জুনিপার গাছের ডাল পোড়ানো হয়। স্কটল্যান্ডের এডিনবরাইয়ে এ সময় যে নববর্ষ উৎসব হয় তা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নববর্ষ উৎসবগুলোর মধ্যে একটি। চার দিনব্যাপী চলা এই অনুষ্ঠানে বিশ্বের সব প্রান্ত থেকে মানুষ আসে।
মেক্সিকোতে ঘণ্টা বাজে ১২ বার
একেক দেশে একেক রীতি নববর্ষ উদযাপনে। অনেক দেশেই নববর্ষ উদযাপনে ঘণ্টা বাজানো হয়। তেমনি মেক্সিকোতেও ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে ১২ বার ঘণ্টা বাজানো হয়। এ সময় প্রতি ঘণ্টা ধ্বনির সঙ্গে একটি করে আঙুর খাওয়া হয়। তারা বিশ্বাস করে এ সময় যা কামনা করা হয়, তাই পূরণ হয়। তাই এ সময় লাখ লাখ মেক্সিকান একসঙ্গে জড়ো হয়। তারা সবাই শুভ দিনের জন্য আগামী দিনের মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করে। অনেকে আবার নিজ নিজ ইচ্ছা পূরণ হওয়ার আশায় ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে আঙুর খেয়ে মনে মনে চাইতে শুরু করে। এখানে মনে রাখতে হবে যে ঘণ্টা মাত্র ১২ বার বাজবে তাই ইচ্ছাও হতে হবে ১২টি।
প্যারাগুয়েতে ফুলের সমাহার
বিশ্বের সবচেয়ে আড়ম্বরপূর্ণ বর্ষবরণ হয় প্যারাগুয়েতে। তাদের ভাষায় দিনটিকে ‘আনো ভেইজো’ বলা হয়। দেশটির রাস্তা সাজানো হয় সারিবদ্ধ রঙিন আলো আর ফুলের সমাহারে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কনসার্ট, পার্টি, নাইট ক্লাবে স্পেশাল অনুষ্ঠান, পর্যটকের আগমন ইত্যাদিতে ভরপুর থাকে। প্যারাগুয়েতে বছরের শেষ পাঁচদিন ঘরের চুলায় কোনো আগুন জ্বলবে না। বিশেষ এই পাঁচদিনকে তারা পালন করে ঠাণ্ডা খাবার খাওয়ার দিন হিসেবে। ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২টার পর নতুন বছরের ঘণ্টা বাজলে আগুন জ্বেলে রান্না শুরু, পরিবারের সবাই একসঙ্গে খেয়ে নতুন বছরে পা রাখে।
বুলগেরিয়ার অদ্ভুত রীতি
আমাদের দেশে হাঁচি নিয়ে নানা সংস্কার আছে। কথার মাঝে হাঁচি পড়লে সেটা সত্যি ধরে নেওয়া হয়। আবার কোথাও বের হওয়ার সময় হাঁচি পড়ল, তো সেটা অমঙ্গলসূচক। কিন্তু বুলগেরিয়াবাসীর কাছে বর্ষবরণের দিন হাঁচি দেওয়াটা বেশ মঙ্গলের। বর্ষবরণের দিন তাদের বাড়িতে আসা কোনো অতিথি যদি হাঁচি দেন, তাহলে বাড়ির কর্তা তাকে নিজের খামারে নিয়ে যান। এরপর সেই ব্যক্তির প্রথম নজর খামারে যে পশুটির ওপর পড়বে, সেই পশুটিকে গৃহকর্তা তাকে উপহার দেন। বুলগেরিয়ানদের ধারণা, হেঁচে-ফেলা অতিথি পুরো পরিবারের জন্য সুখ ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসবেন।





Post a Comment