শেষ ১৪ বছরে পাঁচবার হয়েছে গান্ধীজিকে হত্যাচেষ্টা
ODD বাংলা ডেস্ক: দিনটি ছিল ৩০ জানুয়ারি, ১৯৪৮। সদ্য স্বাধীন হয়েছে ভারত। বিড়লা হাউজে দুই নাতনিকে নিয়ে বেরিয়েছেন মহাত্মা গান্ধী। বিকেলের প্রার্থনা সভায় যাবেন তিনি। সামনের ভিড় থেকে বেরিয়ে এলেন একজন। গান্ধীজিকে প্রণাম করল সাগ্রহে। তারপরই পকেট থেকে বের করল বন্দুক। পরপর তিনটি গুলি, আর তার আধ ঘণ্টা পর শেষ হল ভারতের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্বের জীবন। অল ইন্ডিয়া রেডিওতে ঘোষণা করলেন প্রধানমন্ত্রী নেহরু - নাথুরাম গডসের গুলিতে নিহত হয়েছেন ‘বাপু’।
তারপর থেকেই, ৩০ জানুয়ারি দিনটি ভারতের ইতিহাসের অন্যতম কালোদিন হয়ে রইল। তবে ৩০ জানুয়ারি গান্ধীর ওপর আক্রমণের একমাত্র দিন নয়। এর আগে আরো পাঁচবার তার প্রাণনাশের চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই কবার অবশ্য বেঁচে গিয়েছিলেন তিনি।
১৯৩৪ সালের ২৫ জুন। পুনে করপোরেশন অডিটোরিয়ামে বক্তৃতা দিতে আসবেন মহাত্মা গান্ধী। স্ত্রী কস্তুরবা গান্ধীকে নিয়ে একটি গাড়িতে উঠে রওয়ানা দিলেন সেখানে। সেই সঙ্গে, হুবহু তাদের গাড়িটির মতোই দেখতে আরেকটি গাড়ি রওনা দিল করপোরেশনের উদ্দেশ্যে। লেবেল ক্রসিংয়ের জন্য গান্ধীজির গাড়ি কিছুক্ষণের জন্য দেরিতে ঢোকে সেখানে। একই রকম দেখতে আগের গাড়িটি বেশ আগেই পৌঁছে গিয়েছিল যথাস্থানে। হঠাৎই ওই গাড়িতে বিস্ফোরণ হয়। কেউ বা কারা সুযোগ বুঝে গাড়িতে বোম রেখে গেছে। সেদিন লেবেল ক্রসিং বাঁচিয়ে দিয়েছিল গান্ধী এবং তার স্ত্রীকে। কিন্তু দুইজন পুলিশকর্মী এবং সাতজন সধারণ মানুষ গুরুতর আহত হন।
এই ঘটনার ঠিক দশ বছর পর। ১৯৪৪ সাল। আগা খান প্যালেসে গৃহবন্দি ছিলেন গান্ধীজি। এমন সময় তার ম্যালেরিয়ার উপসর্গ দেখা গেল। তাকে ছেড়ে দিল ব্রিটিশ সরকার। শরীর সুস্থ করার জন্য, মহারাষ্ট্রের পঞ্চগনিতে এসে উঠলেন। হঠাৎ একদিন সেখানে একটা বাস এসে ভিড়ল। ১৮-২০ জন বাস থেকে নেমে গান্ধীর উদ্দেশ্যে কটূক্তি করতে লাগল। তিনি ওই দলের নেতাকে ডাকলেন কথা বলার জন্য। কিন্তু নেতা কিছুতেই রাজি নয়। বিকেলের প্রার্থনার সময় গান্ধীজিকে দেখতে পেয়ে ছুরি নিয়ে তেড়ে গেল সেই দলের নেতা। সেইদিনই নিহত হতেন, কিন্তু মণিশঙ্কর পুরোহিত এবং ভিল্লারে গুরুজি এই যাত্রা বাঁচান। আর এই ছুরি হাতে দলের নেতাটি ছিলেন নাথুরাম বিনায়ক।
এরপর আরো দুইবার ব্যর্থ চেষ্টা করেন সে এবং তার দল। ওই একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সেবাগ্রামে গান্ধী আর মহম্মদ আলি জিন্নাহের সাক্ষাৎ ছিল। গান্ধীজি ছিলেন মুম্বাইতে। সেখান থেকে যাতে কোনোমতে তিনি বেরোতে না পারেন, তার চেষ্টা করে নাথুরাম। এবারেও সেই দলের নেতা, আর এবারও তার কাছ থেকে পাওয়া গেল একটি ছুরি।
এর ঠিক দুইবছর পর, ১৯৪৬ সালের জুনে গান্ধীজি ট্রেনে পুনের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন। নিরুল এবং কারজাত স্টেশনের মাঝে হঠাৎই ট্রেনটি বেলাইন হয়ে যায়। বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারত, কিন্তু ট্রেনের চালকের বুদ্ধিতে গোটা ট্রেনটাই বেঁচে যায়। ঠিক সময় গতি কম করে দিয়েছিলেন। ফলে, ইঞ্জিনের ক্ষতি ছাড়া আর কিছু হয়নি সেভাবে। ঘটনা ঘটার পর গান্ধীজি বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। কেন এতবার তার জীবনের ওপর আঘাত হানার চেষ্টা করা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও করেছিলেন।
মৃত্যুর মাত্র দশদিন আগে, ১৯৪৮-এর ২০ জানুয়ারি আরো একবার চেষ্টা করা হয়। এইবারও মূলে ছিলেন নাথুরাম। বিড়লা হাউজে গান্ধীজির বক্তৃতা ছিল। প্ল্যান ছিল, নাথুরাম ও তার সঙ্গীরা সেখানে বোমা ফেলবে। লোকেরা যখন তাড়াহুড়ো করে পালাবে, তখন গুলি করা হবে গান্ধীকে। সেই মতো মদনলাল বলে একজন ফটোগ্রাফার সেজে ঢুকেও গেল। কিন্তু ফটোগ্রাফারের ক্যামেরা কোথায়? বারবার দেওয়ালের আড়ালেই বা লোকাচ্ছে কেন? সন্দেহ হয় ট্যাক্সিচালকের। এদিকে বোমা ছোঁড়াও হয়, কিন্তু সেটি একদমই শক্তিশালী ছিল না। প্ল্যান ভেস্তে যায়। মদনলাল গ্রেফতার হয়।
এর পরেরবারটি ছিল ৩০ জানুয়ারি। নাথুরাম নিজেই দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ছুরির বদলে এদিন ছিল বন্দুক। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে সন্ধ্যা ৫টার কিছু পরে গান্ধীজি বিড়লা হাউজের পিছনের দিকে লনে যাওয়ার সিঁড়ির মাথায় পৌঁছেছিলেন। সেখানে তিনি প্রতি সন্ধ্যায় সব ধর্মের প্রার্থনাসভা পরিচালনা করছিলেন। যেইমাত্র গান্ধী বেদির দিকে হাঁটতে শুরু করেছিলেন, গডসে ভিড় থেকে বেরিয়ে এসে গান্ধীর পথের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গান্ধীর বুকে এবং পেটে তিনটি গুলি ছুঁড়লেন। গান্ধী মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন। তাকে বিড়লা হাউসে তার ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে কিছুক্ষণ পরে একজন প্রতিনিধি এসে তার মৃত্যুর কথা ঘোষণা করেন। সেদিন জনতা গডসেকে ধরে ফেলে এবং পুলিশের হাতে সমর্পন করে।





Post a Comment