হারিয়ে গেছে ভিস্তিওয়ালার জল

 


ODD বাংলা ডেস্ক:  একটা সময় ছিল যখন শহরগুলোতেও পাইপলাইন দিয়ে জল সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল না। তখন ভিস্তিওয়ালাদের ওপরই নির্ভর করতে হত শহুরে মানুষকে। ভিস্তিওয়ালাদের পেশাটি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল পুরো বাংলায়। কালের বিবর্তণে সেই পেশাটি বিল্পপ্তির পথে। তবে আজও কলকাতার জনা চল্লিশেক ভিস্তিওয়ালা বাঁচিয়ে রেখেছেন এই পেশা।  

ছাগলের চামড়ায় তৈরি একধরনের ব্যাগে তারা জল ভর্তি করে শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পৌঁছে দিতেন। বিশেষভাবে তৈরি এই ব্যাগকে বলা হত ‘মশক’।ভিস্তিওয়ালাদের মশকে জল থাকত ঠান্ডা। ‘বেহেশত’ একটি ফার্সি শব্দ, যার বাংলা অর্থ ‘স্বর্গ’। এই ‘বেহেশত’ থেকে ‘ভিস্তি’ কথাটি এসেছে। পশ্চিম এশিয়ার সংস্কৃতি অনুযায়ী মনে করা হয়, স্বর্গে রয়েছে প্রচুর নদী, খাল আর বাগান। একটা সময় মানুষের বিশ্বাস ছিল, ভিস্তিওয়ালারা জল নিয়ে আসেন স্বর্গ থেকে। স্বর্গের জল তারা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেন বলে স্বর্গের দূতও বলা হত তাঁদের।


জানা যায়, মুঘল সম্রাট বাবরের ছেলে হুমায়ুন একবার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ঝাঁপ দিয়েছিলেন এক খরস্রোতা নদীতে। জলের প্রচণ্ড স্রোতে যখন হুমায়ুনের প্রাণ ওষ্ঠাগত, এক ভিস্তিওয়ালা তার জীবন বাঁচিয়েছিলেন। হুমায়ুন তাকে কথা দিয়েছিলেন, যদি কখনও তিনি দিল্লির তখতে বসতে পারেন, ওই ভিস্তিওয়ালা যা উপহার চাইবেন, তাই দেবেন। পরে হুমায়ুন সম্রাট হলেন, আর সেই ভিস্তিওয়ালা তার কাছে চেয়ে বসলেন সম্রাটের সিংহাসন। বাদশাহ হুমায়ুন নিজের মুকুট পরিয়ে দিলেন ভিস্তিওয়ালার মাথায়, তাকে বসালেন নিজের সিংহাসনে। তখন ভিস্তিওয়ালা সম্রাটকে আলিঙ্গন করে ফিরিয়ে দিলেন তার মুকুট আর সিংহাসন।


আগেকার দিনে যুদ্ধের সময় জল রাখতে ভিস্তিওয়ালার মশক ব্যবহার করা হতো। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনে দুর্গগুলোতে জলের সরবরাহ করা হতো মশক থেকে। জলভর্তি মশক থাকত ঢাকার টমটম গাড়িতে। কলকাতার সঙ্গে ভিস্তিওয়ালাদের সম্পর্ক খুব পুরোনো। কাঁধে মশক নিয়ে ভোরবেলা থেকেই মহানগরীর পথে পথে ঘুরে বেড়াতেন তারা। রান্না আর স্নানের কাজে লাগত তাদের সরবরাহ করা জল।


১৯৪০-৫০ সাল পর্যন্ত কলকাতার কয়েকটি রাস্তা ধোয়ার কাজেও ভিস্তিওয়ালাদের জল কাজে লাগত। কলকাতা আর ঢাকাতে ছিল আলাদা ভিস্তিপল্লি। এখন অবশ্য পাল্টে গেছে পরিস্থিতি। করপোরেশনের জল মোটর পাম্পের সাহায্যে পৌঁছে যাচ্ছে কলকাতার বাড়িতে বাড়িতে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভিস্তিওয়ালাদেরও বেছে নিতে হচ্ছে অন্য পেশা। তবে এখনও কিছু ভিস্তিওয়ালা নিয়মিত জল সরবরাহ করেন মধ্য কলকাতার কয়েকটি গৃহস্থ বাড়ি আর দোকানে।


কলকাতার জনা চল্লিশেক ভিস্তিওয়ালা এখনও বাঁচিয়ে রেখেছেন তাদের পারিবারিক পেশা। তাদের বেশিরভাগই আদতে বাস করেন বিহারের কাটিয়ারে। মধ্য কলকাতায় ঘর ভাড়া করে থাকেন তারা। প্রত্যেক ঘরে অন্তত দশজন করে মানিয়ে গুছিয়ে থেকে যান। ভিস্তিওয়ালাদের থেকে এখনও জল কিনে খান কিছু লোক। হোটেলেও যায় এদের জল । তবে সেই আগের মতো আর নদীর জল  বহন করে না তারা। দিনভর তারা পৌরসভার ট্যাপ কল বা টিউবওয়েল থেকে জল মশকে ভরে। ঝড়-বৃষ্টি-রোদ উপেক্ষা করে জল পৌঁছে দেন মানুষের প্রয়োজনে। একটি মশকে জল ধরে ৩০ লিটারের কাছাকাছি। কলকাতার রফি আহমেদ কিদওয়াই রোড, বৃন্দাবন দাস লেন, মারকুইস স্ট্রিট, ইলিয়ট রোড, মার্কুইস স্ট্রিটের বাড়ি এবং দোকান মিলিয়ে একেকজন ভিস্তিওয়ালা দিনে দুইবেলা মোটামুটি ৩০টি বাড়িতে জল পৌঁছে দেন। এজন্য প্রতি মাসে ৪০০ টাকার মতো খরচ হয় একেকটি পরিবারে।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.